Ajker Patrika

চাকরিতে নাইট ডিউটি: মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, সুস্থ থাকার দাওয়াই দিলেন বিজ্ঞানীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চাকরিতে নাইট ডিউটি: মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, সুস্থ থাকার দাওয়াই দিলেন বিজ্ঞানীরা
রাতের শিফটে নিয়মিত কাজ করার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন চিকিৎসক ও নার্সরা। প্রতীকী ছবি

ভোর ৪টা। হাসপাতালের ওয়ার্ড এখন শান্ত। একজন জুনিয়র চিকিৎসক নয় ঘণ্টা ধরে টানা কাজ করছেন। ক্লান্তিতে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছে, চোখ বুঁজে আসছে। কিন্তু সকাল ৬টায় ডিউটি শেষ করে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন শত চেষ্টা করেও তাঁর ঘুম আসে না।

লাখ লাখ বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মানুষের শরীরে যে অভ্যন্তরীণ ঘড়ি (বায়োলজিক্যাল ক্লক) তৈরি হয়েছে, তা সকালের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরকে সজাগ ও কর্মক্ষম হতে নির্দেশ দেয়। ঘরের অন্ধকার পর্দা, কানের প্লাগ বা কোনো কিছুই প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মকে পুরোপুরি থামাতে পারে না।

এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং মানবদেহের গভীর জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে আধুনিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদার এক অদৃশ্য সংঘাত। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিফট কর্মী—যেমন সাংবাদিক, নার্স, প্যারামেডিক, কারখানার শ্রমিক, চালক এবং প্রকৌশলীরা যখন পুরো দেশ ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন এই সংঘাতের মধ্য দিয়েই সেবা দিয়ে যান।

কিন্তু এই লড়াইয়ের মূল্য কতটা দিতে হচ্ছে? সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির সঙ্গে এই নিরন্তর যুদ্ধের মাশুল দিতে হচ্ছে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, মানসিক অবসাদ এবং ডিমেনশিয়ার (স্মৃতিভ্রংশ) মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দিয়ে।

তবে বিজ্ঞানীরা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন, ঘুমের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব কি না। তাঁদের গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে—দিনের বেলা একটানা দীর্ঘক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা না করে, ঘুমকে দুটি আলাদা ভাগে ভাগ করে নেওয়া বা ‘বাইফেজিক স্লিপ’ শিফট কর্মীদের জন্য অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

শিফট ডিউটির স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মস্তিষ্কের ‘পরিচ্ছন্নতা অভিযান’

ঘুম কেবল শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেয় না, বরং এর চেয়েও অনেক বেশি কাজ করে। ঘুমের সময় মানুষের মস্তিষ্ক সারা দিনের স্মৃতিগুলোকে গুছিয়ে নেয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং জেগে থাকা অবস্থায় সমাধান না হওয়া জটিল সমস্যার সমাধান খোঁজে। এ ছাড়া এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং পেশির ক্ষয় পূরণ করে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ সায়েন্টিস্ট অধ্যাপক রাসেল ফস্টার বলেন, ‘খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের মতোই ঘুমও আমাদের স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আমাদের এটি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞানীদের অন্যতম বড় আবিষ্কার হলো—ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নিজেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিষ্কার করে। মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থের গভীরে এক ধরনের সূক্ষ্ম নিষ্কাশন নালি রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’। ঘুমের সময় এই নালির মধ্য দিয়ে এক ধরনের তরল প্রবাহিত হয়ে মস্তিষ্কে জমা হওয়া ক্ষতিকর বর্জ্য ধুয়ে ফেলে।

ঘুম ব্যাহত হলে এই বর্জ্য বা টক্সিনের কী হয়? কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রোক মেডিসিন গ্রুপের প্রধান নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক হিউ মার্কাস এবং তাঁর গবেষক দল যুক্তরাজ্যের ‘বায়োব্যাংক’ থেকে দীর্ঘ এক দশকের ৪০ হাজারেরও বেশি সুস্থ মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান পরীক্ষা করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মস্তিষ্কের এই বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়া দুর্বল, পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। অধ্যাপক মার্কাস বলেন, ‘এই বর্জ্য নিষ্কাশন প্রবাহে বাধা পাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পূর্বাভাস দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

মস্তিষ্কের এই নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে যেসব ক্ষতিকর প্রোটিন অপসারিত হয়, তার মধ্যে রয়েছে ‘অ্যামাইলয়েড’ এবং ‘টাউ’—যা অ্যালঝেইমার্স রোগের মূল কারণ হিসেবে পরিচিত। মাত্র এক রাত না ঘুমালে মস্তিষ্কের তরলে অ্যামাইলয়েডের মাত্রা পরিমাপযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে এমনটা চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনিবার্য।

সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ১৩ হাজার শিফট কর্মীর ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে শিফট ডিউটি করার কারণে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। আর এই ঝুঁকি কাজের মেয়াদের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পায়।

হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি

ঘুমের ঘাটতি কীভাবে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, সে সম্পর্কেও গবেষণায় নতুন তথ্য মিলছে। গত বছর প্রকাশিত ৩৫টি গবেষণার এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টানা তিন বা তার বেশি দিন ঘুম সাড়ে চার ঘণ্টার নিচে নেমে এলে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষতিকর সক্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে শরীরের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সৃষ্টি হয়, যা হৃদ্‌রোগের অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া ব্যাহত ঘুম স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে মানুষকে ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দেয়। কর্টিসলের উচ্চ মাত্রা ঘুমকে আরও বেশি বাধাগ্রস্ত করে, যা কর্মীদের এক অন্তহীন চক্রে আটকে ফেলে। রাত জেগে কাজ করার জন্য অনেকেই চিনিযুক্ত খাবার বা স্ন্যাক্স খান, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) রাত জেগে কাজ করাকে মানুষের জন্য ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। শরীরের প্রাকৃতিক সার্কাডিয়ান ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ‘মেলাটোনিন’ নামক হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা টিউমার প্রতিরোধে সাহায্য করে থাকে। দিনের আলোর অভাবে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি এবং ঘুমের অভাবে সৃষ্ট প্রদাহও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

‘বাইফেজিক স্লিপ’ কী সমাধান?

যাঁরা রাত জেগে কাজ করতে বাধ্য হন, তাঁদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছেন গবেষকেরা। নরওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অকুপেশনাল হেলথের গবেষক ড. লিন ভিক্টোরিয়া মোয়েন খুঁজে দেখছেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে মাঝেমধ্যে ছোট ঘুম বা ন্যাপ নেওয়া এই সমস্যার সমাধান হতে পারে কি না।

আর্কটিক সার্কেলের শিফট কর্মীদের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে ড. মোয়েন একটি বিশেষ বিষয় লক্ষ্য করেন। সেখানে গ্রীষ্মকালে সূর্য প্রায় অস্ত যায় না। ওই অঞ্চলের শিফট কর্মীরা কাজ শেষে বাড়ি ফিরে দীর্ঘক্ষণ একটানা ঘুমান না। পরিবর্তে, তাঁরা দুই দফায় ঘুমান—সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রথম দফা এবং বিকেলে পরবর্তী শিফটে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় দফা।

এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘বাইফেজিক স্লিপ’ বা ২৪ ঘণ্টায় দুই দফায় ঘুমানো। গবেষকদের মতে, কৃত্রিম আলো আবিষ্কারের আগে প্রাক-শিল্প যুগে মানুষ সাধারণত এভাবেই দুই দফায় ঘুমাত।

ভার্জিনিয়া টেকের ইতিহাসবিদ রজার একির্চ প্রাক-শিল্প যুগের ইউরোপের নথিপত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন, উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে দুই দফায় ঘুমানোই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। মানুষ সাধারণত রাত ৯টার দিকে ঘুমাতে যেত, মধ্যরাতের পর প্রাকৃতিকভাবেই ঘণ্টাখানেকের জন্য জেগে উঠত এবং প্রার্থনা বা সাংসারিক কাজ শেষ করে আবার দ্বিতীয় দফায় ঘুমাতে যেত। ১৮০৭ সালে লন্ডনের রাস্তায় গ্যাস বাতি চালু হওয়ার পর মানুষের জেগে থাকার সময় বাড়ে এবং এই দুই ঘুমের মধ্যবর্তী ব্যবধানটি হারিয়ে যায়।

ইতিহাসবিদ একির্চ মনে করেন, এই প্রাচীন চক্রটি মানুষের শরীর থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। আধুনিক যুগে অনেকের মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা অনিদ্রার সমস্যাটি আসলে কোনো রোগ নয়, বরং প্রাচীন এই অভ্যাসেরই একটি অবশিষ্টাংশ।

ড. মোয়েনের গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন কিছু স্পষ্ট চিকিৎসাগত নির্দেশিকা বা গাইডলাইন তৈরি করা, যা শিফট কর্মীদের সাহায্য করবে।

ড. মোয়েন বলেন, ‘শিফটের কর্মীরা রাতের ডিউটি শেষে দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমাতে না পেরে তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগেন। আমরা যদি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে পারি যে, বিকেলে একটি ভালো ঘুম বা ন্যাপ নেওয়া তাদের জন্য সমান উপকারী, তবে তাদের এই দুশ্চিন্তা কেটে যাবে।’

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ডিউটি চলাকালে বা পরে ২০ থেকে ৫০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে এবং কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি চালানোর ঝুঁকি কমায়। ড. মোয়েন জানান, শিফট কর্মীদের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে এবং তাদের বৈজ্ঞানিক উপায়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তার জন্য তাঁরা এই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত