খুশির নাম পদ্মা সেতু

সবে বাজেট গেল, কদিন পরে চৌকাঠ পেরোবে অর্থবর্ষ। সংসারের হিসাবনিকাশে হয়তো কিছুটা হর্ষ-বিষাদ। তারপরও বিদায়ী বছরে সবকিছু ছাপিয়ে আরেক কর্মযজ্ঞ পুলকিত করে দিল গোটা জাতিকে, সেই খুশির নাম পদ্মা সেতু।
স্রোতস্বিনী পদ্মায় কখনো শেওলা জমতে পারেনি। প্রবল গতিতে পাথরও ছিটকে পড়েছে। প্রমত্তা নদী সব নুড়ি নিচে ফেলে এগিয়ে গেছে সমুদ্রের দিকে। সেই তেজেই উড়ে গেছে সব বাধা-বিপত্তি, পদ্মাকে রুখতে চাওয়ার ষড়যন্ত্রও। এখন পদ্মার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ছোঁয়া যাবে হাওয়ার বেগে, তা-ও সড়ক, রেল একই সঙ্গে। অথচ ছয় মিনিটের এই পথটুকু ছিল বিপৎসংকুল।
বাংলাদেশ নিজের টাকায় এত বড় সেতু করবে—এ কথা ভাবতে পেরেছে কেউ? বিশ্ব ভেবেছিল, এত ক্ষমতা আছে নাকি বাংলাদেশের! সেই আশঙ্কার মুখে ছাই দিয়ে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তাই পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে গেল স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
গতকাল পদ্মা সেতু পরিদর্শনে যাওয়া একদল সাংবাদিককে সে কথাই বলছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বললেন, ‘এই সেতু আমাদের সামর্থ্য ও সক্ষমতার সেতু। এই সেতু একদিকে যেমন সম্মান আর মর্যাদায় প্রতীক, তেমনি আমাদের যে অপমান করা হয়েছিল, সেই অপমানের প্রতিশোধের প্রতীকও।’
ঢাকার বিভিন্ন গণমাধ্যমের শ দুয়েক কর্মীকে গতকাল নেওয়া হয়েছিল পদ্মার প্রান্তে। সেখানে সার্ভিস এলাকার মিলনায়তনে বসে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সেতুমন্ত্রী। বললেন, স্বপ্নের সেতু নির্মাণে আচমকা ছেদ পড়েছিল বিশ্বব্যাংকের ঘোষণায়। তারা সাহায্য করতে অপারগতা জানিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, লোকমুখে শোনা কথায় দুর্নীতির ছেঁড়া ছেঁড়া অভিযোগও ভাসিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কিছুই প্রমাণিত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সেই হঠকারী সিদ্ধান্তে সেতুর কাজও বিলম্বিত হলো।
মন্ত্রী বললেন, এই প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। যত সমালোচনা হয়েছে, মনোবল তত দৃঢ় হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সেই ভুল স্বীকারও করেছে। সেতু উদ্বোধনে তাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে। শুধু তারাই নয়, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে যাঁরা এর বিরোধিতা করেছিলেন, সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। ছাপানো দাওয়াতপত্র তাঁদের কাছে পাঠানোর কাজও শুরু হয়েছে।
এই সফরে সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম প্রমুখ।
মন্ত্রী আরও বললেন, ২৫ জুন সকাল ১০টায় প্রথমে মাওয়া প্রান্তে একটি সুধী সমাবেশ হবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেবেন এবং মাওয়ায় পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করবেন। তারপর ৬ মিনিটে সেতু পার হয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী যাবেন সেতুর ওপারে, জাজিরা প্রান্তে। সেখানে জনসভায় ভাষণ দেবেন। ওপারে আরেকটি ফলক উন্মোচন করা হবে।
পদ্মা সেতুর দুই তীর মাওয়া-জাজিরা অঞ্চল এখন কর্মচঞ্চল। আর মাত্র কদিন, তারপরই চালু হবে পদ্মা সেতু। সবার অপেক্ষা এখন ২৫ জুন। মন্ত্রী বলেন, উদ্বোধনের পর ২৬ জুন সকাল ৬টা থেকে পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হবে। এখন সেখানে চলছে শেষ সময়ের কাজ, যেন কোথাও খুঁত না থাকে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সেতুসচিব মঞ্জুর হোসেন বলেন, পদ্মা সেতুতে টোল আদায়ে ম্যানুয়াল ও অটোমেশন—দুই পদ্ধতিতেই চলবে। প্রথমে একটি কাউন্টারে অটোমেশন হবে, পর্যায়ক্রমে অন্যগুলোতে করা হবে। ডেবিট কার্ড দিয়েও টোল পরিশোধ করা যাবে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ৪৫ থেকে ৫০ মিনিটেই ঢাকা যাওয়া যাবে—এমন আলোচনা শিবচরের মানুষের মুখে মুখে। এখন তাদের ঘাটে নামা কিংবা গাড়ি বদলের ঝক্কি থাকবে না। এ দীর্ঘ সেতু পার হওয়া যাবে মাত্র ৬ মিনিটে।
শিবচরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আয়শা বেগম বলেন, ‘সেতু চালু হওয়ার অপেক্ষায় আছি। চিকিৎসার জন্য প্রায়ই ঢাকায় যেতে হয়। লঞ্চ-ফেরিতে ওঠানামা করে আর পেরে উঠি না।’ আরেক নারী আনোয়ারা বেগমের কথাতেও সেই সুর। তিনি বললেন, ‘নদীর কারণে আমরা এত দিন পিছিয়ে ছিলাম, আর পিছিয়ে থাকব না।’ বয়সের কারণে গ্রামে যেতে চাইতেন সোহেল চৌধুরী। এখন তিনি আশায় বুক বাঁধেন, সেতুতেই গ্রামে যাবেন।
পদ্মা সেতু প্রকল্প বিশাল হলেও একে ঘিরে মানুষের এমন হাজারো ছোট ছোট আশা। সেই আশাবাদ আর খুশির আলোচনা এপারে মাওয়া ঘাটের মানুষের মুখে মুখে। যদিও কারও মুখে কিছুটা আক্ষেপের সুর আছে। আবদুস সালাম নামের এক ব্যবসায়ী বললেন, ‘এত দিন বিদেশের মানুষ আমাদের বলতেন, বাংলাদেশিরা হলো কাঁকড়ার জাতি। একজন ঝুড়ি থেকে বেরোতে গেলেই অন্যজন টেনে ধরে। আজ সেই সব কাঁটা সরিয়ে আগুয়ান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর অভিধান থেকে ‘বেঙ্গল ক্র্যাব’ প্রবচনটা আসলেই মিথ্যে হয়ে গেল। বাঙালি কী করতে পারে, তা দেখিয়ে দিল।
স্বপ্নের পদ্মা সেতু সম্পর্কে সবশেষ খবর পেতে - এখানে ক্লিক করুন
পদ্মা সেতু চালু হবে—সেই খুশিতে পদ্মাপারের মানুষ যে উৎফুল্ল, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। মাওয়াঘাটের পানদোকানি আবদুল আলিমকে সেতুর কথা বলতেই তরমুজের বিচির মতো পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে খিলখিল করে হেসে বললেন, ‘এত আনন্দ ক্যামনে কমু…।’ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েই মনে হলো, সেই হাসিখুশির নামই পদ্মা সেতু।
[তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আজকের পত্রিকার শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি ইমতিয়াজ আহমেদ]
পদ্মা সেতু সম্পর্কিত আরও পড়ুন:
- পদ্মা সেতুর সঙ্গে দিতে হবে এক্সপ্রেসওয়ের টোল
- পদ্মা সেতু ঘিরে নতুন এক্সপ্রেসওয়ে
- পদ্মা শাসনে ১ টনের পাথর, ৮০০ কেজির জিওব্যাগ
- ১২ হাজার কর্মী নির্মাণে যুক্ত ছিলেন
- পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিলার যে কারণে
- বাড়তি নিরাপত্তা দেয়াল আছে ১২৩৯০টি
- পদ্মা সেতু বাঁকা কেন
- পদ্মা সেতুর টোলসহ ১৩ রুটের নতুন বাসভাড়া নির্ধারণ
- আনা হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেন

পদ্মা সেতু বাঁকা কেন
পদ্মা সেতু চালু হলে ৫০ মিনিটে শিবচর থেকে ঢাকা
পদ্মা সেতু জুড়ে থাকবে সিসি ক্যামেরা







