Ajker Patrika

২১ বছরে মাত্র ৮৬টি কিডনি প্রতিস্থাপন

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
২১ বছরে মাত্র ৮৬টি কিডনি প্রতিস্থাপন
ছবি: সংগৃহীত

দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয় চার দশক আগে। ইউরোলজি শল্যচিকিৎসক, কিডনি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনসের (বাউস) তথ্য বলছে, দেশে এ পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে। কিন্তু এ চিকিৎসায় সরকারের সর্বোচ্চ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে (এনআইকেডিইউ) গত ২১ বছরে কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে মাত্র ৮৬টি। অর্থাৎ দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকারি এ প্রতিষ্ঠানে প্রতিস্থাপনের সংখ্যা ১০০ ছাড়ায়নি।

সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে সারা দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন করছে ১০টির কম প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে কিডনি রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ২০০১ সালে এনআইকেডিইউ প্রতিষ্ঠা করে সরকার। ২০০৩ সালে ১০০ শয্যায় রোগী ভর্তি শুরু হয়। ২০১২ সালে শয্যা ১৫০ এবং ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৩০০ করা হয়। পরে ৫০০ শয্যার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন হলেও জনবল দেওয়া হয়নি। বর্তমানে ৪৫০ শয্যায় রোগী ভর্তি করা হলেও হাসপাতালটি চলছে ১৫০ শয্যার জনবলকাঠামো অনুযায়ী। এ কাঠামোয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর অনুমোদিত পদ রয়েছে সাড়ে ছয় শর মতো। শূন্য রয়েছে প্রায় ১০০ পদ। ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল পরিচালনায় প্রায় পৌনে তিন হাজার জনবল প্রয়োজন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয় ২০০৫ সালে। এরপর ২০০৮ সালে ৪টি, ২০০৯-এ ৮টি, ২০১০-এ ৪টি, ২০১১-এ ৫টি, ২০১২ ও ২০১৩ সালে ৩টি করে এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সালে একটি করে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর পাঁচ বছর এ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২০২১ সালে আবার প্রতিস্থাপন শুরু হলে ওই বছর ৩টি, ২০২২-এ ৫টি, ২০২৩-এ ১১টি, ২০২৪-এ ৮টি, ২০২৫-এ ১৭টি এবং চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১২টি প্রতিস্থাপন হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি ৮৬টি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছে।

এনআইকেডিইউর কিডনি প্রতিস্থাপন প্রধান সমন্বয়কারী ও ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. ফজল নাসের বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। দাতা ও কিডনি ম্যাচিং করাসহ বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। ২০১১ সালের পর দীর্ঘ সময় এনআইকেডিইউতে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রায় বন্ধ ছিল। ২০২১ সালে আবার কার্যক্রম শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বেড়েছে। প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে প্রায় ২০ জন রোগীর আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

কিডনি প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা নিয়ে অধ্যাপক নাসের বলেন, ‘বর্তমান জনবল, সার্জন ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা বিবেচনায় আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুত হলে আমরা সপ্তাহে দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন করতে পারব। বছরে প্রায় ১০০টি প্রতিস্থাপন করার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। সদিচ্ছা আছে, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞানও আছে।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কিডনি প্রতিস্থাপনের আগে কিডনি দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একাধিক ধাপে যাচাই করা হয়। প্রথমে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়। এরপর আইনগত কমিটি নথিপত্র পরীক্ষা করে অনুমোদন দেয়। কমিটিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি রয়েছেন। দাতার শারীরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকিও চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করেন।

হাসপাতাল ভবনটি চারতলা থেকে সম্প্রসারণ করে আটতলা করা হয়েছে। পঞ্চম তলায় ১০ শয্যার রেনাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আরআইসিইউ) স্থাপন করা হলেও জনবলের ঘাটতিতে বর্তমানে পাঁচটি শয্যা চালু রয়েছে। অন্যদিকে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু ক্রস-ম্যাচিং ও হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন (এইচএলএ) টাইপিং পরীক্ষা সেখানে হয় না। ফলে এসব পরীক্ষার জন্য রোগীরা যান অন্য প্রতিষ্ঠানে।

এনআইকেডিইউর ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ইউরোলজি ও নেফ্রোলজির সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারণে সে লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি। আগে সীমিতসংখ্যক নিকটাত্মীয় কিডনি দান করতে পারতেন। পরে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দাতার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রতিস্থাপনের সুযোগও বাড়ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সপ্তাহে দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব হবে।

ইউরোলজি বিভাগ জানায়, কিডনি প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি কিডনি, মূত্রনালি, মূত্রথলি ও প্রোস্টেটের জটিল অস্ত্রোপচারও নিয়মিত হয়। প্রতিদিন ২৫-৩০টি ছোট-বড় অস্ত্রোপচার হচ্ছে। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি বড় সীমাবদ্ধতা। ইউরোলজির প্রায় ৯৫ শতাংশ অস্ত্রোপচার মিনিমালি ইনভেসিভ, ল্যাপারোস্কোপিক ও এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে হয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পেলে আরও উন্নত অস্ত্রোপচার সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে রোবোটিক সার্জারি সিস্টেমের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, জীবিত দাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্রেন ডেথ হওয়া ব্যক্তির অঙ্গদানের (ক্যাডাভেরিক ডোনেশন) বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশ এভাবে কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও সচেতনতা বাড়লে প্রতিস্থাপনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।

এনআইকেডিইউর ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে বছরে ৩৫-৪০ হাজার রোগী রোগটির শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। চাহিদার তুলনায় প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা এখনো সীমিত।

কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সার্জনও কম। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিস্থাপন বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রতিস্থাপনের পর নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও অনেক রোগীর জন্য বড় বাধা।

ইউরোলজি ও নেফ্রোলজিতে উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয় এনআইকেডিইউ। এমএস, এমডিসহ উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত বছর প্রতিষ্ঠানটির বহির্বিভাগে ২ লাখ ৫ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। জরুরি সেবা নিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার এবং ভর্তি হয়েছে সাড়ে ১৩ হাজার। একই বছরে ৩৬৬ রোগীর মৃত্যু হয়। বছরজুড়ে ২ হাজার ১৭৬টি বড় ও ২ হাজার ৯৮২টি ছোট অস্ত্রোপচার হয়েছে। শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তির হার ১১৯ শতাংশ এবং হাসপাতালে রোগীর গড় অবস্থানকাল ১১ দিন।

এনআইকেডিইউর পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশেদ আনোয়ার বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিডনি প্রতিস্থাপনে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। করোনা মহামারিতে দীর্ঘ সময় কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এ পর্যন্ত কোনো জটিলতা ছাড়া ৮৬টি সফল প্রতিস্থাপন হয়েছে।’

কিডনি দাতার সংকটের কথা উল্লেখ করে রাশেদ আনোয়ার বলেন, লিভিং রিলেটেড ট্রান্সপ্লান্টে ডোনার পাওয়া কঠিন। নতুন আইনে ইমোশনাল ডোনারের সুযোগ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়েছে। এর মধ্যে ডোনারের প্রাপ্যতা, শারীরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাই করতে হয়। কিডনি রোগীদের অন্যান্য জটিলতার বিশেষায়িত সেবার সমন্বয় প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত