Ajker Patrika

শিক্ষার্থীদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল

সাব্বির হোসেন
শিক্ষার্থীদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিদিন আমরা অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিই। সকালে কখন ঘুম থেকে উঠব, কী খাব, কী পড়ব, কোথায় সময় ব্যয় করব; এমনকি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়েও ভাবতে হয়। সাধারণত মনে করি, এসব সিদ্ধান্ত ঠিকঠাকই নিই। কিন্তু মস্তিষ্ক যে আমাদের ভুল পথে পরিচালনা করতে পারে, তা নিয়ে মোটেই ভাবি না। নোবেলজয়ী মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেমান তাঁর বিখ্যাত বই ‘থিংকিং ফাস্ট অ্যান্ড স্লো’ বইয়ে দেখিয়েছেন, মানুষ প্রায়ই দ্রুত চিন্তা, আবেগ এবং মানসিক পক্ষপাতের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।

তাহলে কীভাবে এই মানসিক ফাঁদগুলো এড়িয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।

আবেগের সময় বড় সিদ্ধান্ত নয়

আমাদের মস্তিষ্ক স্বভাবগতভাবে কিছুটা অলস; এটি সব সময় দ্রুত এবং সহজ সমাধান খুঁজতে চায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এমন দ্রুত ভাবনার ওপর পুরোপুরি ভরসা করা ঠিক নয়। তখন মস্তিষ্ককে সচেতনভাবে ধীর ও যুক্তিনির্ভরভাবে ভাবতে বাধ্য করতে হয়; বিশেষ করে আনন্দ, দুঃখ বা হতাশার মতো তীব্র আবেগের সময় মানুষের যুক্তিবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ওই অবস্থায় বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একইভাবে ক্লান্তি, ঘুমের অভাব বা ক্ষুধাও চিন্তার স্বচ্ছতা নষ্ট করে, যা ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে। তাই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক স্থিরতা এবং ঠান্ডা মাথায় ভাবা জরুরি। শুধু অনুমান বা ‘সিক্সথ সেন্স’-এর ওপর ভরসা না করে বাস্তব তথ্য ও যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রথম ধারণায় সিদ্ধান্ত নয়

আমরা অনেক সময় কোনো মানুষ বা ঘটনা প্রথম দেখার পর দ্রুত একটি ধারণা তৈরি করে ফেলি। মস্তিষ্ক সেই প্রথম তথ্যকে ধরে নিয়েই পরবর্তী বিশ্লেষণ শুরু করে, যাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় অ্যাংকারিং বায়াস। এ কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও তথ্য যাচাই করা জরুরি। শুধু কোনো বিষয় সহজে বোঝা যাচ্ছে বলেই সেটি সঠিক, এমন ভাবা ভুল হতে পারে। বাস্তব সত্য অনেক সময় জটিল ও গভীর হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই তথ্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলে আমাদের সিদ্ধান্তও বদলে যেতে পারে। তাই কোনো প্রস্তাব বা বক্তব্যের বাহ্যিক চাকচিক্য বা শব্দের প্রভাবের দিকে না গিয়ে তার মূল অর্থ ও সত্যটা বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

অতি আত্মবিশ্বাস এড়িয়ে চলুন

নিজের ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অনেক সময় বড় ভুলের কারণ হতে পারে। আমরা প্রায়ই ভাবি, অনেক কিছু জানি, কিন্তু বাস্তবে আমাদের অজানা বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা কম থাকে। এই ‘জ্ঞানভ্রম’ থেকে দূরে থাকাই সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

নিজের ভুল চিহ্নিত করতে পারা এবং তা স্বীকার করার মানসিকতা উন্নতির প্রথম ধাপ। পাশাপাশি, অন্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি। ‘ভিড় যা করছে, সেটাই সঠিক’—এই ধারণা সব সময় সত্য নয়। তাই নিজের যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির ওপর ভরসা করা উচিত। এমনকি বিশেষজ্ঞদের মতামতও সব সময় অন্ধভাবে গ্রহণ করা ঠিক নয়; কারণ, তাঁরাও মানসিক পক্ষপাতের বাইরে নন।

স্রোতে না ভেসে নিজের সিদ্ধান্ত নিন

মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো লাভের চেয়ে ক্ষতির ভয় বেশি অনুভব করা। এই অতিরিক্ত ভয় অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে দেয়। তাই অযথা ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ ছাড়া বড় সাফল্যে শুধু মেধা বা পরিশ্রম নয়, অনেক সময় ভাগ্য ও সুযোগেরও ভূমিকা থাকে। তাই ব্যর্থ হলে নিজেকে অতিরিক্ত দোষারোপ না করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়াই ভালো। আরেকটি বিষয় হলো, আমরা প্রায়ই কোনো অভিজ্ঞতা বা ঘটনার পুরোটা নয়, বরং তার শেষ অংশ দেখে মূল্যায়ন করি। তাই যেকোনো কাজ বা অভিজ্ঞতার সমাপ্তি যতটা সম্ভব ভালো এবং ইতিবাচক করার চেষ্টা থাকা উচিত।

সব সময় অতিরিক্ত আশাবাদী হবেন না

অনেক সময় আমরা কোনো কাজ শেষ করতে যতটা সময় লাগবে, তা ভুলভাবে কম ধরে নিই। এই অতিরিক্ত আশাবাদ বাস্তবে চাপ ও ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। তাই যেকোনো পরিকল্পনায় অতিরিক্ত সময় হাতে রাখা ভালো।

জীবন একটি দীর্ঘ যাত্রা

জীবন কোনো দ্রুত দৌড় নয়, একটি দীর্ঘ ম্যারাথন। এখানে ধৈর্য ও সঠিক সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় শক্তি। দ্রুত উত্তর খোঁজার চেয়ে সময় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই দীর্ঘ মেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একমুহূর্ত থেমে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কি সত্যিই যুক্তি দিয়ে ভাবছি, নাকি আমার মন আমাকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে?’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত