Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

গ্রিসে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম: লিখন কুণ্ডু

গ্রিসে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম: লিখন কুণ্ডু

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশ গ্রিসে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থী লিখন কুণ্ডু। দেশটির ইন্টারন্যাশনাল হেলেনিক ইউনিভার্সিটিতে এনার্জি বিল্ডিং ডিজাইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাদিম মজিদ।

একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রিসকে কেন বেছে নেবেন?

গ্রিস বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় এখানে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিবেশ, ঐতিহাসিক সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ গ্রিসকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

গ্রিসে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মাধ্যম ও খরচ কেমন?

গ্রিসে মূলত গ্রিক ও ইংরেজি—দুই ভাষায় পড়াশোনা করা যায়। বেশির ভাগ ব্যাচেলর প্রোগ্রাম গ্রিক ভাষায় হলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের প্রোগ্রাম রয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে মোট টিউশন ফি সাধারণত ৫০০ থেকে ৫ হাজার ইউরোর মধ্যে হয়। স্নাতকে বছরে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৫০০ ইউরো এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বছরে ৬ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত লাগে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে খরচের পার্থক্য হয়।

ভর্তির আবেদন সাধারণত কখন শুরু হয়?

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় মার্চ এপ্রিল মাসের দিকে। চলে জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত। বেসরকারি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোর্সভেদে বিভিন্ন সময় দেওয়া থাকে। তবে সাধারণত মার্চ থেকে জুলাই এবং নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরেই ভর্তির সুযোগ থাকে বেশি।

গ্রিসের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কী কী বৃত্তি ও সুবিধা দেয়?

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আইকেওয়াই সরকারি বৃত্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক মেধাবৃত্তির সুযোগ পেতে পারেন। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইরাসমাস প্লাস, ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তিরও সুযোগ রয়েছে। এসব বৃত্তির কিছু ক্ষেত্রে টিউশন ফি ছাড়, মাসিক ভাতা, গবেষণা অনুদান, যাতায়াত ও আবাসন সহায়তাও দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কম খরচে খাবার, পরিবহন ছাড় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পান।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা কোন কোন বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারেন?

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং, এনার্জি, কম্পিউটার সায়েন্স, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, এমবিএ, কৃষি, সাংবাদিকতা, সামাজিক বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, এনার্জি ও পর্যটনসংক্রান্ত বিষয়ে আছে ভালো সম্ভাবনা।

গ্রিসে পড়াশোনা করতে চাইলে কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন?

প্রথমে ভালো একাডেমিক ফল এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ থাকা দরকার। পাশাপাশি শিক্ষকদের কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন লেটার, একটি ভালোভাবে প্রস্তুত ইউরোপাস সিভি, মোটিভেশন লেটার এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সনদ প্রস্তুত রাখা উচিত। পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রাম আগে থেকে শর্টলিস্ট করে আবেদনের সময়সীমা জেনে নিন। ভিসার ক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত ও গ্রহণযোগ্য লেনদেন রাখা প্রয়োজন।

গ্রিসে একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার ব্যয় কী ধরনের?

শহর ও বাসস্থানের ধরন অনুযায়ী খরচের ভিন্ন ভিন্ন হয়। কয়েকজন মিলে বাসা ভাগাভাগি করে থাকলে এবং নিজে রান্না করে খেলে খরচ কমানো সম্ভব। সাশ্রয়ীভাবে চললে মাসে ৩০০ থেকে ৩৫০ ইউরো দিয়ে চলা যায়। তবে বাসাভাড়াসহ অন্যান্য ব্যয়ের জন্য মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ ইউরোর প্রস্তুতি রাখা উচিত।

শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ কেমন?

গ্রিসে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ মোটামুটি ভালো। বিশেষ করে দেশটি পর্যটননির্ভর হওয়ায় গ্রীষ্মকালে বিভিন্ন দ্বীপ, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে কাজের সুযোগ বেড়ে যায়। ফুড ডেলিভারি, ক্যাফে, দোকান ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজেও শিক্ষার্থীরা কাজ করতে পারেন। তবে গ্রিক ভাষা জানা থাকলে চাকরি পাওয়া অনেক সহজ হয়।

উচ্চশিক্ষা শেষে গ্রিসে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে কি?

উচ্চশিক্ষা শেষে ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, এনার্জি, কৃষি, আইটি, স্বাস্থ্য এবং গবেষণা খাতে কাজের সুযোগ রয়েছে। গ্রিসে পর্যটনশিল্প অনেক বড় হওয়ায় হোটেল ও রেস্টুরেন্ট সেক্টরে চাকরির চাহিদা বেশি। সমুদ্র ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে মেরিটাইম ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতেও ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপীয় ডিগ্রি থাকলে ইউরোপের অন্য দেশেও চাকরির জন্য আবেদন করা তুলনামূলক সহজ হয়।

গ্রিসে যাওয়ার পরে আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

থেসালোনিকিতে আসার পর আমার বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বাসা খুঁজে পাওয়া। সে সময় সেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম ছিল। ফলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি, বাসা ও চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। ভাষাগত সমস্যাও ছিল। তবে এখন অনেক পরিচিত মানুষ হয়েছে এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি ছোট গ্রুপও তৈরি করেছি।

গ্রিসে বাংলাদেশিরা কোন কোন খাতে কাজ করেন?

গ্রিসে বাংলাদেশিরা মূলত রেস্টুরেন্ট, হোটেল, ফুড ডেলিভারি, কৃষি, নির্মাণ ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত। কিছু বাংলাদেশির নিজস্ব দোকান, রেস্টুরেন্ট ও ছোট ব্যবসাও রয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এবং অভিবাসী হিসেবে অনেক বাংলাদেশি গ্রিসে কাজ ও বসবাস করছেন।

গ্রিসের কোন কোন শহরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন?

সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি এথেন্সে বসবাস করেন। এ ছাড়া থেসালোনিকি ও পাতরাসেও কিছু বাংলাদেশি সারা বছর থাকেন। পর্যটন মৌসুমে সান্তোরিনি, মিকোনোস, রোডস, ক্রিটসহ বিভিন্ন দ্বীপে অনেক বাংলাদেশি কাজ করতে যান।

যাঁরা ভবিষ্যতে গ্রিসে যেতে চান, তাঁদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

প্রথমে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বীকৃত প্রোগ্রামগুলো দেখে আবেদন করুন। কম টিউশন ফি হলে শিক্ষার্থীর আর্থিক ও মানসিক চাপ কম থাকে। গ্রিসে আসার আগে নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার রাখুন। পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিন। পাশাপাশি কিছু ব্যবহারিক দক্ষতা ও গ্রিক ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করে এলে এখানে জীবনযাপন ও চাকরি খোঁজা অনেক সহজ হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত