Ajker Patrika

গণসংস্কৃতির স্বপ্নবান বিপ্লবী কামাল লোহানী

অমিত রঞ্জন দে
গণসংস্কৃতির স্বপ্নবান বিপ্লবী কামাল লোহানী

বাংলাদেশের বিপ্লবী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কামাল লোহানী। কিছু সময়ের জন্য বিপ্লবী বা হঠাৎ হঠাৎ বিপ্লবীর সন্ধান হয়তো অনেক মিলবে, কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিপ্লবের প্রতি আস্থা রেখে লড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বিরল। কামাল লোহানী সেই বিরল প্রকৃতির মানুষদের একজন। তিনি বাংলার মানুষের অধিকার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে আমৃত্যু লড়ে গেছেন।

লোহানী ভাই জনগণে বিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন গণশক্তির প্রবল জোয়ারের কাছে কোনো শক্তিই টিকতে পারে না, যা তিনি তাঁর লেখনীর মধ্যেও প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনিই সদর্পে উচ্চারণ করেছেন, ‘এই দেশ, এই জনগণ, আমার অস্তিত্বের স্বকল্প পরিচয়।’ তিনি মনে করতেন, গণশক্তির সেই প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করতে হলে তার চেতনাকে শাণিত করে তুলতে হয়। আর সেটা পারে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

কামাল লোহানীর অনেক পরিচয়। তিনি রাজনীতি-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতাসহ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অসংখ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম ক্ষেত্র সংস্কৃতি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনীতির পাঠ শুরু হয়। তারপর ক্রমান্বয়ে সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তা, দৈনিক জনপদ, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক আজাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। তিনি সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়ে সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক, সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কামাল লোহানী পিআইবি, বেতারের ট্রান্সক্রিপশন পরিচালক ছিলেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে তিনি দুই মেয়াদে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ছায়ানটের প্রথম সাধারণ সম্পাদক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তিনি এর হাল ধরেন। ১৯৬৭ সালে কামাল লোহানী ও হাসান পারভেজ মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পটভূমি রচনায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৫ মে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, যার অন্যতম সংগঠক ও বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কামাল লোহানী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেতারে তার ভরাট কণ্ঠেই দেশবাসী প্রথম বিজয়ের খবর জানতে পারে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত হয় গণশিল্পী সংস্থা। তিনি এর প্রতিষ্ঠা ও বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘদিন সেই সংগঠনে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানী সোমেন চন্দকে যখন মানুষ ভুলতে বসেছে, ঠিক সেই সময় সোমেনচন্দ চর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। আমৃত্যু তিনি এই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন।

সোমেনচন্দের শততম জন্মবার্ষিকী ঘিরে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার একটি হলো ‘সোমেন চন্দ্র স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশ। অনেক দেরিতে হলেও একুশের বইমেলা ২০২৩-এ স্মারকগ্রন্থটি টাঙ্গন থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

দুর্দান্ত সাহসী ও দৃঢ়চেতা মানুষটি ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত উদীচীর সভাপতি ছিলেন। যুক্ত থেকেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে। সংগ্রামের নানা পথ রচনায় তিনি উদীচীকে পথ দেখিয়েছেন, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তাঁরই নেতৃত্বে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা গণজাগরণ আন্দোলনে সামনে থেকে লড়াই করেছে উদীচী। ২০১৬ সালে আয়োজন করতে সক্ষম হয় ‘দক্ষিণ এশীয় সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংস্কৃতিক কনভেনশন’। কনভেনশনে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন ও জাপানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তাঁকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক মঞ্চ।

লোহানী ভাই গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কর্মরত অসংখ্য মানুষের বা প্রতিষ্ঠানের ভরসাস্থল হয়ে ছিলেন। আমরা দেখেছি, নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাহসী ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হলে সেখানে নেমে আসে স্থবিরতা। সেই স্থবিরতা কাটাতে যে কজন মানুষ নারায়ণগঞ্জবাসীর পাশে থেকেছেন, কামাল লোহানী তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সেখানে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, লোহানী ভাই তার সঙ্গ যুক্ত থেকেছেন ওতপ্রোতভাবে। ২০১৭ সালের প্রথম দিনে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল লেখকদের লেখাসমূহ বাদ দেওয়ার পরও প্রৌঢ়ত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নেমে আসেন রাস্তায়। তারই নেতৃত্বে উদীচী শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে এই ঘৃণ্য ও চক্রান্তমূলক কাজের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ঢাকার বাইরেও বহু প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে ছুটে গেছেন। তাদের সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

তিনি সত্য বলতে কখনো দ্বিধা করতেন না এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার—গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ, তার জন্য সব সময় সোচ্চার থেকেছেন। জন্মদিনে তাঁর প্রতি আভূমিনত শ্রদ্ধা। 

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় শরীরে এইচআইভি জীবাণু পুশ, তরুণীর আত্মহত্যা

কুষ্টিয়ায় ‘পীরের’ আস্তানায় হামলা-আগুন, আস্তানাপ্রধান নিহত

ঘণ্টায় ২৫০০০ মাইল বেগ, ৫০০০ ডিগ্রি তাপ সহ্য করে যেভাবে নিরাপদে অবতরণ নভোচারীদের

লিভার সুস্থ রাখতে এসব অভ্যাস বাদ দিন

খলিলুর রহমান-জয়শঙ্কর বৈঠক: শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আলোচনা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত