Ajker Patrika

জন্মগত গ্লকোমা শিশুদের চোখের অদৃশ্য শত্রু

ডা. মো. আরমান হোসেন রনি 
জন্মগত গ্লকোমা শিশুদের চোখের অদৃশ্য শত্রু
ছবি: সংগৃহীত

জন্মগত গ্লকোমা হলো এমন একটি চক্ষুরোগ, যা শিশুর জন্মের সময় বা জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে চোখের ভেতরের চাপ বাড়ার কারণে ঘটে। এটি বিরল রোগ। তবে চিকিৎসা ছাড়া তা স্থায়ীভাবে চোখের ক্ষতি এবং অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। জন্মগত গ্লকোমার মূল কারণ হলো চোখের অভ্যন্তরীণ তরল সঠিকভাবে নিষ্কাশিত না হওয়া, যা চোখের ভেতরের চাপ বাড়ায়।

কারণ ও বংশগত প্রভাব

জন্মগত গ্লকোমার প্রধান কারণ হলো চোখের কোণের অস্বাভাবিক গঠন। এ ক্ষেত্রে চোখের কোণ এমনভাবে তৈরি হয়, যাতে চোখের ভেতরের তরল সহজে বের হতে পারে। কিন্তু জন্মগত গ্লকোমা আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে এই কোণ ঠিকভাবে গঠিত হয় না। ফলে তরল সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারে না এবং চোখের চাপ বাড়ে।

বংশগত কারণ এই রোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিবারের মধ্যে থাকে এবং মা-বাবা যদি বংশগতভাবে এই রোগে আক্রান্ত হন, সন্তানেরও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া কিছু জিনগত কারণও জন্মগত গ্লকোমার সঙ্গে সম্পর্কিত।

উপসর্গ ও চিহ্ন

জন্মগত গ্লকোমার লক্ষণ শিশুর বয়স অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে সাধারণতভাবে কিছু উপসর্গ দেখা দেয় এ রোগের ক্ষেত্রে। যেমন—

» চোখের বৃদ্ধি: যেকোনো শিশু জন্মের পর বা কয়েক মাসের মধ্যে চোখের আকার বড় হয়ে দেখা দিতে পারে।

» চোখে পানি পড়া: শিশুর চোখ থেকে বারবার পানি পড়া এবং রোদে বা আলোর দিকে অস্বস্তি বোধ করা।

» হালকা বা ঝলমলে চোখ: আলোতে শিশুর চোখে অস্বস্তি বা জ্বালা অনুভূত হওয়া।

» চোখ বেঁকে যাওয়া: কিছু ক্ষেত্রে চোখ বেঁকে যাওয়ার মতো অস্বাভাবিক অবস্থান দেখা দিতে পারে।

নির্ণয়

জন্মগত গ্লকোমা নির্ণয়ে চোখের পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর বয়স অনুসারে নির্ণয় পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। পরীক্ষাগুলো হলো—

» চোখের চাপ পরিমাপ করা

» কর্নিয়ার পরিধি পরিমাপ

» গোনিওস্কপি

» আলট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য ইমেজিং টেস্ট

নির্ণয় যত দ্রুত করা হয়, তত ভালো ফল পাওয়া যায়। জন্মগত গ্লকোমা সাধারণত দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে। তাই চিকিৎসায় দেরি হলে স্থায়ী অন্ধত্ব হওয়ার আশঙ্কা আছে।

চিকিৎসা

জন্মগত গ্লকোমার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং দৃষ্টি সংরক্ষণ করা। চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো—

» অপারেশন

» গোনিওটোমি: চোখের কোণ খুলে তরলের নিষ্কাশন নিশ্চিত করা।

» ট্রাবেকুলেকটোমি: চোখের ভেতরের অতিরিক্ত চাপ কমাতে একটি রাস্তা তৈরি করা।

» গ্লকোমা ড্রেনেজ ইমপ্ল্যান্ট: একধরনের ছোট ডিভাইস চোখের ভেতরের তরল বের করার জন্য স্থাপন করা।

ওষুধ

» শিশুর বয়স অনুযায়ী চোখে টপিক্যাল ড্রপ বা ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সার্জারি অনেক সময় প্রথম পছন্দ।

» চিকিৎসার পরে শিশুর চোখ নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে দৃষ্টিশক্তি দীর্ঘ সময় ধরে রক্ষা করা সম্ভব।

জটিলতা

জন্মগত গ্লকোমার চিকিৎসা করা না হয়ে থাকলে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন—

» চোখের স্থায়ী ক্ষতি ও অন্ধত্ব

» চোখের বৃদ্ধি বা ডিফরমেশন

» চোখ বেঁকে যাওয়া বা কর্নিয়ার ক্ষতির মতো অন্যান্য সমস্যা প্রতিরোধ ও বংশগত পরামর্শ যেহেতু জন্মগত গ্লকোমার একটি গুরুত্বপূর্ণ বংশগত অংশ আছে, তাই পরিবারের ইতিহাস জানা গুরুত্বপূর্ণ।

» প্রসবপূর্ব জিন পরামর্শ: বংশগত রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

» নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা: জন্মের পর শিশুর চোখের স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।

» প্রাথমিক শনাক্তকরণ: দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা রোগের বৃদ্ধি কমাতে সহায়ক।

মনে রাখবেন, শিশুর জন্মগত গ্লকোমা হলো একটি গুরুতর কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য চোখের রোগ। দ্রুত নির্ণয় ও সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুকে অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করা যায়।

ডা. মো. আরমান হোসেন রনি,

কনসালট্যান্ট (চক্ষু), দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবহানবাগ, ঢাকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত