Ajker Patrika

গুম, হেফাজতে খুন নিয়ে নির্মিত সিনেমা নিষিদ্ধ করল ভারত সরকার, তুমুল বিতর্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৩: ২২
গুম, হেফাজতে খুন নিয়ে নির্মিত সিনেমা নিষিদ্ধ করল ভারত সরকার, তুমুল বিতর্ক
দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত ‘শতলুজ’ সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে পাঞ্জাবের বিতর্কিত ছবি ‘সতলুজ’ সরিয়ে নেওয়ার পর তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের দর্শকদের জন্য ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। জশবন্ত সিং খালরা নামক এক শিখ মানবাধিকারকর্মীর জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ।

ছবিটি আকস্মিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার তীব্র নিন্দা করেছেন স্বয়ং দিলজিৎ দোসাঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না।’

বিখ্যাত বিনোদন সাময়িকী ভ্যারাইটি ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিলজিৎ দোসাঞ্জ এই ছবিটিকে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম অর্থবহ কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই জশবন্ত সিং খালরা জির আত্মত্যাগ এবং মানবতার প্রতি তাঁর অবদানই ছিল এই চলচ্চিত্রে আমার যুক্ত হওয়ার মূল কারণ। আমি অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে এই চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’

ছবিটি ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কা দোসাঞ্জ আগেই করেছিলেন। গত শনিবার এক ইনস্টাগ্রাম লাইভে তিনি ভক্তদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, সোমবারের মধ্যে ছবিটি নামিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে কোনো চিন্তা নেই, আপনারা এটি ডাউনলোড করে নিন।’

সোমবার রাজস্থানে খোলা আকাশের নিচে প্রজেক্টরে ছবিটির একটি গণপ্রদর্শনীর ভিডিও ক্লিপ এক্সে (সাবেক টুইটার) শেয়ার করে দোসাঞ্জ পাঞ্জাবিতে লেখেন, ‘হুন নি রুকনি ফিল্ম। খালরা সাব দি আওয়াজ নু কোই নি দাবা সাকদা।’ (অর্থাৎ, এই ছবি আর থামানো যাবে না। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না)।

কী বলছে জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষ?

হানি ত্রেহানের পরিচালনায় এবং দিলজিৎ দোসাঞ্জ ও অর্জুন রামপাল অভিনীত এই ছবিটিতে মূলত ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে পাঞ্জাবে পুলিশের হাতে নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হাজার হাজার মানুষের পরিচয় শনাক্তকরণ ও সৎকারের লড়াইকে তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতের বাইরে ‘জি-ফাইভ গ্লোবাল’ প্ল্যাটফর্মে ছবিটি এখনো দেখা গেলেও, ভারতের ক্যাটালগ থেকে এটি তুলে নেওয়া হয়েছে। জি-ফাইভ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, ‘মুক্তির পর থেকে “সতলুজ” ছবিটির প্রতি দর্শকদের সাড়া সত্যিই অভিভূত করার মতো। আমরা ছবিটির সৃজনশীল ভাবনার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আছি... তবে বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারতে ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ থাকবে। আমরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ উপায়ে ছবিটি যত দ্রুত সম্ভব ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’

রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ

ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা পাঞ্জাবের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় তুলেছে। রাজনৈতিক দলগুলো একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছে।

শিরোমনি আকালি দল (এসএডি) দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদল এক পোস্টে বলেন, ‘এটি আমাদের যৌথ স্মৃতি, সত্য এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এক নির্লজ্জ আঘাত। পাঞ্জাবকে তার অতীতের অপ্রীতিকর ইতিহাসের মুখোমুখি হতে দেওয়া উচিত, তা চাপা দেওয়া কোনো সমাধান নয়।’

কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা অবিলম্বে ছবিটি পুনরায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ছবিতে প্রদর্শিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আদালতের রায়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

আম আদমি পার্টির (এএপি) সংসদ সদস্য মালবিন্দর সিং কাং সরাসরি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এই ছবিটি ব্লক করে বিজেপি তাদের আসল মুখ উন্মোচন করেছে। পাঞ্জাবের সত্য প্রকাশে তাদের ঐতিহাসিক ভয় আবারও স্পষ্ট হলো।’

শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির (এসজিপিসি) প্রধান সচিব কুলবন্ত সিং মানান বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন, পাঞ্জাবের চরমপন্থী সময়কালের ইতিহাস নিয়ে নির্মিত এই ছবি দেখার এবং সে সম্পর্কে নিজস্ব মতামত তৈরি করার অধিকার জনগণের রয়েছে।

তিন বছরের সেন্সরশিপ জটিলতা

চলচ্চিত্রটির এই ওটিটি মুক্তি সহজ ছিল না। মূলত ‘ঘাল্লুঘারা’ (শিখদের ওপর হওয়া ঐতিহাসিক গণহত্যা নির্দেশক শব্দ) নামে ২০২২ সালে ছবিটি প্রথম সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের (সিবিএফসি) কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। সে সময় বোর্ড ছবিটির ১২৭টি দৃশ্য কাটার নির্দেশ দেয় এবং ছবির নাম বদলে ‘পাঞ্জাব ৯৫’ রাখার কথা বলে।

প্রযোজকেরা প্রথমে বম্বে হাইকোর্টে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেন। তিন বছর ধরে জটিলতা চলার পর এবং ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রিমিয়ার থেকে ছবিটিকে সরিয়ে নেওয়ার পর, অবশেষে গত ৩ জুলাই ‘সতলুজ’ নামে ছবিটি ভারতের জি-ফাইভে মুক্তি পায়।

পরিচালক হানি ত্রেহান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, থিয়েটার রিলিজ পাওয়ার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ওটিটি মুক্তির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেন্সর বোর্ডের কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘ বিলম্বের পর, ছবির প্রযোজকেরা সেন্সর সার্টিফিকেট ছাড়াই সরাসরি ওটিটি মুক্তির পথ বেছে নেন। দিলজিৎ দোসাঞ্জও দাবি করেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ছবিটি কোনো রকম কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল।

কেন জশবন্ত সিং খালরা ও এই চলচ্চিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?

পাঞ্জাবের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে এই ছবি নির্মাণ করা হয়েছে। শিখ অধিকারকর্মী জশবন্ত সিং খালরা ১৯৯০-এর দশকে পাঞ্জাব পুলিশের দ্বারা বেওয়ারিশ বা অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে পুড়িয়ে ফেলা প্রায় ২৫ হাজার মৃতদেহের রহস্য উদ্‌ঘাটন করেন। তাঁর এই তদন্তের ফলে শত শত পুলিশ কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসে।

১৯৯৫ সালে জশবন্ত সিং খালরাকে তাঁর বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে পুলিশ হেফাজতেই তাঁকে হত্যা করা হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার (সিবিআই) তদন্তের পর ২০০৭ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট এই অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে চারজন পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

চলচ্চিত্রটি ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়ায় ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও পক্ষপাতমূলক সেন্সরশিপের বিতর্ক নতুন করে উসকে গেছে।

সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে উগ্র ডানপন্থী ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ছবি যেমন—‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ (২০২২), ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ (২০২৩) বা ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ (২০২৫) কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে প্রদর্শিত ও স্ট্রিম হচ্ছে, সেখানে পাঞ্জাবের বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি মানবাধিকার বিষয়ক চলচ্চিত্রকে কেন সেন্সরশিপের বেড়াজালে আটকে ভারতের দর্শকদের থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত