Ajker Patrika

বাঘ রক্ষায় ও পাচার রোধে সরকার জিরো টলারেন্সে: পরিবেশমন্ত্রী

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৭: ২৫
বাঘ রক্ষায় ও পাচার রোধে সরকার জিরো টলারেন্সে: পরিবেশমন্ত্রী
বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’ প্রতিপাদ্যে বন অধিদপ্তরের আয়োজিত অনুষ্ঠান। ছবি: আজকের পত্রিকা

সুন্দরবনের বাঘ ও এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং সুন্দরবনের পুরো বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য সংরক্ষণের বিষয়।

আজ বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে বন অধিদপ্তরে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’।

মন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ লক্ষ্যেই সরকার বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

পরিবেশমন্ত্রী আরও জানান, বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী এবং বর্তমানে এর একমাত্র প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবন। খাদ্যশৃঙ্খল ও বনজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘ একটি ‘কিস্টোন স্পিসিজ’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাঘ সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রজাতি রক্ষা নয়; বরং বন, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্য, প্রজননক্ষেত্র ও সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা সংরক্ষণ।

মন্ত্রী জানান, বন উজাড় ও অবৈধ শিকারের কারণে বিশ্বজুড়ে বাঘ বর্তমানে মহাবিপন্ন প্রজাতি। ১৯০০ সালে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা লক্ষাধিক থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৫ হাজার ৫৭৪ টিতে নেমে এসেছে। একসময় ১৩টি দেশে বন্য বাঘ থাকলেও কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম থেকে এটি বিলুপ্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ, মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত নিরসন এবং অবৈধ দখলমুক্ত বনভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি ১০ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করেছে। কমিশন সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বৃদ্ধি, বনভূমি পুনরুদ্ধার, বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন্যপ্রাণীর খাদ্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে পরামর্শ দেবে।

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, সরকার সুন্দরবনের জন্য ২০২৬-২০৩৫ মেয়াদি’ ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ প্রণয়ন করছে। এর আওতায় বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং মানুষ-বাঘ সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি জানান, দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে’ ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাঘ-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য প্রদানকারীদের জন্য ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বেচ্ছাসেবক নিবন্ধন কার্যক্রমের আওতায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ২৮৭ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে সরকারের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, আধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপে ২০১৫ সালে সুন্দরবনে ১০৬ টি,২০১৮ সালে ১১৪টি এবং ২০২৪ সালে ১২৫টি বাঘ শনাক্ত হয়েছে। গত এক দশকে বাঘের সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে অন্তত ১৯টি বাঘশাবক শনাক্ত হয়েছে, যা বাঘের সফল প্রজননের ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। এ সাফল্যের পেছনে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি), কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপ (সিপিজি) এবং স্থানীয় জনগণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ অনেক সময় আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই বাঘ, বাঘের চামড়া ও ট্রফি পাচার রোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে সংরক্ষিত এলাকার পরিধি বৃদ্ধি, বন্যপ্রাণীর জন্য ৮০টি পুকুর খনন, ২০টি উঁচু টিলা নির্মাণ এবং মানুষ-বাঘ সংঘাত কমাতে লোকালয়সংলগ্ন এলাকায় দড়িবেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অপরিসীম। বাঘের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে টেকসই পর্যটনের পাশাপাশি সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ, আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা শারমিন হোসাইন, ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী ড. মো. আনোয়ারুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত