Ajker Patrika

হামে মৃত্যু আবার ঊর্ধ্বমুখী

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩: ০১
হামে মৃত্যু আবার ঊর্ধ্বমুখী
ফাইল ছবি

দেশে গত পাঁচ মাসে হাম এবং এর উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে নয় শর বেশি মানুষ। মৃতদের বেশির ভাগ শিশু। হামের প্রকোপ ঠেকাতে নেওয়া বিশেষ কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও সংক্রমণ ও মৃত্যু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধে মৃত্যু কমলেও এই নিম্নমুখী ধারা স্থায়ী হয়নি। জুলাইয়ের মাঝামাঝি আবার মৃত্যু বাড়তে শুরু করে। বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে আসছে। রোগতাত্ত্বিকভাবে এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৬ থেকে ১২ জুলাই এই সপ্তাহে হাম এবং এর উপসর্গে মৃত্যু ছিল ১৭ জনের। পরের সপ্তাহে (১৩ থেকে ১৯ জুলাই) তা বেড়ে ৩০ জন এবং ২০ থেকে ২৬ জুলাই ৩২ জনে দাঁড়ায়। ২৭ জুলাই থেকে ২ আগস্ট সাময়িকভাবে কমে ২৪ জন হলেও পরের দুই সপ্তাহে আবার বেড়ে যথাক্রমে ২৯ ও ৩৫ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ৬ থেকে ১২ জুলাইয়ের তুলনায় ১০ থেকে ১৬ আগস্ট এই সপ্তাহে হাম এবং এর উপসর্গে মৃত্যু বেড়েছে ১০৬ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, সংক্রামক রোগের তথ্য বিশ্লেষণে সোমবার থেকে রবিবারকে একটি রোগতাত্ত্বিক সপ্তাহ ধরা হয়। ক্যালেন্ডার মাসের দিনসংখ্যার পার্থক্য এড়াতে বিশ্বজুড়ে এ পদ্ধতিতে রোগের তথ্য তুলনা করা হয়। এই প্রতিবেদনে সে অনুযায়ীই হামের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সরকারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশে হাম এবং এর উপসর্গে মোট মৃত্যু ছিল ৭৫৮ জন। এরপর মৃত্যুর ধারা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়। ২৬ জুলাই পর্যন্ত মোট মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ৮২০ জনে। গতকাল ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৯১৮ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে হামে ৯৯ এবং হামের উপসর্গে ৮১৯ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ৬ জুলাই দেশে হাম এবং এর উপসর্গের রোগী ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ জন এবং হাম রোগী ১২ হাজার ৭৯১ জন। ২৬ জুলাই তা বেড়ে যথাক্রমে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৩ ও ১৫ হাজার ৪৪২ জনে দাঁড়ায়। গতকাল ১৮ আগস্ট মোট উপসর্গের রোগী দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ জন। আর ১৭ হাজার ৯৮৯ জন নিশ্চিত হামের রোগী। গতকাল সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৮০ জন।

সংক্রমণ বন্ধ হয়নি

হামে মৃত্যুর নিম্নমুখী ধারা স্থায়ী না হওয়ার পেছনে এখনো সংক্রমণ চলতে থাকাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। হাম-রুবেলা নির্মূলবিষয়ক ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির চেয়ারম্যান ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনলেও ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম হচ্ছে। আবার ছয় মাসের বেশি বয়সী সব শিশু টিকার আওতায় আসেনি। ফলে সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।’

ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘সংক্রমণ যদি বন্ধ না হয়, নতুন রোগী হবে। হামের স্বাভাবিক জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এরই পরিণতিতে মৃত্যু বাড়বে।’

শুধু টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন ডা. মাহমুদুর রহমান। তাঁর মতে, জ্বর শুরুর পর র‍্যাশ ওঠার আগেই হামের সংক্রমণ বেশি ছড়ায়। এ সময়ে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখার বিষয়ে পরিবারগুলোকে যথেষ্ট সচেতন করা হয়নি। টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা রাখা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

টিকা কর্মসূচিতে কারা বাদ পড়ল

গত ৫ এপ্রিল হামের প্রাদুর্ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ৮ এপ্রিল চার সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে তা সম্প্রসারণ করা হয়। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। এটি লক্ষ্যমাত্রার ১০৭ শতাংশ।

জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) সাবেক সদস্য অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংক্রমণ প্রতিরোধে যত শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন, তা সম্ভব হয়নি। টিকাদান কর্মসূচির প্রচার-প্রচারণা, প্রস্তুতি ও লক্ষ্য নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। এ কারণেই সংক্রমণ প্রত্যাশিতভাবে কমছে না।’

এমন প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম-রুবেলার টিকা থেকে বাদ পড়া ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি হামের ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রচার ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোগী ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে টিকাবিষয়ক আন্তসংস্থা সমন্বয় কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকার জন্য শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় সম্প্রতি ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির সময়। একই বয়সসীমায় ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ শিশু। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় বড় পার্থক্য দেখা যায়।

মৃতদের অর্ধেক ৯ মাসের কম বয়সী

হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। গত ২০ জুলাই পর্যন্ত তাদের এক হিসাব বলছে, নিশ্চিত হাম রোগীদের ২৪ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম। ১১ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস, ১১ শতাংশের ৯ মাস থেকে ১ বছর, ১৯ শতাংশের ১ থেকে ৪ বছর, ১৬ শতাংশের ৫ থেকে ৯ বছর, ৬ শতাংশের ১০ থেকে ১৪ বছর এবং ১৪ শতাংশের ১৫ বছর বা তার বেশি।

নিশ্চিত হামে মৃতদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম এবং ৩০ শতাংশের ৬ থেকে ৯ মাস। অর্থাৎ মৃতদের অর্ধেকই ৯ মাসের কম বয়সী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামের টিকাদান কর্মসূচির পর আক্রান্ত শিশুদের ৫৮ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। টিকা ক্যাম্পেইনের আগে এ হার ছিল ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ ক্যাম্পেইনের পর পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হার কমেছে।

নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। ফলে এর আগে শিশুরা নিয়মিত টিকার সুরক্ষা পাওয়ার আগেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।

ক্ষুদ্র পরিকল্পনায় নজর

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন করে মাইক্রোপ্ল্যানের (ক্ষুদ্র পরিকল্পনা) মাধ্যমে টিকাবঞ্চিত শিশু এবং সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মাধ্যমে কোথায় টিকাদানের আওতা কম, কোথায় ‘জিরো ডোজ’ শিশু রয়েছে এবং কোথায় টিকাদান সেশন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা হবে। সামগ্রিক কভারেজের পাশাপাশি টিকা না পাওয়া শিশু এবং সংক্রমণের বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি পাঁচ বছরের বেশি বয়সী টিকাবঞ্চিত শিশুদের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। টিকা না পাওয়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে পারলে পাঁচ বছরের নিচের এবং বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ এতটা ছড়িয়ে পড়ত না।’

হামের মতো অতি সংক্রামক রোগ শুধু বড় হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ডা. মুশতাক। তাঁর মতে, কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণের পকেটগুলো চিহ্নিত করে শুরুতে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন ছিল। এখনো এসব এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক ও স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এটি কোনো মৌসুমি প্রবণতা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিকাদান ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে হাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।

প্রতিরোধক্ষমতা যাচাইয়ের উদ্যোগ

এদিকে হামে আক্রান্ত এবং টিকা দেওয়া শিশুদের মধ্যে সেরো সার্ভিলেন্স (রক্ত পরীক্ষা করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যাচাই) করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কতটুকু তৈরি হয়েছে, তা দেখতে সেরো সার্ভিলেন্স করা হচ্ছে। আইইডিসিআর ও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এই গবেষণা করছে।’

মহাপরিচালক দাবি করেন, হামের বর্তমান পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক। কাজ শুরু হওয়ার সময়ের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। একসময় প্রতিদিন হাজারের বেশি উপসর্গের রোগী শনাক্ত হলেও এখন তা সব সময় হাজারের নিচে থাকছে।

ডা. প্রভাত বলেন, ‘হামে মৃত্যু কমেছে। এখন নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচিতে হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে। হামের উপসর্গ নিয়ে যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তারা মূলত নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতায় মারা যাচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত