প্রচলিত আচার-আচরণ থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না—এটি যেমন সত্য, ঠিক একইভাবে নতুন প্রযুক্তির বাস্তবতাকে অস্বীকারও করা যাচ্ছে না। এই দ্বন্দ্বমূলক সামাজিক পরিস্থিতির রূঢ়তায় আজকে কমবেশি সবাইকে বাঁচতে হচ্ছে। কিন্তু শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করতে পারার ব্যর্থতা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কী ক্ষমা করবে?
ইদানীং সব বয়সের মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। এটি বিশ্বজুড়েই বেড়েছে, বাংলাদেশে তো বটেই। সেই সঙ্গে একে ঘিরে বিস্তৃত হয়েছে নানাবিধ বিষয়, ছড়িয়েছে নানা ডালপালা। পুরো বিশ্বে শিশু নির্যাতন জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের স্থান তৈরি করে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংগত উপলব্ধি আজকে সবাইকে নাড়া দিয়েছে। শিশু নির্যাতন বলতে তাঁরা বোঝাচ্ছেন সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, অবহেলা, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য ধরনের নির্যাতন। এই নির্যাতনের ফলে শিশুর মানসিক ও আত্মমর্যাদা বিকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। সমাজে শিশুদের যথাযথ যত্ন ও মানবিক আচার-আচরণে গড়ে তুলতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশের শহর ও গ্রামে ২০২১ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ কিশোর ও ৬৪ শতাংশ কিশোরী ইন্টারনেটের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। শহরে শিশুদের মধ্যে ইন্টারনেটে যৌন নিপীড়নের ঘটনা গ্রামীণ শিশুদের তুলনায় দেড় গুণের বেশি। যেসব শিশু ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ও চ্যাটরুম ব্যবহার করে, তাদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এ থেকে বোঝা যায়, শিশুদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারে তদারকি তেমন নেই। মা-বাবা কিংবা পরিবারের পক্ষ থেকে নজরদারি তেমন কার্যকর নয়। এ ছাড়া মা-বাবা কিংবা পরিবারের সদস্যদের ইন্টারনেট ব্যবহারে যতখানি সাক্ষরতাজ্ঞান থাকা আবশ্যক, ততখানি হয়তো নেই। এই পরিস্থিতি উন্নয়নে নেই কোনো উদ্যোগও।
বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় ১১ থেকে ১৭ বছরের ৪৬০টি শিশুর মধ্যে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৩৩ শতাংশ শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এদের মধ্যে অন্তত একটি সাইবার অপরাধের প্রবণতা লক্ষ করা যায় ৫৯ শতাংশ শিশুর মধ্যে, দুটি সাইবার অপরাধের প্রবণতা দেখা যায় ৩৮ শতাংশ শিশুর মধ্যে এবং তিনটি সাইবার অপরাধের প্রবণতা দেখা যায় ২৬ শতাংশের মধ্যে। বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উপহাস, গুজব, অপমান, বেনামে যোগাযোগ, যৌন নিপীড়নমূলক বার্তা বা মন্তব্য, যৌনতাপূর্ণ ছবি ও ভিডিও। ইন্টারনেট ব্যবহারে সীমিত জ্ঞান এবং সঠিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার না করতে পারার কারণে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে।
আরেকটি সমীক্ষায় দেখা যায়, শিশু নির্যাতন সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি গতানুগতিক ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা, যার মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান।
সাধারণভাবে কম বয়সী শিশু, মেয়েশিশু এবং গরিব শিশু তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। পরিবার, স্কুল ও কাজের জায়গায় তারা নিম্নস্তরে এবং নিম্ন অবস্থানে থাকে বলে তাদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। শিশুদের প্রতি অবহেলার এটি একটি বড় উদাহরণ। সমাজ যতক্ষণ পর্যন্ত এসব শিশুর প্রতি আরও সহনশীল ও যত্নবান না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শিশুরা এভাবে নির্যাতনের শিকার হবে, এটাই হয়তো ঠিক।
দেশের আইনে শিশুদের প্রতিটি নির্যাতনের শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যদিও বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস এক সেমিনারে তাদের ২৬টি গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল উপস্থাপন করে সেগুলোকে গণমাধ্যমে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট এবং উপর্যুক্ত প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায়, শিশু নির্যাতনের ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা সত্ত্বেও দেশের অনেক সংবাদপত্র প্রায়ই শিশু ও যৌন নির্যাতনের সংবাদ এমনভাবে প্রকাশ করে, যা নৈতিকতাবিবর্জিত। চারটি বাংলা ও দুটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র থেকে ১ হাজার ৯৩টি কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশের নৈতিক আদর্শ অনুসরণ করা হয়নি। শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন বেশি নৈতিক মান লঙ্ঘন করেছে, যার অন্তত ৩৭ শতাংশ রিপোর্টে ভুক্তভোগীর অন্তত একটি শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য যেমন—নাম, পিতা-মাতার নাম, পরিবারের সদস্যের নাম বা স্কুলের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। যেসব ঘটনায় ভুক্তভোগীর বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে, অভিযুক্ত যদি সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়, পূর্বপরিচিত হয় এবং যেসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেই প্রতিবেদনগুলো বেশি প্রচার করা হয়। এ ছাড়া শিশু নির্যাতনের যেসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত বিবরণের সম্ভাবনা প্রায় দুই গুণ বেড়েছে এবং সংগত কারণে নমুনায়িত সংবাদপত্রগুলো শিশু নির্যাতনমূলক সংবাদ প্রকাশে নৈতিক মান বজায় রাখতে সক্ষম হয়নি।
সমাজ থেকে একটি শিশু নানা প্রতিকূল আচরণের সম্মুখীন হয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা বিষয়গুলো মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। পরিবারে কারও সঙ্গে সেসব কথা বলতে পারে না, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। জানা যায়, প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত শিশুর ১৮ বছর বয়সের আগে ঘটে যাওয়া আঘাতমূলক ও পীড়াদায়ক ঘটনা তাদের জীবনে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। শিশুদের মধ্যে পরিবারের নানাবিধ জটিলতা যেমন—পিতা-মাতার বিচ্ছেদ, মায়ের প্রতি সহিংসতা, বাড়িতে মাদকের ব্যবহার, পরিবারে মানসিক রোগী থাকা, পরিবারের সদস্যের কারাবাস–এসব প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতা বলে বিবেচনা করা হয়। দেখা গেছে, শৈশবে পাওয়া একটি প্রতিকূল অভিজ্ঞতা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সামগ্রিক শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকিকে দ্বিগুণ করে তোলে। আমরা পরিবারের অনেক ঘটনা শিশুর কাছ থেকে আড়াল করতে পারি না। আমাদের সমাজকাঠামোতে সেই সুযোগ থাকে না। এদিকে আবার কেউ কেউ সেই গুরুত্ব অনুভবও করেন না। শিশু শিক্ষালয়গুলোতে এ ধরনের জ্ঞান দান করার খুব একটা সুযোগ দেখা যায় না। বাচ্চাদের যাঁরা শিক্ষাদান করে থাকেন, তাঁদের এসব বিষয়ে প্রেরণা দেওয়ার প্রকৃত শিক্ষার অভাবও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
যেসব মা তিন বা ততোধিক প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তাঁদের শিশু জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যাসম্পন্ন শিশু জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা চার গুণ বেশি। এটিও গবেষণা থেকে জানা যায়। আরও দেখা যায়, বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার সঙ্গে প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার একটি উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র পাওয়া যায়। প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য আমাদের অবাক করে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, যেসব নারী বেশি প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে স্বামীর দ্বারা সহিংসতার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
অসংক্রামক রোগের প্রবণতা শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি, স্থূলতা, অনিদ্রা, বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা। কোভিড মহামারির সময় এই সমস্যাগুলো বিশেষভাবে বেড়েছে বলে ডাক্তাররা গবেষণায় লক্ষ করেছেন। প্রায় ২০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়েছিল বলে সমীক্ষায় দেখা গেছে। ভয়াবহ হলেও সত্য, গ্রামীণ এলাকায় ১১-১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ৪১৬টি শিশুর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় পাওয়া যায় যে বাড়িতে, স্কুলে, ও কর্মক্ষেত্রে ৯৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন, ৯৭ শতাংশ মানসিক নির্যাতন এবং ৭৮ শতাংশ অবহেলার শিকার হয়।
আমাদের সমাজে শিশুস্বাস্থ্য ও শিশুর মানসিক বিকাশের বিষয়টি তেমন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। প্রচলিত আচার-আচরণ থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না—এটি যেমন সত্য, ঠিক একইভাবে নতুন প্রযুক্তির বাস্তবতাকে অস্বীকারও করা যাচ্ছে না। এই দ্বন্দ্বমূলক সামাজিক পরিস্থিতির রূঢ়তায় আজকে কমবেশি সবাইকে বাঁচতে হচ্ছে।
কিন্তু শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করতে পারার ব্যর্থতা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কী ক্ষমা করবে? সবাইকে শিশুবান্ধব নিরাপদ সমাজ গঠনের গুরুত্ব উপলব্ধির আহ্বান জানাই।
লেখক: মো. গোলাম রহমান, সম্পাদক, আজকের পত্রিকা










