Ajker Patrika

প্রতিষ্ঠার ১০৬ বছর: আবাসন, খাবার, পরিবহন ও গবেষণা সংকটে ভারাক্রান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মো. বেলাল হোসেন, ঢাবি
প্রতিষ্ঠার ১০৬ বছর: আবাসন, খাবার, পরিবহন ও গবেষণা সংকটে ভারাক্রান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০৫ বছরের পথচলায় দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাশাপাশি আবাসন সংকট, হলের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ, পরিবহন দুরবস্থা, নিরাপত্তা শঙ্কা, গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত চাপ ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়টির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

ব্রিটিশ ভারতের পূর্বাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টি শুরুতে ছিল ৩টি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১২টি ইনস্টিটিউট, ১৯টি আবাসিক হল,৩টি হোস্টেল, ৫৬ টিরও বেশি গবেষণা কেন্দ্র, প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষার্থী এবং প্রায় ২ হাজার শিক্ষক রয়েছেন।

দীর্ঘ এই পথচলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন জাতীয় সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবদান উল্লেখযোগ্য।

এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগামী দুই দশকের এক উচ্চাভিলাষী একাডেমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিকীকরণ এবং প্রশাসনিক আধুনিকায়নের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে নিয়ে যাওয়াই তাদের লক্ষ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে আলোচিত ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর একটি আবাসন সংকট। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন আবাসিক হলে আসন পান না। বিশেষ করে প্রথম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থীকে মাসের পর মাস রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যয়বহুল মেস ও সাবলেটে থাকতে হয়।

বিভিন্ন হলে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘বিজয় ৭১’ হলে চারজনের একটি কক্ষে চারজনের পরিবর্তে আটজন পর্যন্ত থাকেন। এতে ডাইনিং, বাথরুম, পানির লাইন এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি হলেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী থাকার অভিযোগ রয়েছে।

আবাসনের পাশাপাশি আবাসিক শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলের ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অধিকাংশ হলের ডাইনিংয়ে খাবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি রয়েছে। মাছ ও মাংসের মান নিম্নমানের, সবজিতে বৈচিত্র্য কম এবং রান্নার মানও অনেক ক্ষেত্রে সন্তোষজনক নয়। কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে কিছু শিক্ষার্থী তুলনামূলক বেশি খরচ করে হলের বাইরে খাবার খেতে যান।

খাবারের নিম্নমান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। হল প্রশাসন ও ক্যান্টিন মালিকের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি দৈনিক আজকের পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেন মাস্টারদা সূর্যসেন হলের একাধিক শিক্ষার্থী। তাঁরা বলেন, হলের ডাইনিংয়ে যে খাবার পরিবেশন করা হয়, তা ‘খেয়ে জীবন ধারণ করাই কষ্টকর।’ তাদের ভাষ্য, খাবারের স্বাদ ও মান যেমন হতাশাজনক, তেমনি অনেক সময় তা স্বাস্থ্যসম্মতও থাকে না।

অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থাও বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বহরে এখনও বেশ কিছু পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাস চলাচল করছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাসের অবস্থাও নাজুক। দীর্ঘদিন ধরে এসব বাস পরিবর্তন বা আধুনিকায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা।

বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের শিক্ষার্থী আমিনা খাতুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হল থেকে বাসে করে ক্যাম্পাসে আসার সময় বাসের ফ্লোরের ছিদ্র দিয়ে নিচের রাস্তা দেখা যায়। এমন অবস্থার বাসে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়, যা নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক।’

পরিবহন সেবা শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত হওয়ায় প্রতিদিন সকাল ও ছুটির সময় অনেক শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়। বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বাস সংযোজন এবং জরাজীর্ণ যানবাহন দ্রুত প্রতিস্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের।

ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শহীদ মিনার এলাকায় ভবঘুরে, মাদকসেবী ও ছিন্নমূল মানুষের অবাধ বিচরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর উদ্যানের বিভিন্ন অংশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় অনেক শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা, সেখানে চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগে ছিনতাই, হয়রানি, ইভটিজিং ও শারীরিক আক্রমণের মতো ঘটনার কথাও উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে নিয়মিত টহল, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি নজরদারি এবং অবৈধ আড্ডা উচ্ছেদসহ কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

গবেষণার ক্ষেত্রেও বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য আধুনিক গবেষণাগার, যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদানের অভাব রয়েছে। অনেক শিক্ষক নিজস্ব উদ্যোগে কিংবা বিদেশি সহযোগিতায় গবেষণা পরিচালনা করলেও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, লাইব্রেরিতে আসন সংকট এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, পাঠাগার ও অন্যান্য একাডেমিক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ হয়নি। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বিভাগগুলোতে একটি বিভাগের জন্য মাত্র একটি নিজস্ব ক্লাসরুম রয়েছে; প্রয়োজনে অন্য ক্লাসরুম ব্যবহার করা হয়।

সনদ, ট্রান্সক্রিপ্ট, একাডেমিক অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা পেতেও অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হয়। শিক্ষার্থীদের মতে, আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও স্বয়ংক্রিয় ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা সময়ের দাবি।

এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা অনেক বড়, তবে সম্পদ ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তারপরও নানা সংকটের মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। সম্প্রতি কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে। তবে আমরা এখানেই থেমে থাকতে চাই না; গবেষণা, শিক্ষা, আন্তর্জাতিকীকরণ ও উদ্ভাবনে আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছি।’

উপাচার্য আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন, অবকাঠামোসহ বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান হবে বলে আমরা আশা করছি এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্নত ও আধুনিক শিক্ষা-পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত