Ajker Patrika
স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস

সময়মতো রোগ নির্ণয় বাঁচাতে পারে জীবন

ডা. কাকলী হালদার
সময়মতো রোগ নির্ণয় বাঁচাতে পারে জীবন

নারীদের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো স্তন ক্যানসার। তবে আশার কথা হলো, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হলে এবং সঠিক চিকিৎসা পেলে এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। অথচ আমাদের সমাজে লজ্জা, সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক সংকোচের কারণে অনেকে শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, যা জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।

প্রতিবছর অক্টোবর মাসকে বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। একে অনেক সময় ‘পিংক অক্টোবর’ বলা হয়। প্রতিবার একটি নতুন বার্তা নিয়ে গোলাপি রিবন প্রতীকে সজাগ করা হয় পুরো বিশ্বকে। গোলাপি রঙের ফিতা এই সচেতনতা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক প্রতীক। এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্তন ক্যানসার সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা, নিয়মিত স্ক্রিনিং ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়ানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—‘এভরি স্টোরি ইজ ইউনিক, এভরি জার্নি ম্যাটার্স’ অর্থাৎ প্রতিটি গল্প অনন্য, প্রতিটি যাত্রাই গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষণগুলো চেনা খুব জরুরি

স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক উপসর্গগুলো জানা থাকলে খুব সহজেই তা ধরা সম্ভব। প্রধান লক্ষণগুলো হলো—

  • স্তনে বা বগলে ব্যথা ছাড়া বা ব্যথাসহ কোনো শক্ত চাকা বা পিণ্ড অনুভব হওয়া।
  • স্তনের আকার, আকৃতি কিংবা ত্বকের রঙের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা ত্বকে টোল পড়া।
  • স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে দেবে যাওয়া বা সেখান থেকে রক্ত কিংবা অস্বাভাবিক তরল নির্গত হওয়া।

মনে রাখা প্রয়োজন, সব চাকাই কিন্তু ক্যানসার নয়। তবে যেকোনো পরিবর্তন চোখে পড়লে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ঝুঁকি হ্রাস ও প্রতিরোধে করণীয়

যদিও নির্দিষ্ট কিছু জিনগত ও বংশগত ঝুঁকিকে থামানো যায় না, তবে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে এর আশঙ্কা অনেকটা কমানো সম্ভব।

  • অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর বিএমআই বজায় রাখা। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট কায়িক পরিশ্রম বা নিয়মিত ব্যায়াম করা।
  • শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা। ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা।
  • অপ্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি হরমোন থেরাপি গ্রহণ না করা।

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও পারিবারিক সমর্থন

আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় স্তনের যেকোনো সমস্যা লুকিয়ে রাখার একটি প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটানোর অন্যতম কারণ হলো এই দ্বিধা ও সংকোচ। পরিবারকে ক্যানসার রোগীর পাশে সহমর্মিতা ও সাহসের বার্তা নিয়ে দাঁড়াতে হবে। ক্যানসার কোনো অভিশাপ নয়, এটি একটি ব্যাধি; যার সঠিক চিকিৎসা রয়েছে। অক্টোবর মাসের মূল লক্ষ্যই হলো এই ট্যাবু ভেঙে ফেলা। আসুন, নিজ নিজ ঘরের নারীদের প্রতি যত্নশীল হই, স্বপরীক্ষা ও নিয়মিত স্ক্রিনিং সম্পর্কে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করি। লজ্জা পেছনে ফেলে সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও ক্যানসারমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

Breast-cancer

প্রাথমিক নির্ণয়ের সহজ তিন ধাপ

নিজে পরীক্ষা: ২০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে অন্তত একবার পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করা অত্যন্ত কার্যকর। এতে স্তনের যেকোনো পরিবর্তন দ্রুত চোখে পড়ে।

ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন: বছরে অন্তত একবার অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসক দ্বারা স্তন পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।

ম্যামোগ্রাম: ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি ১ থেকে ২ বছর পর পর ম্যামোগ্রাম (বিশেষ এক্স-রে) করা প্রয়োজন।

পরিবারে যদি স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকে, তবে আরও আগেই স্ক্রিনিং বা এমআরআই করা জরুরি।

পরামর্শ দিয়েছেন: ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত