
বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া অনেকের স্বপ্ন। প্রায়ই শোনা যায়, বিদেশ মানেই সুন্দর জীবন। আর গন্তব্য যদি হয় যুক্তরাষ্ট্র, তাহলে তো কথাই নেই; উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখে পড়ে দেশটির মনোরম ক্যাম্পাস, পরিপাটি জীবনযাপন। এ যেন সবকিছুই নিখুঁত। তবে এ ছবির বাইরেও রয়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতা, যা অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। বিদেশে শিক্ষার্থী হিসেবে পা রাখার পরই বোঝা যায়, নতুন পরিবেশে নিজেকে গড়ে তুলতে কতটা কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে শিক্ষার্থীদের যেসব বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, সেসব নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কলেজের শিক্ষার্থী সোহিনী নদী।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা
উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে গিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রথমে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, সেটি হলো অর্থনৈতিক চাপ। বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, বই, মোবাইল বিল, স্বাস্থ্যবিমা—সবকিছুর খরচ তুলনামূলক বেশি। দেশে বসে করা বাজেট পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল থাকে না। মাসের শেষে ব্যাংক হিসাবের টাকা কমে যাওয়ার দুশ্চিন্তা, জরুরি খরচ এবং প্রতিদিনের ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থী খরচ কমাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন কমিয়ে দেন। তবু ভেতরের চাপ থেকে যায়। ফলে একধরনের নীরব মানসিক চাপ দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হয়।
সংগ্রাম ও সীমাবদ্ধতা
বিদেশে শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকে আর্থিক সংকটে পড়েন। অন-ক্যাম্পাসে কাজ পাওয়া সহজ নয়; দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও অনেকে কাজ পান না। আবার যাঁরা কাজ পান, তাঁদের জন্য পড়াশোনা এবং কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রাত জেগে কাজ করে পরদিন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, অফ-ক্যাম্পাসে কাজের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা এবং ঝুঁকি থাকায় সব সময় একধরনের ভয় কাজ করে। এই অনিশ্চয়তা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে।
নতুন পদ্ধতি ও চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপদ্ধতি অনেক শিক্ষার্থীর জন্য
নতুন এবং চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ে। এখানে শুধু পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর না করে অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, গ্রুপ প্রজেক্টসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে মূল্যায়ন করা হয়। একসঙ্গে একাধিক ডেডলাইন, শিক্ষকদের উচ্চ প্রত্যাশা এবং ভালো জিপিএ
ধরে রাখার চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। অনেক সময় দলগত কাজে সমন্বয় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে থাকে এবং মানসিক চাপ আরও গভীর হয়।
সময় ব্যবস্থাপনা
অনেক শিক্ষার্থী শুরুতে কোনো পরিকল্পনা ছাড়া চলতে গিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট মিস করে ফেলেন। আবার কাজ এবং পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। এ ক্ষেত্রে গুগল ক্যালেন্ডারের মতো ডিজিটাল টুল ব্যবহার করে কাজগুলো আগেভাগে পরিকল্পনা নিয়ে করলে সময়মতো শেষ করা সহজ হয়। যাঁরা সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তাঁদের ক্ষেত্রে চাপ তুলনামূলকভাবে কমে আসে।
নতুন জায়গা চেনাজানায় সমস্যা
বিদেশে এসে শুরুতে কোথায় কোন বাস ধরতে হবে, কোন রুটে যাওয়া উচিত—এসব বিষয় অনেকের জন্য বিভ্রান্তিকর। গুগল ম্যাপের মতো অ্যাপ ব্যবহার করে কিছুটা সমাধান পাওয়া গেলেও শুরুতে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। দেরি হয়ে যাওয়া বা ভুল পথে চলে যাওয়ার মতো ছোট ছোট ঘটনা প্রতিদিনের চাপকে বাড়িয়ে দেয়।
একাকিত্বে অসহায় পথচলা
বিদেশে জীবনযাপনের অন্যতম কঠিন দিকটি হলো একাকিত্ব। পরিবার থেকে অনেক দূরে থাকা এবং পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন বাস্তবতায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া মোটেই সহজ নয়। অনেক সময় ছোট ছোট বিষয়েও মন খারাপ হয়। দেশের খাবার, পরিবারের মানুষ এবং বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি বারবার মনে পড়ে। তবে এসব অনুভূতি বেশির ভাগ সময় নিজের মধ্যেই রাখতে হয়। কারণ, সবকিছু শেয়ার করার মতো মানুষ সব সময় পাওয়া যায় না।
ভাষা ও আত্মবিশ্বাসের সমস্যা
ইংরেজি জানা থাকলেও নতুন পরিবেশে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ক্লাসে অংশ নেওয়া, প্রেজেন্টেশন দেওয়া কিংবা নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব ক্ষেত্রে দ্বিধা কাজ করে। সময়ের সঙ্গে এই সমস্যা কমে এলেও শুরুতে এটি বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রে এসে অনেক শিক্ষার্থী প্রথম ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। শুরুতে এটি সহজ মনে হলেও সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে তা ঋণের বোঝায় পরিণত হতে পারে। অনেকে না বুঝে খরচ করে ফেলেন এবং পরে বিল পরিশোধ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়েন। ন্যূনতম পেমেন্ট দিতে দিতে ঋণ বাড়তে থাকে এবং উচ্চ সুদের কারণে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি একটি ভালো ক্রেডিট হিস্ট্রি গড়ে তুলতে সহায়তা করে, যা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা জরুরি।
নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্ব
অনেক শিক্ষার্থী শুরুতে নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভালো যোগাযোগ অনেক সময় ভালো সুযোগের দরজা খুলে দেয়। সহপাঠী, শিক্ষক ও সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক হয়। লিংকডইনের মতো পেশাগত প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশি কমিউনিটির সংযোগ
বিদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি বা স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ করে। নতুন শিক্ষার্থীরা অনেক সময় একা হয়ে পড়েন এবং দিকনির্দেশনার অভাবে বিভ্রান্ত হন। এ ক্ষেত্রে এসব সংগঠন বাসা খোঁজা, বই বা ফার্নিচার শেয়ার, পার্টটাইম কাজের তথ্য এবং মানসিক সহায়তার মতো বিষয়ে সহায়তা করে। একই ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে এখানে সহজে যোগাযোগ তৈরি হয় এবং অনেকটা নিজের দেশের মতো অনুভূতি পাওয়া যায়।
সঠিক তথ্যের গুরুত্ব
বিদেশে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক তথ্য পাওয়া। সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা পরিচিতদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য সঠিক বা হালনাগাদ থাকে না। এতে বাড়ে বিভ্রান্তি এবং কখনো কখনো বড় সমস্যার পড়তে হয়। তাই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস অথবা বিশ্বস্ত সিনিয়রদের কাছ থেকে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
মনে রাখা দরকার
বিদেশে শিক্ষাজীবন ও জীবনযাপন সহজ করতে কিছু বিষয় আগে থেকে প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। যেমন ৬ থেকে ১২ মাসের জন্য পরিষ্কার আর্থিক পরিকল্পনা রাখা, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের নিয়ম ও ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, এফ-১ ভিসা, সিপিটি, ওপিটি ও এসএসএন-সংক্রান্ত নিয়ম জানা, অন-ক্যাম্পাস চাকরির সুযোগ ও আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত থাকা।
এ ছাড়া সময় ব্যবস্থাপনার জন্য ডিজিটাল টুল ব্যবহার শেখা, নতুন জায়গায় চলাচলের জন্য গুগল ম্যাপ ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, লিংকডইনে নেটওয়ার্ক তৈরি করা, বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং যেকোনো তথ্য যাচাই করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া মানসিকভাবে একাকিত্ব ও চাপ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকাও প্রয়োজন।
অনুলিখন: আনিসুল ইসলাম নাঈম

প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত গুজব ছড়ানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করতে গণমাধ্যমের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে গুজব ছড়ানো হলেও তা যাচাই না করে প্রচার করলে শিক্ষার্থীরা..
৩ মিনিট আগে
ভর্তি পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা-সমন্বয়হীনতার কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের এক বছরে সম্মিলিতভাবে প্রায় ‘৪০ লাখ’ বছর সময় অপচয় হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
১ ঘণ্টা আগে
পড়াশোনায় ভালো ফল অর্জনের জন্য শুধু বেশি সময় ব্যয় করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতি, পরিকল্পনা এবং নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তোলা। মনোযোগ ধরে রাখা, সময় ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত অনুশীলন এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা—এসব মিলেই শেখার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তোলে। আজকের আলোচনা এসব নিয়েই।
৩ ঘণ্টা আগে
ভাইভা বোর্ড মূলত একজন প্রার্থীর জ্ঞানের গভীরতার চেয়ে তাঁর নেতৃত্বদানের সক্ষমতা এবং চাপের মুখে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা যাচাই করে। তাই বোর্ডে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে প্রস্থান পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত সুচিন্তিত ও মার্জিত।
৩ ঘণ্টা আগে