Ajker Patrika

আমাদের হলোটা কী

জাহীদ রেজা নূর
আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২২, ১১: ২৭
আমাদের হলোটা কী

এই ব্যস্ত মহানগরীতে গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত হয়ে গেল রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন, অথচ সেভাবে সাড়া পড়ল না। করোনাকাল মানুষের ভাবনার জগৎটাকে কিছুটা হলেও পরিবর্তিত করে দিয়েছে। সমাজের প্রাজ্ঞ, নেতৃত্বদানকারী মনীষীদের একটি অংশ এ সময় পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাঁদের শূন্যস্থান পূরণ করার মতো অবস্থা এখনো সৃষ্টি হয়নি। আরেকটা ব্যাপারও বোঝা গেল, মানুষ এখন সংস্কৃতির গভীরতা নিয়ে ভাবিত নয়, তারা এখনো অন্য সবকিছু ভুলে, নজরুলের ভাষায়, ‘বিবি তালাকের ফতোয়া’ খুঁজছে। সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতিসহ সব অঞ্চলেই এখন দেখনেওয়ালাদের দাপট। ফলে, গভীরতা থেকে সরে গেছে নজর, বাইরের দিকটা হয়ে উঠেছে দৃশ্যমান। ভেতরে ফাঁপা হলেও ক্ষতি নেই।

এ জন্য শুধু মানুষের বদলে যাওয়াকে চিহ্নিত করলেই হবে না, যাঁরা সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও দায়ী কি না, সে প্রশ্ন তুলতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মুক্তিপাগল মানুষ, আলোকের ঝরনাধারায় ধুইয়ে দেওয়ার মানুষ। তাঁকে যদি রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপে বন্দী করা হয়, তাহলে তিনি প্রকাশিত হওয়ার পথ পাবেন কী করে? এবারের সম্মেলনস্থলে গিয়ে অনুভব করলাম, নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া অনেক রাজনৈতিক ঘটনা আমাদের মননের মানচিত্রে আঘাত হেনেছে। পৃথিবী বদলেছে, পৃথিবীর মানুষ বদলেছে, সংস্কৃতির নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে, রাজনৈতিকভাবে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে, নতুন সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোনোদের ভাবনায় গাফিলতি এসেছে।

রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলনে প্রতিযোগীদের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে মনে পড়ল, সাংস্কৃতিক এই মানচিত্র কিন্তু ওপর থেকেও পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একসময় সকাল হলেই ঢাকা বা যেকোনো মফস্বল শহরের বিভিন্ন বাড়ি থেকে গলা সাধা বা রেওয়াজের যে শব্দ ভেসে আসত, তা কি এখন আর শোনা যায়? পাড়ায়-পাড়ায় যে বার্ষিক সংস্কৃতি অনুষ্ঠান হতো কিংবা রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী পালনের অনুষ্ঠান হতো, সেগুলো আজ কোথায়?

আমাদের এই পরিবর্তনগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। খুঁজতে হবে কারণগুলো।শিল্পকলা একাডেমিতে এই সম্মেলনেই শনিবার দেখা হলো জয়পুরহাটের আমিনুল ইসলাম বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে। সত্তরোর্ধ্ব বয়সের মানুষটাকে দেখলে এখনো মনে হয় যুবক। তিনি দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন, শুদ্ধভাবে জাতীয় সংগীত গাওয়ানোর জন্য স্কুলে স্কুলে গিয়েছেন এবং তিনি এসব সফরের মধ্য দিয়ে কিছু বিষয় আবিষ্কার করেছেন, যা নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হলো। পত্রপত্রিকাগুলো যখন শুধুই দেশের রাজনীতি নিয়ে মহাব্যস্ত, তখন নিজেদের উদ্যোগেই আমাদের সমাজের যে জায়গাগুলো নষ্টদের হাতে চলে গেছে, সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। শুধু রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন নয়, আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পিছু হটার কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে। তারই একটা চেষ্টা করছি। আজ থাকল তার প্রথম পর্ব। আজকের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই স্কুলের কথায়। স্কুলশিক্ষকদের মধ্যে দেশপ্রেম নিয়েই কথা বলব।

এখন যাঁরা স্কুলশিক্ষক, তাঁদের বয়স যদি গড়ে ৫০ হয়, তাহলে তাঁদের অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কোনো অভিজ্ঞতা তাঁদের নেই। এ ব্যাপারে পড়াশোনা করে জেনে নেবেন, এ রকম কোনো সুযোগও তাঁদের ঘটেছে কম। আর এ কথা তো সত্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকরি করলে তাতে ততটা সামাজিক স্বীকৃতি মেলে না, যতটা মেলে বাজারে একটা বড় মনিহারি দোকান খুলে বসলে কিংবা ঘুষ আছে—এ রকম চাকরিজীবী হলে। এমনকি পয়সাওয়ালা ঠিকাদারের সম্মানও প্রাথমিক শিক্ষকের চেয়ে বেশি। অন্য কোনো সুযোগ থাকলে কোনো তরুণ নিজের ইচ্ছায় প্রাথমিক শিক্ষক হতে চাইবেন কি না, সন্দেহ আছে। তাই যখন চাকরিটা পান, তখন জীবনযাপনের জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই মনোযোগ দেন। সিলেবাস শেষ করার তাড়না থাকে তাঁর, কোথায় শিশুর মানস গঠনের সময় পাবেন তিনি? কিংবা কেনই-বা সে ইচ্ছা জাগবে তাঁর মনে? আমি প্রাথমিক শিক্ষকদের অবদানকে খাটো করছি না। আমি বলতে চাইছি, তাঁদের সম্মান না করার কারণেই তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকায় নির্ভর করতে হয় প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কিংবা বইপত্রের ওপর। কিন্তু সামাজিকভাবে মুক্তিযোদ্ধারা সে রকম কোনো সম্মান পান না যে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাইবে মানুষ। যার সম্মান নেই সমাজে, তার কথার দামও নেই। লক্ষ করলেই দেখা যাবে, যার হাতে অর্থ আছে, তার আশপাশেই ভিড় জমাচ্ছে মানুষ। সেই অর্থের ছিটেফোঁটা যখন সাধারণ মানুষের কোনো অংশের হাত পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন সেই বিত্তবান ব্যক্তির গুণগান করার মতো মানুষের অভাব হয় না। ওই যে কথায় আছে, ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না।

জাহীদ রেজা নূর

সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ছিটানোর মতো ভাত নেই। তাঁদের অনেকেই নিজেদের ভাত নিজেরা জোগাড় করতে পারেন না। মনে করিয়ে দিচ্ছি, এ দেশে যাঁরা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য উপাধি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর লোকেরা ছাড়া হাতে গোনা কয়েকজন আছেন, যাঁরা সাধারণ স্তর থেকে উঠে এসে উপাধি পেয়েছেন। উপাধি, পদক বা সম্মাননা যেন সাধারণ গেরিলা বা বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নয়। আমাদের বীর উত্তম, বীর বিক্রম, বীর প্রতীকদের মধ্যে কজন আছেন, যাঁরা সামরিক বাহিনীর (সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, অর্থাৎ বিজিবি, আনসারসহ) বাইরের মানুষ? কেন অন্যদের একেবারেই মনে রাখা হয়নি? যে কৃষক, যে মজুর, যে গ্রামের অতিসাধারণ ছেলেটি প্রথম সুযোগে অস্ত্র হাতে নিয়ে দেশ স্বাধীন করার লড়াইয়ে জীবন বাজি রেখে নেমেছিলেন, সেই মানুষটি যুদ্ধের পর অস্ত্র জমা দিয়ে ফিরে গেছেন নিজের কর্মক্ষেত্রে। কোনো জৌলুশময় জীবনের জন্য তিনি আর্তি জানাননি। সময়ের কাজ সময়ে করে তাঁরা ফিরে গেছেন।

সমাজ সেই মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থ সম্মান দিয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে; বরং ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার করুণ কাহিনি’, ‘মুক্তিযোদ্ধা এখন রিকশাচালক’ কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা মানুষের জুতো সেলাই করেন’—এ ধরনের মানবিক প্রতিবেদন দেখতে পাওয়া যায় পত্রিকায়। মূলত এগুলো মোটেই মানবিক প্রতিবেদন নয়, এগুলো অমানবিক প্রতিবেদন। মুক্তিযোদ্ধাদের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও যে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে থাকবে অলক্ষ্যে, এক কোণে, সেটা কি বলে দিতে হবে? নতুন নতুন কেলেঙ্কারি, মহা কেলেঙ্কারিতে দেশ ভরে গেলে অতীত গৌরবের প্রতি নিমগ্ন থাকা কঠিন বটে। কিন্তু এই কেলেঙ্কারির মূল সূত্রও যে ছোট ছোট ইতিহাস বিস্মৃতির কারণে ঘটে, সেটা অস্বীকার করব কীভাবে?

পরিবারের পর প্রাথমিক শিক্ষালয়েই (এর মধ্যে মাদ্রাসাও আছে) শিশুর মনের ভিত গড়ে ওঠে। আর সেই ভিত গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান থাকে শিক্ষকের। শিশুর মনে দেশপ্রেমের শিখা জ্বালিয়ে দিতে পারেন শিক্ষক। কিন্তু এ জায়গাতেই আমাদের মহা বিপর্যয় ঘটে গেছে। দেশপ্রেমে বলীয়ান করার মানে হচ্ছে এই মাটিকে ভালোবাসা, এই মাটিতে ফসল ফলানোর প্রক্রিয়াকে অনুভব করা, এই দেশের প্রকৃতিকে নিবিড় করে পাওয়া, এই দেশের নদী-বন-পাহাড়-সমতল ভালোবাসা। বুঝতে শেখা—এটাই আমার দেশ।

অবশ্যই প্রাথমিক শিক্ষাদানের সময় দেশকে ভালোবাসার কৌশল আয়ত্ত করতে হবে শিক্ষকদের। নিজের দেশের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে আন্তর্জাতিকভাবে সে নিজেকে উজাড় করে দেবে। শিকড় থাকবে, থাকবে শিকড়ের ডানা। শিকড় দিয়ে সে আঁকড়ে রাখবে নিজের আত্মপরিচয়, ডানা দিয়ে সে উড়বে অন্য সংস্কৃতির আকাশে। এই তো হলো শিক্ষার মূল জায়গা। অথচ আমরা সেই সত্যিকারের অবস্থান হারিয়ে বসেছি। আমরা হয় সৌদি আরব, নয় পশ্চিমা বিশ্বকেই ধরে নিয়েছি নিজেদের পরিচয় হিসেবে। এই যে আত্মপরিচয়ের বিচ্যুতি, এ থেকেই জন্ম নিচ্ছে দেশহীন, পরিচয়হীন এক জাতির। এ থেকেই গভীরতাহীন একটি প্রজন্ম বহিরঙ্গে লেবাস জড়িয়ে অন্তরের দৈন্য ঢাকতে চাইছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন পড়াশোনা করেছি, তখন দেখেছি, অশীতিপর প্রবীণেরা স্কুলে স্কুলে গিয়ে শোনাচ্ছেন বিজয়ের গল্প। কোথায় কখন যুদ্ধ করেছেন, পাশেই গুলি খেয়ে বন্ধুকে শহীদ হয়ে যেতে দেখেছেন, এক টুকরো শুকনো রুটি খেয়ে কাটিয়েছেন দীর্ঘ দিবস-রজনী—যুদ্ধের এসব গল্প শুনত শিক্ষার্থীরা এবং কল্পনা করে নিত যুদ্ধকে। আর হ্যাঁ, সেখানে অবশ্যই থাকত শত্রুদের কথা। কেন যুদ্ধটা হয়েছিল এবং কেন নিজেদের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শত্রুদের কথা বলতে হবে, তার উত্তর নিজের কাছে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের একটা বড় সংকট হলো, আমরা মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের চিহ্নিত করিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জানাইনি, কেন ওরা শত্রু। ওরা কী করেছিল। কেন যুদ্ধ হয়েছিল। অসাম্প্রদায়িকতা মানে কী। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আমাদের আত্মপরিচয়ে বলীয়ান করেছিল, কিন্তু তার ত্রুটিগুলো কী কী ছিল, পাকিস্তানি শাসন কেন বাঙালি মেনে নিতে চায়নি, কারা পাকিস্তানিদের দালালি করেছিল। একাত্তরে পাকিস্তানি সৈন্যরা এবং এই দালালেরা যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তার মানে কী? দু-একটা উদাহরণ কি দেওয়া যায় ক্লাস রুমে?

স্কুলে যখন দোদুল্যমান দেশপ্রেমের জন্ম হয়, তখন শিশুর মননে না থাকে দেশ, না থাকে প্রেম। থাকে শুধু লোভ। একটু লোভ করতে পারলেই জগৎ হাতের মুঠোয়। এ নিয়েই কথা বলব পরের লেখায়।

লেখক: উপসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অপারেশন থিয়েটারে মির্জা আব্বাস, মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার

ভৈরবে ১ কোটি ৮৫ হাজার টাকাসহ আটক দুই স্বর্ণকার, ২১ ঘণ্টা পর মুক্ত

চট্টগ্রামে ৭ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা

হিজবুল্লাহর লাগাম টানতে চায় লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেনাবাহিনীর না

ম্যানেজিং কমিটিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের প্রশ্নই ওঠে না: শিক্ষামন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত