Ajker Patrika

এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লাভ হলো কার?

মো. গোলাম রহমান
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ১০: ০৪
এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লাভ হলো কার?

লোডশেডিং শব্দটি আমরা প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম, সম্প্রতি এটি আবার আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। চাহিদার তুলনায় দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন কম হওয়ায় লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ে জনজীবন এত দুঃসহ হয়ে উঠেছে যে লোকজন বিক্ষোভ করছে, পথ অবরোধ করে গাড়ি ভাঙচুর করছে। কোথাও কোথাও লোকজন পাওয়ার সাবস্টেশনের ওপর হামলা করছে।

হঠাৎ বিদ্যুতের এই হাল কেন হলো? জনমনে এই প্রশ্ন স্বাভাবিক কারণেই উত্থাপিত হওয়ার কথা। নানা মহলের নানা রকম ব্যাখ্যা, নানা রকম বিশ্লেষণ। এদিকে যাঁরা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, তাঁদের অসহায়ত্বের কথা বলাই বাহুল্য। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণকারী কোম্পানি বলছে, গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম, বিশ্ববাজারে চড়া দামের কারণে সরকার খোলাবাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে না। সম্প্রতি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলেছে, ৩ জুলাই সারা দেশে লোডশেডিং করা হয়েছে ১ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট এবং সেদিন সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার মেগাওয়াট। সেদিন উৎপাদন হয়েছিল ১২ হাজার ৮১৮ মেগাওয়াট। জানা যায়, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ২৫ হাজার ৫৬৬ মেগাওয়াট এবং মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৫২টি। এর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ গ্যাসচালিত অর্থাৎ ১০ হাজার ৮৭৮ মেগাওয়াট উৎপাদন হয় গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতার যে চিত্র বিদ্যমান, তা কাগজ-কলমে নিম্নরূপ। ২০০৯ সালে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট, যা ২০২১ সালের এপ্রিলে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৬৬ মেগাওয়াট এবং ২০২২ সালের এপ্রিলে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট। ২০০৯ সালে জাতীয়ভাবে গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৮ লাখ, ২০২২ সালে গ্রাহকসংখ্যা হলো ৪ কোটি ২৭ লাখ। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও বিতরণ লাইন উভয়ই ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। সঞ্চালন লাইন ২০০৯ সালে ছিল ৮ হাজার সার্কিট কিলোমিটার, যা ২০২২-এ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৫১৮ সার্কিট কিলোমিটার। বিতরণ লাইন ২০০৯ সালে ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার থেকে ২০২২-এ হয় ৬ লাখ ২৬ হাজার কিলোমিটার। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া জনগোষ্ঠী ২০০৯-এ ছিল ৪৭ শতাংশ, ২০২১ সালে তা দাঁড়ায় ৯৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। (বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ১৮ মে ২০২২ প্রস্তাব অনুযায়ী)। এ তো গেল আমাদের সক্ষমতার চিত্র। সেই সঙ্গে দেখানো হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির চিত্র। ২০১৯-২০-এ প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ পড়েছে ৫ দশমিক ৫৮ টাকা, ২০২০-২১-এ ৬ দশমিক ৩০ টাকা, ২১-২২ মার্চে ৭ দশমিক ৮১ টাকা এবং ২০২২ প্রস্তাবিত ৭ দশমিক ৯৪ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলা হয়েছে বিশ্ববাজারে ফার্নেস অয়েলের ব্যয় বৃদ্ধি। ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধি অতিমাত্রায় হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে ফার্নেস অয়েল ও তরলীকৃত গ্যাসের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ার কারণে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনা হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন বড় রকমের হুমকির মুখে আর জনগণ ভয়াবহ দুর্ভোগের কবলে।

জনমনে প্রশ্ন, এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লাভ হলো কার? বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করা মানেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা নয়।

সরকারের বিদ্যুৎ সরবরাহ নীতি, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জনগণের কাছে খুব পরিষ্কার না, যার ফলে মানুষের বিদ্যুৎ নিয়ে ভোগান্তির ন্যূনতম সান্ত্বনা কারও কাছে নেই। মাস শেষে বিল দেওয়া, দিনে দিনে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের হিমশিম খাওয়া—সবই যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। আমরা দেখছি, ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সুপার স্টোরগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খাদ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং ভোজ্যতেলের অভাব দেখা দিচ্ছে বিশেষভাবে।

আমরা এই বিশ্বে বিচ্ছিন্ন কোনো বাসিন্দা নই যে চোখ বন্ধ করে থাকলে প্রলয় বন্ধ হয়ে থাকবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক স্থানে নিয়ে গেছে। বিশ্বের আপামর জনগণ তার জন্য দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা রকম উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশে এই মুহূর্তে বিশেষ পদক্ষেপ না নিলে জীবনযাপনে বড় রকমের দুর্ভোগের শিকার হবে সাধারণ মানুষ।

মো. গোলাম রহমানআমরা জানি, বিদ্যুতের মতো প্রয়োজনীয় এবং সার্বিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান খাতকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা না গেলে জনদুর্ভোগই বৃদ্ধি পাবে না, সব উন্নয়ন ও কলকারখানার উৎপাদন গভীর সমস্যায় নিপতিত হতে বাধ্য। এদিকে বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে নানা প্রশ্নের অবতারণা করেছে। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করার স্বার্থে। হাজার হাজার কোটি টাকা এই সুবাদে সাশ্রয় করা সম্ভব। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় গড়পড়তায় কমে আসবে এবং মানুষের ওপর চাপ কমবে। ২০৪১ সাল লক্ষ্য করে বিদ্যুতের যে মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে ৩৫ শতাংশ গ্যাস, ৩৫ শতাংশ কয়লা, ১৫ শতাংশ আমদানি/নবায়নযোগ্য এবং ১৫ শতাংশ তেল ও পারমাণবিক সোর্স থেকে উৎপাদন করা হবে বলে বিবেচনা করা হয়েছে। কয়লা নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক শুনেছি। বাস্তবতা হলো, কয়েক রকম বিকল্প সোর্স অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে কোনো বিশেষ অবস্থায় যেন আমরা একটি সোর্সের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকাটাই বড় ব্যাপার না, উৎপাদনের জ্বালানির সংস্থান করাও নিশ্চিত হতে হবে। সংগত কারণেই তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নিয়ে দুর্নীতিসংক্রান্ত বিষয়ে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জবাবদিহি করবে এবং পরিষ্কার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে তাদের জনগণের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।

প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ গ্রাহককে নিশ্চিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন সেবা প্রদান করা এবং তাদের দক্ষতার সঙ্গে নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সময়ের দাবি। কঠিন বাস্তবতায়, বিশেষ করে যুদ্ধের এই সময়ে জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে, উৎপাদন ও বিতরণ দক্ষতা প্রমাণ করা এই খাতের জন্য অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান ও বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রচুর রেফ্রিজারেটর বিক্রি হচ্ছে। গরমও পড়েছে। এই সময় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার বিষয়টি শুধু মুখের কথায় সমাধান হবে না। অত্যন্ত দক্ষ ব্যবস্থাপনা-পরিকল্পনার মাধ্যমে বিষয়টি সামলাতে হবে। আগাম সময়সূচি অনুযায়ী ন্যূনতম লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা হলে মানুষের ভোগান্তি কমবে। আমরা মানুষের দুর্দশা লাঘবে সচেষ্ট হই। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাপনা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিবেদিত হয়ে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানাই।

লেখক: সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত