Ajker Patrika

যেভাবে গৃহস্থালি বর্জ্যের শতভাগ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করল দক্ষিণ কোরিয়া

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ৫১
যেভাবে গৃহস্থালি বর্জ্যের শতভাগ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করল দক্ষিণ কোরিয়া
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় পচনশীল বর্জ্য বা খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ একটি বড় পরিবেশগত সংকট। তবে এ সংকটকে সম্পদে রূপান্তর করে এক অনন্য নজির গড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তিন দশক আগে যেখানে দেশটির ৯৭ শতাংশ পচনশীল বর্জ্য ভাগাড়ে (ল্যান্ডফিল) ফেলে দেওয়া হতো, আজ তার প্রায় ৯৭ শতাংশই পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত সিউলের এই সফল মডেল অনুসরণ করে এখন নিজেদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি।

সিউলের বর্জ্য ফেলার আধুনিক প্রযুক্তি

গত শনিবার বিকেলে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের ইয়োউইদো এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে দেখা যায় প্রতিদিনের এক পরিচিত দৃশ্য। স্থানীয় বাসিন্দা সেউংহোয়ান হং সপ্তাহের জমে থাকা সবজির খোসা, বেঁচে যাওয়া ভাত ও ফলের অংশ একটি পাত্রে নিয়ে ভবনের নিচে রাখা বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে এলেন।

সেখানে রাখা একটি বিশেষ ডাস্টবিনে নিজের ডিজিটাল কার্ডটি ছোঁয়াতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গেল ঢাকনা। ভেতরে খাবার ঢালার পর মনিটরে মুহূর্তেই উঠে এল উচ্ছিষ্টের ওজন ও সেই অনুযায়ী হংয়ের অ্যাকাউন্টে যোগ হলো নির্দিষ্ট মাশুল।

সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি শেষ হতে সময় লাগল এক মিনিটের কম। তবে এই সামান্য লেনদেনের পেছনে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি।

হং বলেন, ‘নিজের চোখের সামনে বর্জ্যের ওজন ও সেটির জন্য কত টাকা মাশুল হচ্ছে, তা দেখতে পাওয়ায় আমি এখন খাবার অপচয়ের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন।’

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশজুড়ে এ ধরনের ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৩৪টি আরএফআইডি যুক্ত ‘স্মার্ট বিন’ স্থাপন করা হয়েছে, যা আটটি অঞ্চলের ৮৬ লাখের বেশি পরিবার ব্যবহার করছে।

উন্নত বিশ্বে খাবার অপচয় একটি সর্বজনীন সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে চার সদস্যের একটি পরিবার প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫৬ ডলার সমমূল্যের খাবার ফেলে দেয়। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর শতকোটি টনের বেশি খাবার অপচয় হয়, যা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দ্রুত নগরায়ণের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্জ্য-সংকট চরম আকার ধারণ করে। তবে সুদূরপ্রসারী নীতি ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটি এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটায়।

১৯৯৫ সালে বর্জ্যের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে মাশুল নির্ধারণব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেয় দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। ১৯৯৭ সালে পচনশীল বর্জ্য সাধারণ আবর্জনা থেকে পৃথক করা বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০০৫ সালে ভাগাড়ে পচনশীল বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১০ সালে প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট বিন’-এর পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়। আর ২০১৩ সালে সমুদ্রে পচনশীল বর্জ্যের তরল নির্গমন পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার।

ফলস্বরূপ, ১৯৯৬ সালে যেখানে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ পচনশীল বর্জ্য রিসাইকেল হতো, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশে।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস

পচনশীল বর্জ্য যখন সাধারণ ভাগাড়ে জমে থাকে, তখন অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে তা পচে মিথেন গ্যাস তৈরি করে। বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে মিথেন গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ৮০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এ ছাড়া এটি ভূগর্ভস্থ পানিও দূষিত করে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় এ বর্জ্য পাঠানো হয় বায়োরিঅ্যাক্টরে, যেখানে উৎপন্ন মিথেন সংগ্রহ করে জ্বালানি ও বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যাঞ্চলের ‘দেজন বায়ো এনার্জি সেন্টার’ প্রতিদিন সংগৃহীত বর্জ্যের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার পরিবারের চাহিদা পূরণ করে। দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে বর্তমানে এ ধরনের ৩৪০টির বেশি জৈববিদ্যুৎকেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে।

তবে এই বিশাল ব্যবস্থা পরিচালনায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। নাগরিকদের দেওয়া ফি সত্ত্বেও মিউনিসিপ্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারকে প্রতিবছর বিশাল অঙ্কের অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার এই সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর নিউইয়র্ক সিটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাসিন্দাদের জন্য পচনশীল বর্জ্য পৃথক করা বাধ্যতামূলক করে। প্রায় ৩৪ লাখ পরিবারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় জৈব বর্জ্য রিসাইকেল কর্মসূচি।

শহরের সাড়ে চার শতাধিক স্থানে সৌরবিদ্যুৎ-চালিত ২৪ ঘণ্টার ‘স্মার্ট কম্পোস্টিং বিন’ বসানো হয়েছে। ইস্ট ভিলেজের বাসিন্দা গ্রেস ফু জানান, এসব বিন ব্যবহারের সুবিধা অনেক, তবে নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এগুলোর আশপাশে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে।

বর্তমানে নিউইয়র্কে সংগৃহীত পচনশীল বর্জ্য হয় সার তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে অথবা ব্রুকলিনের পয়োবর্জ্য শোধনাগারে পাঠিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করা হচ্ছে।

তবে নাগরিক সচেতনতার অভাবে প্রত্যাশিত গতি আসছে না। ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক সিটি প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টন গৃহস্থালি জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হয়েছে, যা মোট বার্ষিক উৎপাদিত বর্জ্যের মাত্র ৯ শতাংশ—দক্ষিণ কোরিয়ার ৯৭ শতাংশের তুলনায় নিউইয়র্ক এখনো অনেক পেছনে।

কলাম্বিয়া ক্লাইমেট স্কুলের সাসটেইনেবিলিটি ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের পরিচালক স্টিভেন কোহেন বলেন, নিউইয়র্কের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। তাই দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আরএফআইডি বিন পদ্ধতি নিউইয়র্কেও দারুণ কাজ করতে পারে। তবে এ জন্য নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সঠিক শিক্ষা দেওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সিউলের ইয়োউইদোতে বর্জ্য ফেলা শেষে খালি পাত্রটি হাতে নিয়ে আবার নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যান সেউংহোয়ান হং। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুনির্দিষ্ট সামাজিক অভ্যাসের কারণে খাবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনেরই এক স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়েছে।

হংয়ের ভাষায়, খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়, এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত