বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে বন্যা একটি পরিচিত দুর্যোগ। বন্যার সময় দূষিত পানি, কাদা, জীবাণু, রাসায়নিক পদার্থ এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে চোখের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। অনেকে সামান্য চোখ লাল হওয়া কিংবা জ্বালাপোড়াকে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না করালে তা গুরুতর সংক্রমণ, এমনকি দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণও হতে পারে।
বন্যার সময় চোখের যেসব রোগ বেশি হয়—
১. কনজাংটিভাইটিস (চোখ ওঠা): বন্যার সময় বেশি দেখা যায় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত কনজাংটিভাইটিস। এর লক্ষণগুলো হলো—
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া
- পানি বা আঠালো পদার্থ বের হওয়া
- চোখে জ্বালাপোড়া ও চুলকানি
- সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় চোখের
- পাতা আটকে যাওয়া
এটি সংক্রামক হতে পারে, তাই আক্রান্ত ব্যক্তির তোয়ালে, রুমাল বা প্রসাধনী অন্যদের ব্যবহার করা উচিত নয়।
২. কর্নিয়ার সংক্রমণ (কেরাটাইটিস) : বন্যার দূষিত পানি কিংবা কাদা চোখে লাগলে কর্নিয়ায় ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক অথবা অন্যান্য জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেন, তাঁদের ঝুঁকি আরও বেশি। এর লক্ষণ—
- চোখের তীব্র ব্যথা
- আলো সহ্য করতে না পারা
- ঝাপসা দেখা
- চোখ দিয়ে অতিরিক্ত পানি পড়া
এটি একটি জরুরি অবস্থা। তাই দ্রুততম সময়ে চক্ষুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।
৩. অ্যালার্জিক কনজাংটিভাইটিস: বন্যার সময় বাতাসে ধুলাবালি, ছত্রাকের স্পোর ও বিভিন্ন অ্যালার্জেনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে অনেকের চোখে চুলকানি, পানি পড়া এবং লাল ভাব দেখা দিতে পারে।
৪. চোখে আঘাত ও বাইরের বস্তুর প্রবেশ:
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, ভাঙা কাঠ, টিন, কাচ বা ময়লা-আবর্জনার সংস্পর্শে এলে বাইরের বস্তু প্রবেশ করে চোখে আঘাত লাগতে পারে। এমন অবস্থায় চোখ ঘষা উচিত নয় এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
যাদের ঝুঁকি বেশি
- শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি
- ডায়াবেটিসের রোগী
- কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারকারী
- যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম
- উদ্ধার কার্যক্রম এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা
প্রতিরোধের উপায়
বন্যার পানি বা কাদা চোখে লাগলে দ্রুত পরিষ্কার কিংবা ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানিতে চোখ ধোয়া।
- অপরিষ্কার হাতে চোখ স্পর্শ না করা।
- নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।
- অন্যের তোয়ালে, রুমাল, বালিশ বা প্রসাধনী ব্যবহার না করা।
- কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীদের বন্যার সময় বিশেষ সতর্ক থাকা। সম্ভব হলে কয়েক দিন চশমা ব্যবহার করা।
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সময় সুরক্ষামূলক চশমা ব্যবহার।
- শিশুদের নোংরা পানিতে খেলতে না দেওয়া।
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
নিম্নোক্ত লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি থাকলে দেরি না করে চক্ষুবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন—
- হঠাৎ ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
- চোখের তীব্র ব্যথা ও সাদা দাগ দেখা
- চোখে রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করা
- চোখে আঘাত লাগা
- আলো সহ্য করতে না পারা
- চোখ দিয়ে অতিরিক্ত পুঁজ অথবা ঘন পদার্থ বের হওয়া
যা করা যাবে না
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েডযুক্ত চোখের ড্রপ ব্যবহার না করা।
- ফার্মেসির পরামর্শে অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
- গোলাপজল, মধু, লেবুর রস বা অন্য কোনো ঘরোয়া উপাদান চোখে দেবেন না।
- চোখ লাল হলেই নিজে নিজে ওষুধ শুরু করবেন না।
ডা. মো. আরমান হোসেন রনি, কনসালট্যান্ট (চক্ষু), দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবাহানবাগ, ঢাকা










