Ajker Patrika

সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি প্রায় ১ লাখ: বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগ

  • অসুস্থদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি।
  • গতকাল পর্যন্ত মারা গেছেন ৪৬ জন ।
  • শিশুদের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতার পরামর্শ।
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬: ৫৯
কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে নাক-মুখ ঢেকে গন্তব্যে যাত্রা। গতকাল রাজশাহীর রেলগেট এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে নাক-মুখ ঢেকে গন্তব্যে যাত্রা। গতকাল রাজশাহীর রেলগেট এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশে তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র শীত চলছে। কিছু অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা নেমে গেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। এই অবস্থায় সারা দেশে ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত দুই মাসে প্রায় ১ লাখ বিভিন্ন বয়সের মানুষ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে প্রায় অর্ধশত রোগীর মৃত্যুও হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন (এআরআই) বা শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৯৮ হাজার ৭৪১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৬ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৬৯ হাজার ১৮৬ জন রোগী। আর এআরআইজনিত জটিলতায় ভর্তি হওয়ার সংখ্যা ২৯ হাজার ৫৫৫ জন।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, শীতের প্রকোপে শিশু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই শীতে রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, এআরআই, ব্রঙ্কিওলাইটিসসহ শ্বাসতন্ত্রের অসুখ এবং ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা গেছে।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁদের হাসপাতালে আসা মোট রোগীর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত। বাকি রোগীরা মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগে অন্যান্য সমস্যা নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন।

ডা. মো. মাহবুবুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রোগীর মোট সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গেছে, এটা নয়। তবে শীত পড়ার পর থেকে ঠান্ডা-কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা রোগীর চাপ বেড়েছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশ শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় ভুগছে। আমাদের হাসপাতালে সব সময়ই ভর্তি রোগীর চাপ থাকে, কারণ শয্যাসংখ্যা সীমিত। শীতকালে সেই চাপ আরও স্পষ্ট হয়।’

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুদের ঠান্ডাজনিত রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ এ বয়সের মধ্যে তাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত হয় না। এর মধ্যে শীতের সময় তাপমাত্রা কমে গেলে শ্বাসনালির স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সহজে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এই সময়ে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (এআরআই), ব্রংকিওলাইটিস ও সর্দি-কাশি শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী ও অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ দ্রুত জটিল রূপ নেয় এবং শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের ঘাটতি ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত উষ্ণতার ব্যবস্থা এবং সময়মতো চিকিৎসা না হলে ঠান্ডাজনিত এসব রোগ শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআরআইজনিত রোগে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ভর্তি রয়েছেন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দারা। এ বিভাগে সাড়ে ৮ হাজার রোগী ভর্তি হয়েছেন। জেলাভিত্তিক হিসেবে নরসিংদীতে সোয়া ৫ হাজার, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, সিলেট ও মৌলভীবাজারে ১ থেকে ২ হাজার রোগী ভর্তি হয়েছেন। ডায়রিয়াজনিত রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে। ওই অঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার রোগী ভর্তি হয়েছেন। এআরআইজনিত রোগে মোট ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে ১৬, ময়মনসিংহে ৯ এবং খুলনায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে সারা দেশে ডায়রিয়াজনিত রোগে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৫ জনই চট্টগ্রামে।

দেশের উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও শীতজনিত রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশু রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, আগের তুলনায় শিশুদের জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং ডায়রিয়ার ঘটনা বেশি দেখা দিয়েছে। রোগীদের ছাড়পত্র দেওয়ার সময় অভিভাবকদের সঙ্গে বিস্তারিত কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। এই শীতের সময় শিশুদের বিশেষভাবে সতর্ক রাখা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত ‘এক্সপোজার টু কোল্ড অ্যান্ড রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনস’ শিরোনামের গবেষণায় বলা হয়েছে, শীতকালে তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেলে মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এর ফলে শ্বাসনালির সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, সর্দিজ্বর, হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, শীত মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি জটিল থাকতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের উষ্ণ রাখা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া নিউমোনিয়ার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া এবং ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে দেরি না করে চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত