Ajker Patrika

নত না-হওয়ার শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২২, ১২: ১৪
নত না-হওয়ার শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া

মেনে না-নেওয়া, নত হয়ে না-থাকার বিপদ আছে বৈকি। সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র—কেউই এ কাজ সমর্থন করে না। ভাবে বেয়াদব। বেয়াদবি সমর্থন করে না এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরাও, বিশেষ করে তারা, যারা সরকারি ক্ষমতার আনুকূল্যে বলীয়ান। যেমনটা ঘটেছিল বুয়েটের আবরার ফাহাদের ব্যাপারে। ছেলেটার অভ্যাস ছিল চিন্তাভাবনা করার এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় সে সন্তুষ্ট ছিল না। রাষ্ট্রের কাজকর্ম নিয়ে সে নিজের ফেসবুকে মন্তব্য করেছে। সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেছে প্রতিক্রিয়া। তাঁর পক্ষে বলার লোকও নিশ্চয়ই অনেকে ছিল। কারণ, সে অন্যায় কিছু বলেনি, যা বলেছে তা বহুজনের বক্তব্য; কিন্তু তার বিপক্ষে যারা, যাদের মধ্যে ছিল ওই বুয়েটেই সরকার-সমর্থক তার সহপাঠীরা। তারা আর বিলম্ব করেনি, গভীর রাতে ছাত্রাবাসের তার কামরা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে এগারো জনে মিলে তাকে পিটিয়ে একেবারে মেরেই ফেলেছে; পেছনে থেকে আরও চৌদ্দজন এই মহৎ কর্মে সহায়তা দান করেছে। বলেছে, সে নাকি জামায়াত-শিবির করত। পাকিস্তান আমলে শুনতাম যে চতুর্দিকে যত ‘অন্যায়’ ঘটে সব করে কমিউনিস্টরা; বাংলাদেশে কিছুদিন আগে শোনা যেত দায়ী বিএনপি-জামায়াত, এখন বিএনপির জীর্ণশীর্ণ অবস্থা হয়েছে, নেতারা মামলার ভারে ও ভয়ে অবসন্ন; ‘অন্যায়’ কাজগুলো এখন তাই বিএনপি আর করতে পারছে না; যা করার জামায়াত-শিবিরই করছে; তারা এতটাই সুসংগঠিত ও সুবিস্তৃত। আবরারের হন্তারকেরা মৃত অবস্থায় তাকে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল, রাতের অন্ধকারে রাস্তায় নিয়ে গিয়ে নিক্ষেপ করতে পারলেই ল্যাটা চুকে যেত; পুলিশ বলতে পারত মৃত্যু রহস্যময়, তারা অনুমান করত হয়তো ছিনতাইকারীরা আক্রমণ করেছে অথবা হতে পারে প্রেমঘটিত কারণে নিহত হয়েছে। এমনও বলা যেত যে শিবিরের ছেলে, দলত্যাগ করার তালে ছিল, তাই দলের লোকেরাই দিয়েছে শেষ করে। হন্তারকদের দুর্ভাগ্য, রাস্তায় নিয়ে ফেলে দেওয়ার পরিচ্ছন্ন কাজটি তারা সম্পন্ন করতে পারেনি; তার আগেই জানাজানি হয়ে গেছে এবং প্রতিবাদটা হয়েছে ব্যাপক। ছাত্রছাত্রীদের ভেতর ক্ষোভ ছিল পুঞ্জীভূত, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা মর্মাহত হয়েছে, অভিভাবকেরা আতঙ্কিত। ফলে একটা বিস্ফোরণের মতো ঘটে গেল। খুনিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা ধরা পড়েছে এবং বিচারও হয়েছে। তদবির চলছে হত্যাকারীদের রক্ষার। আবরারের ওপর নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা নয়, এসব অনবরতই ঘটছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ধর্মঘট করেছে। নইলে আবরার হত্যার ঘটনাও মিলিয়ে যেত অন্ধকারে। তবে ধর্মঘটে কর্তৃপক্ষ যে অত্যন্ত অস্থির হয়েছে, তা নয়।

এখানে আরেকটা ব্যাপার আছে লক্ষ করার মতো। সেটা হলো আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনোটাই এখন আর ঠিকমতো কাজ করে না। বুয়েট মনে হচ্ছিল চলছে, কিন্তু স্বাভাবিকতার অন্তরালে সেখানে যে এমন সব অত্যাচার চলছিল, জমে উঠেছিল এমন গভীর অসন্তোষ, তা টের পাওয়া যায়। হঠাৎ প্রকাশের সুযোগ পেয়ে অসন্তোষ ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে ফেলেছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রলীগের দমন-পীড়ন; শিক্ষক নিয়োগে কর্তৃপক্ষের পক্ষপাত, ঘুষ ও দুর্নীতি, উন্নয়নের টাকাপয়সার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ, উপাচার্যদের অমনোযোগ ও অদক্ষতা; ছাত্রীদের ওপর যৌন হয়রানি—সবকিছু মিলিয়ে এখন এমন এক দশা হয়েছে, যেমনটা আমাদের এই অভাগা দেশেও উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। কিন্তু কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোনো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বা চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে না। তাঁরা বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতা-প্রতাপ প্রদর্শন ইত্যাদি সবকিছুর সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, কী চাই? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সমিতি আছে; বছর বছর তাঁদের নির্বাচনও হয়, কিন্তু ঘুরে ঘুরে তাঁরাই নির্বাচিত হন যাঁরা আগেও ছিলেন, যাঁরা প্রশাসনের সহযোগী আর প্রশাসন তো অতি অবশ্যই সরকার-সমর্থক। প্রশাসন সর্বদাই নত হয়ে থাকে এবং নত হয় বলেই বৈষয়িক দিক থেকে উন্নতি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্র সংসদ নেই। আগে ছিল, এখন নেই। না থাকাটা নিয়মবিরুদ্ধ, কিন্তু কার নিয়ম কে মানে। এরশাদের পতনের পরে দেশে গণতন্ত্রের উত্থান ঘটল এবং সেই উত্থানের চরিত্র যে কতটা ‘গণতান্ত্রিক’ হতে পেরেছে, তার একটা প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদের ওই অগণতান্ত্রিক অনুপস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ থাকলে সন্ত্রাস থাকত না, আবরার নিহত হতো না এবং ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ চাই’ বলে যে আওয়াজটা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহল থেকে ওঠে, সেটা উঠত না। আওয়াজটা গণতন্ত্রবিরোধী, নাগরিকদের নাগরিকত্বের প্রাথমিক অধিকারবিরোধী এবং আত্মঘাতী। তবু সেই আওয়াজ উঠেছে। উঠত না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি ছাত্র সংসদ থাকত। ছাত্র সংসদ ট্রেড ইউনিয়ন নয়; তারও বেশি। ছাত্র সংসদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষাজীবনের সৃজনশীল ও অপরিহার্য অংশ। ওদিকে আবার অরাজনৈতিক মানুষ যে মানুষই নয়, মানবদেহী বন্য প্রাণী মাত্র, এমন কথা দার্শনিকেরা বলে গেছেন, যে কথাটা বাস্তবে শতভাগ সত্য।

ভীষণ রকমের করুণ বাস্তবতাটা হলো এই যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আর আগের মতো প্রাণবন্ত নয়, গণতান্ত্রিক তো অবশ্যই নয়। আগেও যে খুব প্রাণবন্ত ছিল তা নয়, তবু প্রাণ এখন আগের চেয়েও নিষ্পেষিত। সমাজের সর্বত্র যেমন বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমনি, নত হয়ে থাকাটাই এখন বিধিবদ্ধ। নত হয়ে না থাকলে মরতে হবে, আবরার যেমন মরেছে। স্মরণীয় যে একাত্তরের যুদ্ধে প্রথম যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছিলেন, শিক্ষকেরাও ছিলেন। তাঁদের অপরাধও ওই একটাই, নত না-হওয়া। মুক্ত দেশে দেখতে পাচ্ছি যে বিশ্ববিদ্যালয় আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি, ক্রমাগত নতই হয়েছে। এই দুর্দশা অবশ্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। পুঁজিবাদী উন্নতি যা করার তাই করছে; উন্নতির সুযোগ করে দিচ্ছে অল্পকিছু মানুষের জন্য, বাদবাকিরা বঞ্চিত হচ্ছে। আসলে উন্নতির বিরাট ও কঠিন বোঝা ওই বাদবাকিদের, অর্থাৎ মেহনতিদের দুর্বল কাঁধের ওপর যে শুধু চেপে বসে আছে তা-ই নয়, মেহনতিদের শ্রমেই উন্নতিটা ঘটছে।

উন্নতির নির্মম চাপ সামলাতে না পেয়ে সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। তাঁদের ভ্রান্ত বলা যাবে না; অবশ্যই ভাঙছে, আরও ভাঙবে; তবে সেই সঙ্গে ভাগও হয়ে যাচ্ছে, দুদিকে। একদিকে ভালো, অন্যদিকে মন্দ। ভালো হওয়ার কথা পাবলিকের, মন্দ হওয়ার কথা প্রাইভেটের। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ঠিক উল্টোটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত রয়েছে। সে বলছে পাবলিক মোটেই ভালো নয়, প্রাইভেটই ভালো। বলবেই, কারণ তার লালনপালন প্রাইভেটের কোলে-পিঠে। প্রাইভেট পাবলিককে শোষণ করে। শোষণ করে দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদ শোষণের বন্দোবস্ত করে দেয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে যা ঘটছে তার সর্বোচ্চ সাক্ষী হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দুর্দশা। পাবলিক হাসপাতালের মতোই তার দুর্গতি। বাংলাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রাইভেটাইজেশন এখন পুরোমাত্রায় সুসম্পন্ন হয়ে গেছে। এমনভাবে ঘটেছে, যা পুঁজিবাদী বিশ্বের অন্যত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। পাবলিক হাসপাতাল এখন মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়, চিকিৎসার জন্য ঘুরতে হয় প্রাইভেটের দরজায় দরজায়। যারা সংগতিপূর্ণ, তারা ছোটে বিদেশে। সংগতির অভাব যাদের, তারা হয় প্রাইভেট চিকিৎসার দাপটে সর্বস্বান্ত হয়, নইলে মারা পড়ে। পাবলিক সংকুচিত হয়েছে; হস্তান্তরিত হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেটের চোটপাটে। অত বড় আদমজী পাটকল, একাত্তরের পরে ব্যক্তিমালিকানা ত্যাগ করে যেটি চলে গিয়েছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায়, ধপ করে সেটি পড়ে গেল মাটিতে। মরা হাতির দামটাও পাওয়া গেল না। নানাজনে নানাভাবে খাবলে খাবলে নিল তার সম্পত্তি। এটি শুধু যে ঘটনা তা নয়, প্রতীকও বটে। সর্ব ক্ষেত্রেই চলছে একই রকম ব্যাপার। প্রাইভেটের যেসব গুণ—লুণ্ঠন, প্রতারণা, সম্পদ পাচার, কর ফাঁকি দেওয়া—অভূতপূর্ব দাপটের সঙ্গে সবকিছু শুরু হয়ে গেল। বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম এবং বাজার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা নয়, থাকেওনি। সবকিছু পরিণত হয়েছে পণ্যে। টাকা দিলে খুনি ভাড়া পাওয়া যায়, ঘুষ দিলে সবাই বশ হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের বেলায় লোকে ন্যায়-অন্যায় বোঝে না, আপন-পর চেনে না, বদ্ধ উন্মাদের মতো কাজ করে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপন্ন; কয়েকটা ইতিমধ্যেই বসে পড়েছে, বাকিগুলো বসে পড়ার পথে। বসে পড়লে শয্যাশায়ী হতে কী অসুবিধা! এর মধ্যে দেখছি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা আরও উঠবে। সংখ্যায় বাড়ছে, গুণেও বাড়বে; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সেখানে গিয়ে পড়াবেন, এখন যেমন পড়াচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি যে বলেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যার পরে প্রাইভেট হয়ে যায়, সেটা নিশ্চয়ই না জেনে বলেননি। বস্তুত যেমনভাবে প্রাইভেট ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালের কাছে পাবলিক হাসপাতাল মার খাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নাস্তানাবুদ হবে প্রাইভেটের হাতে। প্রাইভেট কোম্পানির বাস, প্রাইভেট গাড়ি, এরা যেভাবে পাবলিককে বিদ্রূপ করে, শিক্ষার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটবে। ইতিমধ্যে তো এটাও দেখা যাচ্ছে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় ভর্তি বেশি। মূলধারার শিক্ষা পরীক্ষার আক্রমণে এখন বিপর্যস্ত। আগে একটা সমাপনী পাবলিক পরীক্ষা হতো, এখন অগ্রে ও পশ্চাতে একটি করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামনস্ক করে তোলা হচ্ছে; অর্থাৎ উৎসাহিত করার আয়োজন চলছে লেখাপড়ার চেয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিকে বড় করে দেখতে, কোচিং সেন্টার ও গাইড বুকের ওপর আরও অধিক নির্ভরশীল হতে, এমনকি নকল করতেও। পরীক্ষা আছে নকল নেই—এমন তো হতে পারে না।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সরকার তিন বছরের অনার্স কোর্সের সমাপ্তিতে একটি সমাপনী পরীক্ষার ব্যবস্থার জায়গায় প্রতিবছরে দুটি করে পরীক্ষার বন্দোবস্ত করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবর্তে পরীক্ষাকে আগের তুলনায় অধিক জরুরি করে তুলে শিক্ষার মানের ওপর ঘা বসিয়েছিল; বর্তমান সরকার ঘা দিয়েছে একেবারে গোড়া পেঁচিয়ে; প্রাথমিক স্তরেই ছোট শিশুদের ঘাড় ধরে ঠেলে দিয়েছে পরীক্ষার কেন্দ্রে। শিক্ষা ব্যাপারটা পরীক্ষা-দানবের অত্যাচারের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় পরিণত করা হচ্ছে। শিক্ষা থেকে আনন্দ ও সৃষ্টিশীলতা পলায়ন তৎপরতা এখন সর্বত্র দৃশ্যমান।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত