বিগত কয়েক দশকে টিকা সম্প্রসারণ কর্মসূচির (ইপিআই) অভাবনীয় সাফল্যের পর আমরা যখন ভেবেছিলাম, হাম ইতিহাস হতে চলেছে, ঠিক তখনই এই ভাইরাস নতুন করে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এই হঠাৎ প্রকোপ
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস রোগ। সাম্প্রতিক সময়ে এ সংক্রমণ বাড়ার পেছনের প্রধান কারণ হলো, ইমিউনিটি গ্যাপ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি। যেসব কারণে এটি সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
কোভিড-১৯-এর প্রভাব: মহামারিকালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় কারণে অনেক শিশু টিকার ডোজ দিতে পারেনি।
ভ্যাকসিন-ভীতি: কিছু ক্ষেত্রে গুজব বা অসচেতনতার কারণে টিকার প্রতি অনীহা বেড়েছে।
ভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতা: হামের ভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় না থাকলে হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়ে এবং প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
৯ মাসের আগেই কেন টিকা দেওয়া হচ্ছে
সাধারণত হামের প্রথম ডোজ ৯ মাস পূর্ণ হলে দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রাদুর্ভাব চলাকালে অনেক ক্ষেত্রে ৬ মাস বয়সে আউটব্রেক রেসপন্স হিসেবে এক ডোজ টিকা দেওয়া হচ্ছে। এর কারণ হলো—
» বর্তমানে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের উচ্চ হার।
» মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ৬ মাস পার হওয়ার আগেই কমে যাওয়া। ফলে তারা অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
» প্রাদুর্ভাবের সময় সাপ্লিমেন্টারি ডোজ বা অতিরিক্ত ডোজ দিয়ে শিশুদের জীবন রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য।
লক্ষণ ও জটিলতা: কেন এটি বিপজ্জনক হাম শুধু সাধারণ জ্বর বা র্যাশ নয়। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ‘অন্ধ’ করে দেয়।
লক্ষণ
» প্রচণ্ড জ্বর এবং চোখ লাল হওয়া।
» নাক দিয়ে পানি পড়া এবং কাশি।
» মুখের ভেতর সাদাটে দাগ।
» শরীরজুড়ে লালচে র্যাশ বা দানা।
জটিলতা ও কারণ
হামের ভাইরাস শরীরের লিম্ফোসাইট ধ্বংস করে দেয়। শিশু সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়। ফলে:
» নিউমোনিয়া হয়। এটি হামে মৃত্যুর প্রধান কারণ।
» এনসেফালাইটিস হয়। এতে মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
» ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতা হয়। ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি তৈরি করে অন্ধত্ব পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
ল্যাব ডায়াগনোসিস ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা হাম শনাক্তে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ জ্বর ভেবে ভুল করলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সেরোলজি: রক্তে হামের বিরুদ্ধে সৃষ্টি হওয়া আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হয়। এটি সংক্রমণের ৩ থেকে ৪ দিন পর সবচেয়ে নির্ভুল ফল দেয়।
আরটি-পিসিআর: রোগীর গলা অথবা নাকের সোয়াব থেকে ভাইরাসের আরএনএ শনাক্ত করা হয়। এটি দ্রুত এবং নিশ্চিত পদ্ধতি।
জিনোটাইপিং: প্রাদুর্ভাবের উৎস বুঝতে ভাইরাসের স্ট্রেইন বিশ্লেষণ করা হয়।
সংক্রমণ প্রতিরোধে আইপিসি কার্যক্রম
হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতে ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল বা আইপিসি মেনে চলা খুব জরুরি। যে কাজগুলো করতে হবে—
আইসোলেশন: আক্রান্তকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা।
বায়ু চলাচল: হাম বায়ুবাহিত রোগ। তাই রোগীর কক্ষে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা: স্বাস্থ্যকর্মীদের এন৯৫ মাস্ক ব্যবহার এবং নিয়মিত হাত ধোয়া নিশ্চিত করা।
টিকা নিশ্চিতকরণ: হাসপাতালের কর্মীদের নিজস্ব ইমিউনিটি নিশ্চিত করা।
বড়দের করণীয়
অনেকে মনে করেন, হাম শুধু শিশুদের রোগ। কিন্তু যাদের আগে হাম হয়নি বা যারা টিকা নেয়নি, তাদের ক্ষেত্রে বড় বয়সে হাম আরও ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এ জন্য যে কাজগুলো করতে হবে:
পুরোনো রেকর্ড চেক করুন: আপনি টিকার দুটি ডোজ নিয়েছেন কি না, সেটি নিশ্চিত হন।
বুস্টার ডোজ: প্রাদুর্ভাব এলাকায় থাকলে এবং ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে এমএমআর টিকা নিতে পারেন।
শিশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা: বাড়িতে আক্রান্ত শিশু থাকলে বড়দের সতর্ক থাকতে হবে, যেন অন্যরা আক্রান্ত না হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয়
হাম মোকাবিলা করার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন: যারা টিকা দিতে পারেনি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা।
ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল: আক্রান্ত প্রতিটি শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে, যাতে চোখের ক্ষতি ও জটিলতা কমানো যায়।
জনসচেতনতা: জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলেই কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা এবং শিশুকে স্কুলে না পাঠানো।
পুষ্টি নিশ্চিত করা: অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে প্রচুর তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া এবং সচেতনতাই পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে।
ডা. কাকলী হালদার
সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

ঘাড়ে কিংবা গলায় কোনো ফোলা দেখা দিলে প্রাথমিকভাবে অনেকে বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। কেউ এটিকে সাধারণ ঠান্ডা-সর্দির ফল মনে করেন, আবার কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। অথচ বাস্তবতা হলো, ঘাড়ের ফোলা বিভিন্ন রোগের লক্ষণ হতে পারে। তাই সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য সময়মতো উপযুক্ত পরীক্ষা করানো...
২ ঘণ্টা আগে
লিভার বা যকৃৎ আমাদের শরীরের অন্যতম প্রধান অঙ্গ। এটি রক্ত থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে। তবে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, অনিয়মিত ও অস্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি...
৪ ঘণ্টা আগে
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘খালি পেটে জল, ভরা পেটে ফল’। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এই ধারণা অনুযায়ী অনেকে মনে করেন, সকালে খালি পেটে পানি পান এবং ফল সব সময় ভরা পেটে খাওয়া উচিত। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও সমসাময়িক গবেষণার তথ্য বলছে অন্য কথা। ফল খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সেরা বা খারাপ সময় নেই।
৪ ঘণ্টা আগে
হাম বা মিজেলস অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস রোগ। একটি আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এটি শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সে হতে পারে। সাধারণত ভাইরাস শরীরে ঢোকার ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে হামের লক্ষণ প্রকাশ পায়। র্যাশ বের হওয়ার চার দিন আগে থেকে এবং র্যাশ বের হওয়ার....
৪ ঘণ্টা আগে