Ajker Patrika

ভয় নয়, সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা রক্ষা করবে জীবন

ডা. কাকলী হালদার
ভয় নয়, সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা রক্ষা করবে জীবন
প্রতীকী ছবি

জলাতঙ্ক বা র‍্যাবিস মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী রোগ। এটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য হলেও একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো ভ্যাকসিন গ্রহণ এবং র‍্যাবিসে আক্রান্ত প্রাণী কামড়ানোর পর সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী বিষয়টি জোরেশোরে আলোচনা করা হয়।

বিশ্ব ও বাংলাদেশে জলাতঙ্কের বর্তমান চিত্র

বৈশ্বিক পরিস্থিতি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়। তাদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশু এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বাসিন্দা।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি: আশার কথা হলো, বাংলাদেশে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে গত এক দশকে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। একসময় যেখানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২ হাজারের বেশি মানুষ জলাতঙ্কে মারা যেত, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি, ব্যাপক হারে কুকুরের টিকাদান এবং বিনা মূল্যে অ্যান্টি-র‍্যাবিস ভ্যাকসিন বিতরণের ফলে সেই সংখ্যা বর্তমানে প্রতিবছর ২০০ থেকে ৩০০-এর নিচে নেমে এসেছে। তবে এখনো অবহেলিত গ্রামীণ জনপদে সচেতনতার অভাব এবং জরুরি টিকা অপ্রাপ্তির কারণে বহু মৃত্যু ঘটছে।

সংক্রমণ কীভাবে ছড়ায়

জলাতঙ্ক রোগ সৃষ্টি করে র‍্যাবিস ভাইরাস, যা নিউরোট্রপিক র‍্যাবডোভাইরাস পরিবারের একটি অংশ। প্রধানত সংক্রামিত কুকুরের লালার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। বাংলাদেশে ৯৫ শতাংশের বেশি জলাতঙ্ক হয় কুকুরের কামড় বা আঁচড় থেকে। তবে বিড়াল, শিয়াল, বেজি, বানর বা বাদুড়ের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে।

আক্রান্ত প্রাণী কোনো মানুষকে কামড় দিলে, আঁচড় দিলে বা চামড়ার কোনো খোলা ক্ষতস্থানে বা মিউকাস মেমব্রেনে (চোখ, মুখ বা ঠোঁট) লালা লাগলে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করে।

ভাইরাসটি প্রথমে মাংসপেশিতে ছড়ায় এবং ধীরে ধীরে প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মস্তিষ্কে সংক্রমণ হলে রোগীর মধ্যে অস্থিরতা, পানি বা বাতাস দেখে ভয় পাওয়া, খিঁচুনি এবং শ্বাসনালির তীব্র সংকোচন শুরু হয়।

ঝুঁকি, লক্ষণ ও উচ্চ মৃত্যুহার

জলাতঙ্কের সুপ্ত অবস্থা সাধারণত ১ থেকে ৩ মাস হয়, তবে ক্ষতস্থানের অবস্থান ও গভীরতার ওপর ভিত্তি করে এটি ১ সপ্তাহ থেকে ১ বছর পর্যন্ত হতে পারে। কামড় যদি মুখ, ঘাড় বা হাতের কাছে হয়, তবে ভাইরাস খুব দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়।

গ্রামীণ ও শহরতলির অসচেতন মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে এই রোগের। শিশুরা ছোট হওয়ায় প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয় বেশি এবং কামড় বা আঁচড়ের কথা অনেক সময় অভিভাবকের কাছে গোপন করে। এ ছাড়া ভেটেরিনারি সার্জন, বনকর্মী ও প্রাণী সেবকদের ঝুঁকিও বেশি এই রোগের ক্ষেত্রে।

জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর এর মৃত্যুহার প্রায় শতভাগ। বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেঁচে ফেরার দৃষ্টান্ত বিরল।

প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

কামড়ানো বা আঁচড়ানোর পরপরই গৃহীত পদক্ষেপ জীবন বাঁচানোর প্রধান চাবিকাঠি।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা

কুকুর, বিড়াল বা শিয়ালে কামড়ানো বা আঁচড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থানটি প্রবহমান পরিষ্কার পানিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট যেকোনো ক্ষারযুক্ত কাপড় কাচা বা গোসলের সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। এটি ক্ষতস্থানে থাকা ভাইরাসের পরিমাণের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ক্ষতে কোনো বাঁধন দেওয়া, পোড়া মাটি, মরিচ বা চুনের প্রলেপ দেওয়া নিষেধ।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ভ্যাকসিনেশন

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস এবং প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস নির্দেশিকা মেনে চলা আবশ্যক।

১. প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা আগে থেকে ভ্যাকসিন নেওয়া:

পশুচিকিৎসক, ল্যাবের কর্মী, রেসকিউ টিমের সদস্যদের মতো যাঁরা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন।

ইন্ট্রাডার্মাল: শূন্য দিন এবং ৭ দিন—এই দুই দিনে চামড়ার ঠিক নিচে দুই বাহুতে ডোজ গ্রহণ করতে হয়।

ইন্ট্রামাসকুলার: মাংসপেশিতে নিলে শূন্য, ৭ এবং ২১ বা ২৮ নম্বর দিনে মোট ৩টি ডোজ নিতে হয়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

২. পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস কামড় বা আঁচড়ের পর:

যেকোনো প্রাণী কামড়ানোর পর দ্রুততম সময়ে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শে ভ্যাকসিন শুরু করতে হবে।

ইন্ট্রাডার্মাল: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী মাধ্যম। এটি শূন্য, ৩ এবং ৭ নম্বর দিনে উভয় বাহুর ডেল্টয়েড পেশির চামড়ার নিচে ২ স্থানে (২-২-২) দিতে হয়।

ইন্ট্রামাসকুলার: শূন্য, ৩, ৭ এবং ১৪ দিনে ১ ডোজ করে দিতে হয়।

ক্যাটাগরি-৩ ক্ষত, অর্থাৎ গভীর রক্তপাত বা একাধিক জায়গায় কামড়: ভ্যাকসিনের সঙ্গে প্রথম দিন ক্ষতস্থানে র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক।

৩. আগে ভ্যাকসিন দেওয়া থাকলে পুনরায় কামড়ালে করণীয়:

যদি কারও আগে পূর্ণাঙ্গ ভ্যাকসিন কোর্স করা থাকে এবং পরে আবার আশঙ্কাজনক প্রাণী কামড় বা আঁচড় দেয়, সে ক্ষেত্রে কোনো ইমিউনোগ্লোবিউলিন লাগবে না। শুধু শূন্য ও ৩ নম্বর দিনে মোট ২টি বুস্টার ডোজ নেওয়াই যথেষ্ট।

জলাতঙ্ক কোনো অলৌকিক বা অপচিকিৎসায় ভালো হওয়ার রোগ নয়। ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি চিকিৎসায় সময় নষ্ট করা মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। প্রতিটি কামড় বা আঁচড়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখে তাৎক্ষণিক সাবান-পানিতে ক্ষত ধোয়া এবং পূর্ণাঙ্গ টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা ‘জলাতঙ্কমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে পারি।

ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত