Ajker Patrika

তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভিডিও ছড়িয়ে চট্টগ্রামে বন্যার ভয়বহতা বলে দাবি

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভিডিও ছড়িয়ে চট্টগ্রামে বন্যার ভয়বহতা বলে দাবি
চট্টগ্রামে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চট্টগ্রামে এভাবে তো তলিয়ে গেছে অনেক ঘরবাড়ি’ ক্যাপশনসহ ১৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

১৩ জুলাই ‘Ctg News Tv’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়, যা ১৪ জুলাই দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। পোস্টটিতে ৬ হাজার ৩০০-এর বেশি রিয়েকশন এবং ৭৬৫ শেয়ার হয়েছে।

একইভাবে ‘Al Amin Ahmed’ এবং ‘Sumon Bhuiyan’ নামের আইডি ও পেজ থেকেও ভিডিওটি শেয়ার করে একে ‘চট্টগ্রামের বর্তমান অবস্থা’ দাবি করে নেটিজেনদের কাছে দোয়া চাওয়া হচ্ছে। শেয়ার করা ভিডিওর কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারীই ভিডিওটিকে চট্টগ্রামের মনে করে কমেন্ট করেছেন।

পোস্টের কমেন্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
পোস্টের কমেন্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

ভাইরাল ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে এতে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ভিডিওর প্রথম ৮ সেকেন্ডে কাদামাটিযুক্ত পাহাড়ি ঢলের পানি তীব্র স্রোতে ধেয়ে আসতে দেখা যায়। পরবর্তী ১১ সেকেন্ডে একটি সেতুর ওপর দিয়ে মানুষের চলাচল এবং সেতুর নিচ দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওটিতে ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ধ্বনির পাশাপাশি মানুষের কান্নার শব্দ শোনা যায়।

এ ছাড়া ভিডিওটির কমেন্টে ‘Ctg News Tv’ নামের পেজটির একাধিক কমেন্ট দেখা যায়। সেখানে ‘সবাই চট্টগ্রামবাসীর জন্য দোয়া করুন’ এবং ‘চট্টগ্রামের সব খবর পেতে Ctg News Tv ফলো দিয়ে সঙ্গে থাকুন’—এমন আহ্বান জানানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওর কোনো মিল পাওয়া যায়নি। পরে ভিডিওটির প্রথম অংশের কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তুরস্কের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘ওনেদিও’ এবং দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘হাবারতুর্ক’ -এ প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

তুরস্কের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
তুরস্কের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

তুর্কি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, ভিডিওর প্রথম অংশ বাংলাদেশের নয়। এটি মূলত ২০২১ সালের জুলাই মাসে তুরস্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রিজে প্রদেশে টানা ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার দৃশ্য। একই সময়ে পার্শ্ববর্তী আর্টভিন প্রদেশের আরহাভি এলাকাতেও ভারী বৃষ্টিতে নদী উপচে এবং ভূমিধসের কারণে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক বন্ধ হয়ে যায়।

ভিডিওর দ্বিতীয় অংশের (সেতু পারাপারের দৃশ্য) কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘বিজনেস ইনসাইডার’-এ ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া টানা মৌসুমি বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় পাকিস্তানজুড়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটিতে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং কোটি কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, কৃষিজমি ও বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তান সরকার এ বিপর্যয়কে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছবিটি পাকিস্তানের সাবেক জলবায়ুমন্ত্রী ‘শেরি রহমান’ শেয়ার করা ভিডিও থেকে নেওয়া। পরে শেরি রহমানের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে ২০২২ সালের ২৭ আগস্ট দেওয়া একটি পোস্ট পাওয়া যায়। ওই পোস্টে তিনি জানান, ভিডিওটি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মাদিয়ান ব্রিজ-এর। পোস্টে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১০ সালের সুপার বন্যায় ধসে পড়া পুরোনো সেতুর তুলনায় নতুন সেতুটি প্রায় পাঁচ মিটার উঁচুতে নির্মাণ করা হলেও বন্যার পানিতে সেটিও তলিয়ে যায়।

গণমাধ্যম ও শেরি রহমানের পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
গণমাধ্যম ও শেরি রহমানের পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

ভিডিওটি ছড়ানো ‘Ctg News Tv’ নামের পেজটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এর বায়োতে লেখা রয়েছে—‘চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশ কে তুলে ধরার চ্যানেল, দালালি নিউজ করা হয় না, সত্যের পক্ষে Ctg News Tv’। অথচ পেজটির পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে সত্যের পক্ষের দাবির বদলে একাধিক (, ) ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রামে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি বিভ্রান্তির। মূলত তুরস্কের ৫ বছর পুরোনো এবং পাকিস্তানের ৪ বছর পুরোনো দুটি ভিন্ন বন্যার ভিডিওর ক্লিপ জোড়া দিয়ে তৈরি করা একটি ভুয়া ভিডিওকে চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যার দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত