Ajker Patrika

দেশে বাড়ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা: অবহেলা নয়, সচেতন হোন

ডা. কাকলী হালদার
দেশে বাড়ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা: অবহেলা নয়, সচেতন হোন

জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা—আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে এসব উপসর্গে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে সাধারণ সর্দি-কাশি মনে হলেও এর পেছনে থাকতে পারে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। দেশে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে নিয়মিত নজরদারি চলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুমি ধরনে পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা কী

ইনফ্লুয়েঞ্জা হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট একটি অত্যন্ত সংক্রামক শ্বাসতন্ত্রের রোগ। সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা এ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস বি মানুষের মৌসুমি রোগের প্রধান কারণ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নির্গত ছোট ছোট কণার মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকা, বন্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা এবং দূষিত হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ করার মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণ সর্দি-কাশির চেয়ে অনেক সময় বেশি তীব্র হয়। হঠাৎ জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা, প্রচণ্ড শরীর ব্যথা, শুকনা কাশি, গলাব্যথা ও দুর্বলতা—এগুলো এর সাধারণ লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে বমি বা ডায়রিয়াও দেখা দিতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

এতে আক্রান্ত বেশির ভাগ সুস্থ মানুষ কয়েক দিন থেকে এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাঁদের হাঁপানি, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশি। ইনফ্লুয়েঞ্জার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হলো নিউমোনিয়া। কখনো কখনো ভাইরাসের পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়ার সেকেন্ডারি ইনফেকশন হতে পারে। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য অঙ্গের জটিলতাও হতে পারে।

উপসর্গ দেখে কি নিশ্চিত হওয়া যায়

শুধু উপসর্গ দেখে ইনফ্লুয়েঞ্জা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এর উপসর্গ কোভিড-১৯, আরএসভি এবং অন্যান্য রেসপিরেটরি ভাইরাসের সংক্রমণের সঙ্গে অনেকটা মিলে যেতে পারে। তাই শুধু জ্বর বা কাশি দেখে কোন ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে, তা নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট অথবা আরটি-পিসিআর করা যেতে পারে। বিশেষ করে হাসপাতালে ভর্তি রোগী, গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি, ঝুঁকিপূর্ণ রোগী কিংবা স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনে ল্যাবরেটরি ডায়াগনোসিস গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ তৈরি করতে পারে—এমন ভাইরাসের নজরদারি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় ইনফ্লুয়েঞ্জা এ, আরএসভি এবং এসএআরএস, এসএআরএস-সিওভি-২-এর বিস্তার একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, দেশে শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ করতে পারে—এমন ভাইরাসের ধরন জলবায়ু এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক কি প্রয়োজন

এখানেই আমাদের বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত রোগ; তাই সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। শুধু জ্বর বা কাশি হলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় কার্যকর ওষুধ পাওয়া কঠিন হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। বিশেষ করে গুরুতর রোগী বা উচ্চ ঝুঁকির ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।

কখন ওষুধ প্রয়োজন হবে তা চিকিৎসক রোগীর বয়স, উপসর্গ, ঝুঁকি ও রোগের তীব্রতা বিবেচনা করে নির্ধারণ করবেন।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন

শ্বাস নিতে কষ্ট, বুকব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি, ঠোঁট নীলচে হওয়া, পানিশূন্যতা, দীর্ঘস্থায়ী বা পুনরায় বেড়ে যাওয়া জ্বর এবং শিশুদের ক্ষেত্রে খেতে বা পান করতে না পারা—এসব সতর্কসংকেত। এমন পরিস্থিতিতে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক রেসপিরেটরি ভাইরাস সারভাইলেন্সে ইনফ্লুয়েঞ্জার ধরন বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবর্তনশীল রয়েছে এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা এ এখনো প্রধানভাবে শনাক্ত হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা অ্যাকটিভিটি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তবে ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক রোগ নির্ণয়, দায়িত্বশীল চিকিৎসা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের অভ্যাস। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের অসুস্থতাকে সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে অবহেলা না করে উপসর্গের তীব্রতা ও ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি। সচেতন থাকলে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ ও গুরুতর জটিলতা—দুটিই অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত