Ajker Patrika

স্মার্টফোন থাকলে আমি খুব বাজেভাবে এতে আসক্ত হয়ে পড়তাম: ক্রিস্টোফার নোলান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
স্মার্টফোন থাকলে আমি খুব বাজেভাবে এতে আসক্ত হয়ে পড়তাম: ক্রিস্টোফার নোলান
অস্কারজয়ী নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান। ছবি: সংগৃহীত

জুলাইয়ের এক মেঘলা সকাল। চরম বৈরী স্কটল্যান্ডের উপকূলের আবহাওয়া। চারদিকে সিসা রঙের আকাশ, উত্তাল সমুদ্র আর আনুভূমিকভাবে পড়তে থাকা বৃষ্টি। ঝড়ের মধ্যেই নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান তাঁর উপদেষ্টার খোঁজে জেটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মনে মনে ভাবছিলেন, তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’-র ছয় মাসের শুটিং শিডিউলের প্রথম দিনটি হয়তো আজ বাতিল করতে হবে।

কিন্তু ১১৫ ফুট দীর্ঘ যে জাহাজটিতে তাঁরা শুটিং করছিলেন, সেটি ঠিক এই ধরনের প্রতিকূল আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল। উপদেষ্টা নোলানকে আশ্বস্ত করলেন, অভিজ্ঞতা কিছুটা ভয়ানক হলেও কাজ করা পুরোপুরি নিরাপদ হবে। এক ঘণ্টার মধ্যে পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা উত্তাল ঢেউয়ের বুকে ভেসে পড়লেন। ঢেউয়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, বেশ কয়েকজন সহ-অভিনেতা জাহাজের রেলিং ধরে বমি করতে শুরু করেন।

ঝড়ের গর্জনকে ছাপিয়ে নোলান চিৎকার করে তাঁর চিত্রগ্রাহক হোয়াইটে ভ্যান হোয়াইটেমাকে ডেকে বললেন, ‘কিছু মনে না করলে বমি করার এই দৃশ্যগুলো কি আমরা ক্যামেরায় ধারণ করতে পারি?’ দীর্ঘ এক বছর পর, লন্ডনের করিন্থিয়া হোটেলের শান্ত পরিবেশে বসে ৫৫ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ-আমেরিকান পরিচালক সেই দিনের স্মৃতিচারণ করছিলেন।

নোলান হাসিমুখে বলেন, ‘অভিনেতাদের কৃতিত্ব দিতেই হয়, তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হয়ে চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছিলেন। দিনটি একই সঙ্গে যেমন কষ্টের ছিল, তেমনি দারুণ কিছু শট এনে দিয়েছিল। সেগুলোই পরবর্তীতে এই সিনেমায় আমার অন্যতম প্রিয় দৃশ্য হয়ে ওঠে।’

হোমার রচিত প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যের ওপর ভিত্তি করে নোলানের এই নতুন সিনেমাটিকে (দ্য ওডিসি) ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সিনেমার প্রিমিয়ারের ঠিক আগের রাতে ফুটবল ম্যাচ দেখার কারণে ভোর ৪টা পর্যন্ত জেগে থাকা নোলান চা পান করছিলেন আর তাঁর সিনেমা নির্মাণের নানা অভিজ্ঞতা শোনাচ্ছিলেন।

১৯৭০ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া এবং যুক্তরাজ্য ও শিকাগোয় বেড়ে ওঠা নোলান ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৯৮ সালে তিনি তাঁর প্রথম স্বল্প বাজেটের ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ক্রাইম থ্রিলার ‘ফলোয়িং’ দিয়ে বাজিমাত করেন। এরপর ভাই জোনাথনের ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি করেন ‘মেমেন্টো’। মাত্র ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের সেই সাইকোলজিক্যাল মিস্ট্রি সিনেমাটি তাঁকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়। এরপর একে একে ইনসোমনিয়া, ব্যাটম্যান ট্রিলজি, ইনসেপশন, ইন্টারস্টেলার এবং ২০২৩ সালে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করা ও সাতটি অস্কার জেতা ওপেনহাইমার-এর মতো কালজয়ী সিনেমা উপহার দেন তিনি।

হলিউডের স্টুডিও ও নির্মাতারা তাঁর ওপর চোখ বন্ধ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে, কারণ দর্শনের জটিল মনস্তত্ত্ব বা সময়কে উল্টো করে দেখানোর মতো দুরূহ বিষয়কেও নোলান অবলীলায় বক্স অফিস হিটে রূপান্তর করতে পারেন। নোলান জানান, অনেকে ভাবছেন ‘দ্য ওডিসি’ তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ২০১২ সালের ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’ এখনো তাঁর সবচেয়ে বেশি বাজেটের ছবি।

এই সিনেমাটি মুক্তির আগেই ইন্টারনেটে তীব্র সংস্কৃতি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিল। গত মে মাসে যখন জানা যায়, জিউসের পৌরাণিক কন্যা ‘হেলেন অব ট্রয়’ চরিত্রে অভিনয় করবেন কেনিয়ান-মেক্সিকান কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুপিটা ইয়ংও, তখন ইলন মাস্কসহ একদল ইউটিউবার নোলানকে হলিউডের ‘ওক এজেন্ডা’-র কাছে আত্মসমর্পণ করার দায়ে অভিযুক্ত করেন। এ ছাড়া ট্রিলজির অন্য একটি চরিত্রে ট্রান্সজেন্ডার অভিনেতা এলিয়ট পেজের কাস্টিং নিয়েও অনেকে আপত্তি তোলেন, যার ফলে ইউটিউবে সিনেমার ট্রেইলারে প্রায় ৬ লাখ ডিসলাইক পড়ে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে নোলান শান্তভাবে চায়ে চুমুক দিয়ে হেসে বলেন, ‘এগুলো আসলে এই পেশারই অংশ। মানুষ সিনেমাটি দেখার আগেই যেসব বিতর্ক করে তা পুরোপুরি অর্থহীন। কারণ তারা জানেই না পর্দায় আসলে কী আসতে চলেছে। আমি ব্যাটম্যান নির্মাণের সময় ১০ বছর এই ধরনের ভক্তদের উন্মাদনা সামলেছি। হিথ লেজারকে যখন জোকার চরিত্রে নেওয়া হয়েছিল, তখনো অনেকে আকাশ থেকে পড়েছিলেন। আমার কাজ হলো মূল টেক্সটের প্রতি সৎ থেকে নিজের সেরা কাজটা পর্দায় ফুটিয়ে তোলা।’

বর্তমান যুগের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মধ্যেও নোলান প্রথাগত প্র্যাক্টিক্যাল ইফেক্টস এবং অ্যানিমেট্রনিক্সের ওপর ভরসা করেন। সিনেমার দৃশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যত্রতত্র ব্যবহারের বিরোধিতা করেন। তিনি তাঁর নিজের চার সন্তানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম এআইয়ের তৈরি কৃত্রিম জিনিসগুলো খুব দ্রুত ধরে ফেলে এবং তা প্রত্যাখ্যান করে। চলচ্চিত্রে এখন আবার বাস্তব ও স্পর্শকাতর গল্প বলার ধারা ফিরে আসছে।’

নোলানের নিজের প্রযুক্তিবিমুখতাও চলচ্চিত্র পাড়ায় বেশ কিংবদন্তিতুল্য। তিনি আজ পর্যন্ত কোনো স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না। এ বিষয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই এখন পড পিপল বা ফোনের দাস হয়ে গেছেন। আমি যদি একটা স্মার্টফোন কিনতাম, তবে আমি খুব বাজেভাবে এতে আসক্ত হয়ে পড়তাম এবং সারাক্ষণ ইন্টারনেটে তথ্য খুঁজতাম। আমি আমার সিনেমার নতুন নতুন আইডিয়াগুলো মূলত সেই সময়গুলোতেই মাথায় আনি যখন সাধারণ মানুষ পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে ডুবে যায়—যেমন ট্রেনে বা এয়ারপোর্টে অপেক্ষার সময় কিংবা রেস্তোরাঁয় কারও জন্য বসে থাকার মুহূর্তগুলোতেই আমি আমার পরবর্তী কাজের রূপরেখা তৈরি করি।’

স্মার্টফোন না থাকার কারণে তিনি ইন্টারনেটের কোনো গুজবে কান দেন না এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রল থেকেও দূরে থাকেন। কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর মতো ‘১০টি সিনেমা বানিয়ে অবসরে যাওয়া’-র নিয়মে তিনি বিশ্বাসী নন। নোলান মনে করেন, প্রতিটি সিনেমাই এমনভাবে বানানো উচিত যেন এটিই তাঁর জীবনের শেষ কাজ। সিনেমা হলের ভেতরে ফোন ব্যবহারেরও বিরোধী নোলান। আগামী ১৭ জুলাই শুক্রবার থেকে বিশ্বজুড়ে প্রেক্ষাগৃহে তাঁর নতুন সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’ উপভোগ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন দর্শকদের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত