Ajker Patrika

প্রাণী দিবস আজ: লেপার্ড দুটির কোয়ারেন্টিন শেষ হয়নি ৯ বছরেও

  • গাজীপুর সাফারি পার্কে ২০১৭ সালে ২১ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছিল
  • আলাদা বেষ্টনী না থাকায় ৯ বছরেও বের করা হয়নি কোয়ারেন্টিন থেকে
  • উচ্চপর্যায়ের একাধিক নির্দেশনা থাকলেও এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা
রাতুল মণ্ডল, শ্রীপুর
প্রাণী দিবস আজ: লেপার্ড দুটির কোয়ারেন্টিন 
শেষ হয়নি ৯ বছরেও
বন্য প্রাণী হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ছোট্ট কক্ষে লেপার্ড দুটির কেটে গেছে প্রায় ৯ বছর। গতকাল গাজীপুর সাফারি পার্কে। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করা দুটি লেপার্ড শাবককে রাখা হয়েছিল তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে। সেই তিন সপ্তাহ শেষে পার হয়েছে ৯ বছর। শাবক থেকে লেপার্ডগুলো হয়েছে পূর্ণবয়স্ক। কিন্তু এখনো তাদের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হচ্ছে গাজীপুর সাফারি পার্কের সেই ছোট্ট খাঁচায়।

সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ বলছে, লেপার্ডগুলোর জন্য আলাদা বেষ্টনী না থাকায় সেগুলোকে বের করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে, দর্শনার্থীরাও বঞ্চিত হচ্ছে লেপার্ড দেখা থেকে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিবছরের মতো আজ ৪ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রাণী দিবস।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, লেপার্ড হলো বিড়াল গোত্রের একটি মাঝারি আকারের হিংস্র স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের কাঁধের পেশি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। এরা সহজে গাছে চড়তে পারে। এরা বাঘ বা সিংহের মতো গর্জন করতে পারে। এরা পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণী।

সাফারি পার্ক সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে খুলনা থেকে পাচারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্ধার করে প্রাণী দুটিকে। পরে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শাবক দুটিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠান। সেখানে তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনের জন্য তাদের বন্য প্রাণী হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হয়। শাবক থেকে এখন পূর্ণবয়স্ক হলেও তাদের আবাসনের পরিবর্তন হয়নি।

সম্প্রতি সাফারি পার্কের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, লেপার্ড দুটি একটি কক্ষে রয়েছে। কক্ষের দুটি অংশে রয়েছে লোহার বেড়া। লেপার্ড দুটি কখনো বসে থাকছে, আবার কখনো লাফালাফি করছে। গাছে ওঠা, লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়ানো কিংবা শিকারের কোনো সুযোগ নেই। অল্প জায়গায় বন্দী থাকায় মানুষ দেখলেই ক্ষিপ্ত হয়ে লোহার গ্রিলে আছড়ে পড়ছে তারা।

২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল গাজীপুর সাফারি পার্ক পরিদর্শন শেষে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান লেপার্ড দুটির জন্য আবাসন তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া একাধিক উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি আজও।

সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী পরিদর্শক মো. সারোয়ার হোসেন বলেন, লেপার্ড চমৎকার লাফাতে পারে। এরা লাফ দিয়ে ২০ ফুট পর্যন্ত উপড়ে উঠতে পারে। লেপার্ড গাছে চড়া ও পানিতে সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। শিকার করা প্রাণীকে সিংহ বা হায়েনার হাত থেকে বাঁচাতে এরা নিজের চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের শিকার গাছের মগডালে টেনে তোলে।

সম্প্রতি সাফারি পার্ক পরিদর্শন করে লেপার্ড দুটির আবাসন, চিকিৎসা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের (পিএডব্লিউ) জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, লেপার্ডের জন্য যে ধরনের ইনক্লোজার প্রয়োজন, সেখানে সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ ও পর্যাপ্ত উচ্চতা থাকা দরকার। শুরু থেকে দুটি লেপার্ড একই ধরনের ইনক্লোজারে রয়েছে। তারা আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ থাকলেও সাফারি পার্কের ধারণা অনুযায়ী তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন নিশ্চিত হয়নি।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, বিড়ালজাতীয় প্রাণী সাধারণত নিচে থাকতে চায় না; সুযোগ পেলে উঁচু জায়গায় অবস্থান করে। লেপার্ডও একই ধরনের প্রাণী। তাই তাদের ইনক্লোজারে প্রয়োজনীয় উচ্চতা থাকা জরুরি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা নদী গবেষক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বন্যেরা বনে সুন্দর বলে একটি কথা আছে। বিশেষ করে শাবকেরা বন্দী অবস্থায় থাকলে তাদের স্বাভাবিক আচরণ ভুলে যাবে। তারা শিকার ধরা ভুলে গেলে টিকে থাকতে পারবে না। এ জন্য অবশ্যই তাদের বনে ছেড়ে দেওয়া জরুরি। অন্য কোনো বনে নয়, যে বন এলাকা থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে, ঠিক সেই বনেই তাদের ছেড়ে দিতে হবে।

গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. তারেক রহমান বলেন, নির্দিষ্ট বেষ্টনী না থাকায় লেপার্ড দুটিকে দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি স্থানটি পরিদর্শন করেছে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বেষ্টনী আছে, জিরাফ নেই

এ সাফারি পার্কের যাত্রার শুরুতে ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছিল ১০টি জিরাফ। পরে বংশ বৃদ্ধি হলেও ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সব জিরাফের মৃত্যু হয়। অথচ পার্কে আসা দর্শনার্থীদের বিশেষ করে শিশুদের মূল আকর্ষণের অন্যতম হলো জিরাফ।

সাফারি পার্কে আসা দর্শনার্থী সালমা আক্তার বলেন, পার্কের কোরসাফারিতে প্রবেশ করলে চোখে পড়বে জিরাফ-জেব্রা বেষ্টনী। কিন্তু জিরাফ না থাকায় শিশুদের আনন্দে ঘাটতি থেকে যায়।

দর্শনার্থী মনিরুল কবির বলেন, জিরাফ নেই এটা লিখে দেওয়া উচিত। কারণ, বাচ্চাদের বাঘ-সিংহ দেখার মতো জিরাফ দেখার আগ্রহ অনেক। কিন্তু পার্কে একটিও জিরাফ নেই। তাহলে জিরাফের ছবিসংবলিত সাইনবোর্ড কেন?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত