Ajker Patrika

নতুন সরকার: স্বাস্থ্যে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

  • অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয়ে যায় স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ।
  • ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় জনবল ও ওষুধের সংকট।
  • বিশেষায়িত চিকিৎসা ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক।
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
নতুন সরকার: স্বাস্থ্যে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
ফাইল ছবি

স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, বেড়েছে গড় আয়ু। তবে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা। নতুন সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হবে। হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম হাতে নেওয়া তাদের জন্য উত্তম বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতাগুলো দীর্ঘদিনের ও জটিল। সমস্যাগুলো সহজে সমাধান হয়নি। বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে বড় এই খাতকে ঢেলে সাজানো সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য খাতে কোনো সেক্টর কর্মসূচি নেই। স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো; প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা; হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থাপনা; সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ; টিকা, পুষ্টি কার্যক্রমসহ ৩০টির বেশি কর্মসূচি পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হতো। সর্বশেষ চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে। ওই বছরের জুলাই থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ১ লাখ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে তা অনুমোদন হয়নি। ইতিমধ্যে কার্যক্রমগুলোকে রাজস্বের আওতায় নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

কিছু কার্যক্রম রাজস্ব খাতে নেওয়া হলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সেগুলো কার্যকর হয়নি।

পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে সেক্টর কর্মসূচি নেই। তিন দশকের বেশি সময় ধরে যে কার্যক্রমগুলো সেক্টর কর্মসূচির আওতায় চলেছে, সেগুলো পরিকল্পনা ছাড়া বাদ দেওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।’

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত কার্যক্রমগুলো রাজস্ব খাতে নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়নি। সরকার কর্মসূচি বন্ধ করে দিলেও সময় নিয়ে পরিকল্পনার মাধ্যমে তা করা উচিত ছিল। জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)।

সেক্টর কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় জরুরি টিকা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট দেখা গেছে।’

আবু জামিল ফয়সালের মতে, নতুন সরকারকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, নীতি প্রণয়ন এবং জনবলসংকট মোকাবিলায় বড় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ একীভূত করার উদ্যোগ পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করার বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া নতুন কোনো উদ্যোগ সুফল বয়ে আনবে না। চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নয়ন, পুষ্টি কার্যক্রম শক্তিশালী করা, নার্সিং সেবা, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও অন্যতম বড় করণীয়। শহরাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যত অনুপস্থিত। স্বাস্থ্য বাজেট পরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধি এবং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে হাসপাতালের শয্যার সংখ্যা অপ্রতুল। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ অত্যধিক। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বা অপ্রতুল। ফলে রোগীরা বড় শহরের হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন। ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো জনবল ও ওষুধের সংকটে ভুগছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশাধিকার সীমিত। বিশেষায়িত চিকিৎসা মূলত ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরে কেন্দ্রীভূত। ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ, স্নায়বিক ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় দেশের সক্ষমতা সীমিত। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাচ্ছে। অন্যদিকে দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নেই। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট বেশি।

দেশের জিডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের আকার ৩ শতাংশের কম। আর কয়েক বছর ধরে জাতীয় বাজেটে ৫ শতাংশের কাছাকাছি স্বাস্থ্য বরাদ্দ। ওই বাজেটের বড় অংশ অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয় হলেও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ কম। ফলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জন পিছিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ জনগণ নিজ পকেট থেকে বহন করে। ওষুধ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ওষুধের দাম ও সরবরাহে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার শুধু সামাজিক খাতের উন্নয়ন নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারের সামনে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ বৃদ্ধি, অর্থায়ন সংস্কার এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের সাবেক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হকের মতে, নতুন সরকারের সামনে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসা নেয়। এই স্তরগুলোকে শক্তিশালী করতে পারলে বড় একটি জনগোষ্ঠীকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে। স্বাস্থ্যসেবা এমন হতে হবে, যাতে মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা না পড়ে।

দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ওষুধে ব্যয় হয় জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, অনেকে এই ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে না পেরে অসুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এমনকি মারা যায় অনেক মানুষ। ওষুধের খরচ কমানো ও বিনা মূল্যে প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

মোজাহেরুল হক বলেন, লক্ষ্য হওয়া উচিত, মানুষ যাতে অসুস্থ না হয়। রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং তারা সেই অর্থ পুষ্টি, বাসস্থান ও শিক্ষায় ব্যয় করতে পারবে, যা জাতীয় উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত