Ajker Patrika

মহাখালীর হাসপাতালপাড়া

সন্ত্রাসী চক্রের দাপটে আতঙ্কে চিকিৎসকেরা

  • কর্মচারী সমিতির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কর্মচারী নেতাকে হত্যা।
  • দরপত্র বাগাতে হাসপাতালের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, হুমকি।
  • হত্যা ও একটি হামলার ঘটনার নেপথ্যে এল একই ব্যক্তির নাম।
  • সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের কিছু কর্মচারীর যোগসাজশ।
আমানুর রহমান রনি, ঢাকা
সন্ত্রাসী চক্রের দাপটে আতঙ্কে চিকিৎসকেরা
প্রতীকী ছবি

রাজধানীর সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী চক্রের হামলা, হুমকিতে আতঙ্কে রয়েছেন চিকিৎসক-কর্মচারীরা। এসব প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিং নিয়োগ, দরপত্র, চাঁদাবাজি, কর্মচারী সমিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসী চক্রগুলোর আধিপত্য বিস্তারের বিরোধে লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে হাসপাতালগুলোর কিছু কর্মচারীর আঁতাত রয়েছে। কর্মচারী সমিতির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের গুলিতে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের এক কর্মচারী নেতা খুন হয়েছেন। দুই হাসপাতালের উপপরিচালককে কোপানো হয়েছে। হামলার শিকার হয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে কয়েকজনকে। হামলার পর কেউ বদলি হয়েছেন, কেউ কর্মস্থলে ফেরেননি।

এ পরিস্থিতিতে সরকার মহাখালীর হাসপাতালপাড়ায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি সব হাসপাতালে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।

মহাখালীর বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সূত্র বলেছে, বাইরের সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের কিছু কর্মচারীর যোগাযোগ থাকায় তাঁরা কর্মচারীদের নির্দেশ দিতে এবং কথা না শুনলে অভিযোগ করতে ভয় পান। মুহূর্তে তথ্য বাইরে চলে যাচ্ছে। এরপর বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহাখালীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী জামাল হোসেন হত্যার নেপথ্যেও রয়েছে বাইরের সন্ত্রাসী চক্র ও হাসপাতালের কর্মচারীদের আঁতাত। জামালকে গত বছরের ১ আগস্ট রাতে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ আগস্ট তিনি মারা যান। তিনি হাসপাতালের কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে সমিতির অফিসের সামনেই গুলি করা হয়েছিল। পুলিশ বলছে, কর্মচারী সমিতির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড।

পুলিশ বলেছে, তদন্তে জামাল হত্যার নেপথ্যের ব্যক্তি হিসেবে নাম এসেছে মহাখালীর হাসপাতালপাড়ার দরপত্র নিয়ন্ত্রণকারী সন্ত্রাসী আজিজুল ওরফে রুবেলের।

এ ঘটনায় বনানী থানায় নিহত জামালের বোন দিলারা আক্তার শেপুর করা হত্যা মামলায় আজিজুল ওরফে রুবেলসহ আটজনকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় রতন মোল্লা, আফজালসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তাঁরা দুই মাসের মধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। প্রধান আসামি আজিজুল ওরফে রুবেল পলাতক। অন্য আসামিরা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন।

মামলাটি প্রথমে বনানী থানার পুলিশ এবং পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ তদন্ত করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিহত জামাল হোসেন দীর্ঘদিন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সেখানে দুটি পক্ষ রয়েছে। জামালকে আর নির্বাচন না করতে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্যে ধারণা করা হচ্ছে, এ কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। মামলায় হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীও আসামি। তাঁরা জামিনে আছেন। তবে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই মামলার প্রধান আসামি আজিজুলের বক্ষব্যাধি হাসপাতালসহ মহাখালীর বিভিন্ন হাসপাতালে আধিপত্য রয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে তাঁর অনুগত কিছু কর্মচারী রয়েছেন। হাসপাতালের কেনাকাটা, দরপত্র ও আউটসোর্সিং নিয়োগের বিষয়ে তথ্য ওই কর্মচারীদের মাধ্যমে আগেভাগেই পেয়ে যান তিনি। সমিতির নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধেই জামাল খুন হয়েছেন।

নিহত জামালের ভাই জসীম উদ্দিন বলেন, সন্ত্রাসী রুবেল তাঁর পছন্দের ইব্রাহীম খলিলকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য জামালকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে নিষেধ করা হয়েছিল। না শোনায় তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

ইব্রাহীম খলিল বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়। ওই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, কোনো সন্ত্রাসীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই।

মামলা তুলে নিতে হুমকির অভিযোগ করেছেন জামালের পরিবারের সদস্যরা। নিহত জামালের স্ত্রী শিরিন আক্তার বলেন, মামলা তুলে নিতে সন্ত্রাসীরা নিয়মিত তাঁদের হুমকি দিচ্ছে। আজিজুল ওরফে রুবেল বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে মামলা তুলে নিতে বলছেন। সন্তানদের অপহরণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকে দুই মাস আগে মারা গেছেন জামালের বড় ভাই সালাহ উদ্দিন সজল। এ ঘটনায় তাঁরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

জামালের ভাই জসীম উদ্দিন বলেন, হুমকির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ তাঁদের সতর্ক থাকতে বলেছে। এ জন্য তিনি বেশির ভাগ সময় বাসাতেই থাকেন।

চলতি বছরের ২০ এপ্রিল মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেনকে কুপিয়েছে দুই সন্ত্রাসী। তিনি ওই হাসপাতালের দরপত্র কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

র‍্যাব বলেছে, ওই হাসপাতালের ঠিকাদারিকাজের দরপত্রকে কেন্দ্র করে ওই চিকিৎসকের ওপর হামলা হয়েছে। সন্ত্রাসী আজিজুল ওরফে রুবেলের প্রতিষ্ঠান ‘ইএমই ট্রেডার্স’ কাজটি না পাওয়ায় তিনি বিদেশ থেকে ওই চিকিৎসককে কয়েকবার হুমকি দেন। পরে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের দিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। সন্ত্রাসী চক্রটি হাসপাতাল এলাকায় আটটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত।

ডা. আহমদ হোসেনের ওপর হামলার ঘটনায় ২১ এপ্রিল বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করে মামলা হয়। পরে র‍্যাব পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

হামলায় আহত ডা. আহমদ হোসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে পরে গ্রামে চলে যান। ওই কর্মস্থলে যোগ দেননি। তাঁর স্থলে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, দরপত্র কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্যই নতুন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ২১ মে ডা. আহমদ হোসেন বলেছিলেন, তিনি আগে হুমকি পেয়েছিলেন। তবে হামলা হবে, তা কল্পনাও করেননি। হামলাকারীদের তিনি চিনতেন না। তারা মুখোশ পরা ছিল।

এর আগে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম তুহিনও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। তবে আতঙ্কের কারণে তিনি মামলা করেননি। পরে তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে বদলি হন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ঘটনার পর অফিস থেকে থানায় অভিযোগ করার কথা উঠেছিল, কিন্তু পরে আর করা হয়নি।

এ ছাড়া বক্ষব্যাধি হাসপাতালের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মেহেদীকেও বাসার সামনে কুপিয়ে আহত করা হয়। জানা গেছে, এর পেছনেও রয়েছে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সন্ত্রাসীকে চাঁদা না দেওয়ায় মহাখালীর নার্সিং কলেজে বহুতল ভবন নির্মাণকাজ চলাকালে শ্রমিকদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা।

সূত্র বলেছে, দরপত্র পেতে ও চাঁদার দাবিতে মহাখালীর হাসপাতালপাড়ার চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের প্রায়ই হুমকি দেওয়া হয়। সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মমিনুর রহমানকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, দরপত্র না দিলে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি থানায় জিডি করেন এবং বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেও জানান। তবে তিনি দরপত্র কার্যক্রমের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র কার্যক্রম চলছে।

কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং মহাখালীর ওষুধের দোকানগুলোতেও সন্ত্রাসীদের চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।

শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) আউটসোর্সিংয়ে নিজেদের লোকদের নিয়োগ দিতে ১৬ মে দুপুরে হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক রাশিদুল আলমকে কক্ষে ঢুকে অস্ত্রের মুখে হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় আল-আমীন ও স্বপন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানকে ডাকযোগে বেনামে চিঠি পাঠিয়ে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বেনামে পাঠানো চিঠিতে হত্যার হুমকি পেয়েছেন। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে। তারা তদন্ত করছে।

চিকিৎসকদের নিরাপত্তায় সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মহাখালীর হাসপাতালপাড়ায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতালে আনসার সদস্য মোতায়েন এবং জরুরি অ্যালার্ম ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ২২ মে আজকের পত্রিকাকে বলেছিলেন, হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য জেলা, উপজেলাসহ প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে আনসার সদস্য দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পাইলট প্রকল্পের আওতায় বড় হাসপাতালে জরুরি অ্যালার্মের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, দরপত্রে অনিয়ম করতে পারছে না বলেই চিকিৎসকদের হামলার টার্গেট করা হচ্ছে। দুর্নীতিবাজেরা তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিয়ম করতে চায়। যা-ই ঘটুক, কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি করতে দেওয়া হবে না। সবকিছু ঠিক করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত