Ajker Patrika

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ক্যাম্পাসেও নিরাপত্তাহীন ছাত্রীরা

  • ভবঘুরে, বহিরাগত, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি এবং কিছু রিকশাচালকের হেনস্তার শিকার।
  • তিন মাসে হেনস্তা, অশালীন আচরণ, পিছু নেওয়া এবং হামলার চেষ্টার অন্তত ১৫টি ঘটনা ঘটেছে।
মো. বেলাল হোসেন, ঢাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ক্যাম্পাসেও নিরাপত্তাহীন ছাত্রীরা

‘টিউশন শেষে পলাশী দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশের পর মনে হয়েছিল, এখন আমি নিরাপদ। কিন্তু নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই আমাকে এমন হয়রানির শিকার আমার বিশ্বাস ভেঙে দিল।’ হতাশার সঙ্গে এই অভিব্যক্তি জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মিম আক্তার।

মিম জানান, সম্প্রতি রাতে টিউশন শেষে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টারে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার সময় সলিমুল্লাহ হলের সামনে দিয়ে হাঁটছিলেন। এ সময় সন্দেহজনক এক ব্যক্তি তাঁকে অনুসরণ করে কথা বলতে চান। ওই ব্যক্তিকে এড়িয়ে দ্রুত এগোতে থাকলে একপর্যায়ে দৌড়ে কাছে আসেন এবং তাঁর চেহারা নিয়ে মন্তব্য করেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে মিম দৌড়ে মেডিকেল সেন্টারে ঢুকে পড়েন।

ডাক্তার দেখানোর পরও কিছুক্ষণ মেডিকেলের ভেতরে অপেক্ষা করেন মিম। পরে হলের উদ্দেশে বের হলে বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের সামনে আবারও একই ব্যক্তিকে দেখতে পান। মিমকে দেখেই ওই ব্যক্তি পুনরায় পিছু নিলে আতঙ্কিত অবস্থায় কোনোভাবে হলে ফিরে যান তিনি।

শুধু মিম নন, গত তিন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভবঘুরে, বহিরাগত, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি ও কিছু রিকশাচালকের হেনস্তা, অশালীন আচরণ, পিছু নেওয়া এবং হামলার চেষ্টার অন্তত ১৫টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের ছাত্রী আয়েশা আজমি বলেন, কিছুদিন আগে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে ক্লাসে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে থাকা এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি ইট হাতে তাঁদের দিকে তেড়ে আসেন। আশপাশের কয়েকজন এগিয়ে না এলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ছাত্রী জানান, ভিসি চত্বরে বাসের জন্য অপেক্ষার সময় এক ব্যক্তি হঠাৎ তাঁর মুখের মাস্ক জোরে টেনে খুলে ফেলেন। এতে তাঁর হিজাবের পিন ভেঙে যায় এবং হিজাব খুলে যায়। ঘটনার পর তাঁর থুতনিতে ব্যথা ও মুখে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।

ছাত্রীদের অভিযোগ, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে; বিশেষ করে দোয়েল চত্বর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন এলাকা, ফুলার রোড, জগন্নাথ হল ও শহীদ মিনার-সংলগ্ন সড়ক এবং বিভিন্ন আবাসিক হলের আশপাশে বহিরাগতদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। এ ছাড়া টিএসসি মেট্রোরেল স্টেশন ও লাইনের নিচের এলাকায় ছিন্নমূল মানুষের অবস্থান রয়েছে। তাদের কারণে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

সুফিয়া কামাল হলের সামনের পদচারী-সেতুটিও নারী শিক্ষার্থীদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে। ব্যস্ত সড়ক নিরাপদে পারাপারের জন্য সেতুটি নির্মাণ করা হলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বহিরাগত, ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি ও মাদকাসক্তদের উপস্থিতির কারণে এটি অনেকের কাছে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়েছে। ফলে অনেকে সেতু ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সড়ক পারাপার করেন।

অন্যদিকে, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল মূল ক্যাম্পাসের বাইরে আজিমপুর এলাকায় হওয়ায় এসব হলের শিক্ষার্থীদের নীলক্ষেত ও নিউমার্কেট হয়ে যাতায়াত করতে হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাস, লাইব্রেরি কিংবা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শেষে রাতে হলে ফেরার সময় অনেকে অনুসরণ, উত্ত্যক্ত বা অশোভন মন্তব্যের শিকার হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য সর্বমিত্র চাকমা বলেন, ‘ভবঘুরে, রিকশাচালক ও বহিরাগতদের কারণে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিক্ষার্থী শারীরিক বা মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে নিবন্ধিত রিকশা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়নি।

ডাকসুর পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ বলেন, নির্দিষ্ট পোশাকের আওতায় রিকশা ব্যবস্থা চালুর জন্য চালকদের তালিকা, ভাড়ার তালিকা, ভেস্ট তৈরিসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সহায়তা না থাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারদিক থেকে উন্মুক্ত হওয়ায় পুরো ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আবার সবার জন্য সম্পূর্ণ অবাধ প্রবেশাধিকার রাখাও নিরাপত্তার দিক থেকে যৌক্তিক নয়।’ তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধানে স্বরাষ্ট্র ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভবঘুরে ও মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের শুধু সরিয়ে না দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসরাফিল রতন বলেন, ‘কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর আমাদের টিম কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি উন্মুক্ত ক্যাম্পাস হওয়ায় অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়।’

সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদারে খুব শিগগির পাঁচটি ছাত্রী হলের প্রভোস্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। সেখানে বিদ্যমান সমস্যা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত