Ajker Patrika

মৃত্যু থামেনি কোনো ব্যবস্থাতেই

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
মৃত্যু থামেনি কোনো ব্যবস্থাতেই
ফাইল ছবি

হাম বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে হামের সংক্রমণ এবং এই রোগে কমবেশি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত গত পাঁচ দশকের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। হিসাব নথিভুক্ত করার পর থেকে গত সাড়ে ৫ মাসে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে। প্রাদুর্ভাবের পর জরুরি টিকাদান কর্মসূচি, বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা এবং চিকিৎসাব্যবস্থা জোরদারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও মৃত্যু থামেনি।

জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদদের বিশ্লেষণ বলছে, এর পেছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের টিকাদানের ঘাটতি, রোগ শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, শিশুদের অপুষ্টি এবং হাম সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি। অর্থাৎ চলতি বছরের নজিরবিহীন প্রাদুর্ভাব শুধু একটি সংক্রামক রোগের বিস্তার নয়, দেশের টিকাদান ও রোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।

এ বছরের শুরু থেকে দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। তবে গত ১৫ মার্চ থেকে সরকার নিয়মিত পরিসংখ্যান রাখা শুরু করে। সেই থেকে এ পর্যন্ত হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৮৯৯ জনের। আর মৃতদের মধ্যে পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছিল আরও ১০০ জনের। ফলে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৯ জনে। এর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই বিভিন্ন বয়সের শিশু।

রোগতত্ত্ববিদেরা এবারের প্রকোপের প্রায় গোড়া থেকেই বলে আসছেন, প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুকেও সামগ্রিক মৃত্যুর হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। কারণ, সেই মৃত্যুগুলোও হামজনিত হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি। কথাটি বিবেচনায় নিলে, হামে গত ১৭৮ দিনে কার্যত গড়ে প্রতিদিন ৫ দশমিক ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২৩ এপ্রিলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, হামে আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশেরই বয়স ছিল পাঁচ বছরের কম। ৬৬ শতাংশের বয়স দুই বছরের কম এবং ৩৩ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। তখন উপসর্গযুক্ত মৃত্যুর বেশির ভাগই ছিল টিকা না নেওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে।

যেভাবে বেড়ে চলেছে মৃত্যু

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ দিকে এবং মে মাসে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব তীব্র হয়ে ওঠে। ৩ এপ্রিল মোট মৃত্যু ছিল ১০৩, ১৬ এপ্রিল তা বেড়ে ২০৬, ৪ মে ৩১১ এবং ১০ মে ৪০৯-এ পৌঁছায়। এরপর ২৩ মে মৃত্যু বেড়ে হয় ৫১২, ৩ জুন ৬০১ এবং ২৬ জুন ৭০২। ২২ জুলাই মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে ৮০৩-এ ওঠে। ১৫ আগস্ট তা বেড়ে ৯০২-এ পৌঁছায়। সর্বশেষ ৮ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ থেকে ৬০০ অতিক্রম করতে সময় লেগেছে প্রায় দুই মাস। এরপর এক মাসের কম সময়ে মৃত্যু ৭০০ ছাড়িয়েছে। পরের কয়েক সপ্তাহেই তা ৮০০ ও ৯০০ অতিক্রম করেছে। ১৫ আগস্টের ৯০২ থেকে মাত্র ২৪ দিনের ব্যবধানে ৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯৯। অর্থাৎ মৃত্যুর ধারা থামার আলামত নেই।

টিকা ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন

দেখা গেছে, এবারের প্রাদুর্ভাবে টিকা না পাওয়া এবং অল্পবয়সী শিশুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ডব্লিউএইচওর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি, ২০২৪-২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার সরবরাহ-সংকট এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী অতিরিক্ত টিকাদান অভিযান না হওয়ায় অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে।

গত ৫ এপ্রিল ১৮টি অগ্রাধিকারের জেলার ৩০টি উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান শুরু হয়। পরে চারটি সিটি করপোরেশন হয়ে ৩ মে থেকে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ঝুঁকিতে থাকা এবং নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা ছিল এই কর্মসূচির লক্ষ্য। তবে বয়সসীমার বাইরেও সংক্রমণ ছিল। জুনের শেষে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন করা হয়।

ডব্লিউএইচও বলছে, হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে এমআর টিকার দুই ডোজই দিতে হবে। জরুরি গণটিকাদান নিয়মিত কর্মসূচির বিকল্প নয়; এটি শুধু বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত সুরক্ষায় সহায়ক। পাশাপাশি হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার অংশ হিসেবে ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হয়। কারণ, অপুষ্ট ও ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতিতে থাকা শিশুদের গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বেশি। তাই এবারের প্রাদুর্ভাবে জরুরি টিকার পাশাপাশি নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা এবং ভিটামিন ‘এ’ পাওয়ার চিত্রও গুরুত্বপূর্ণ।

অপুষ্টির শিকার ও অল্পবয়সী শিশুর বাড়তি ঝুঁকি

হামে আক্রান্ত শিশুর পরিণতির ক্ষেত্রে টিকার ইতিহাসের পাশাপাশি বয়স ও পুষ্টিগত অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি ৩৫৪ জন হামে আক্রান্ত শিশুর ৪৩ শতাংশের বয়স ছিল ৩ থেকে ৯ মাস। তাদের ৬৫ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছিল। আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পূর্ণ বুকের দুধ পায়নি। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে এই হার ছিল ৮২ শতাংশ।

বয়স ও টিকার ইতিহাস অনুযায়ী ৩৪১ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশেরই হাম শনাক্ত হয়েছে। টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর ৯৭ শতাংশ, এক ডোজ নেওয়া ৪৮ শিশুর ৯২ শতাংশ এবং দুই ডোজ নেওয়া ২১ শিশুর ৭৬ শতাংশের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়। তবে এটি হাসপাতালভিত্তিক সীমিত পরিসরের গবেষণা। তাই দুই ডোজ নেওয়া শিশুদের মধ্যেও হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়ে টিকার কার্যকারিতা কমেছে বা টিকা কাজ করেনি—এমন সিদ্ধান্তে আসা যাবে না।

সরকারের অগ্রাধিকার নেই—বিশেষজ্ঞ মত

হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই বলে মনে করেন জাতীয় হাম-রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির সভাপতি এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত টিকাদান জোরদার করার পাশাপাশি সংক্রমণ বেশি, এমন এলাকায় আবার লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। জ্বর বা হামসদৃশ উপসর্গ দেখা দিলে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিচর্যাকারীদের সুরক্ষা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।’

মাহমুদুর রহমানের মতে, মাঠপর্যায়ে টিকাদান, জনবল এবং অর্থের ঘাটতির পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা দরকার।

রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘শুধু পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দিয়ে এবারের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় এনে বাদ পড়া শিশুদের তালিকা করে বাড়ি বাড়ি টিকা দিতে হবে।’

মৃত্যু কমাতে টিকাদানের পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপরও জোর দেন মুশতাক হোসেন। তাঁর মতে, আক্রান্ত অপুষ্ট শিশুদের দ্রুত দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতালে নেওয়া, দরিদ্র ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর এলাকায় চিকিৎসাসেবা বাড়ানো এবং জটিল রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতি সঠিকভাবে চিহ্নিত করে টিকাদানের অবস্থা যাচাই, বাদ পড়া শিশু শনাক্ত, জ্বরের রোগীদের নজরদারি ও দ্রুত চিকিৎসা—সব কটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে।

সরকারের বক্তব্য

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার শুরু থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘হাম সরকারের অগ্রাধিকারে না থাকলে দ্রুত জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হতো না। জনসচেতনতা বাড়াতেও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়েছে।’

মৃত্যুর হিসাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার বিষয়ে অধ্যাপক প্রভাত বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশু নিউমোনিয়া, কিডনি জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে মারা যেতে পারে; তাই উপসর্গ থাকা সব মৃত্যুকে সরাসরি হামের মৃত্যু বলা ঠিক নয়। হাম অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখে শনাক্ত ও চিকিৎসা করা হয়, কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যেতে পারে, সব রোগীর হাম ছিল না। ভাইরাসজনিত সংক্রমণের পর অন্য জটিলতাও তৈরি হতে পারে—মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।’

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলেও জানান প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, ৯ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস বয়স থেকে নিয়মিত টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দাবি, আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা আসবে এবং বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের টিকা দিতে চলতি মাসেই নতুন কর্মসূচি নেওয়া হবে। জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজও চলছে বলে জানান তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত