Ajker Patrika

গানের মুগ্ধ এবার প্রশাসনে

সংখ্যার সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর বন্ধুত্ব। সুরের সঙ্গে আরও বেশি সখ্য। এবার তিনি পা রাখলেন দেশের প্রশাসন অঙ্গনে। বলছি মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধর কথা। সম্প্রতি ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে মেধাক্রমে ৫০তম হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। বহুমাত্রিক এই পথচলার গল্প শুনিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম।

আনিসুল ইসলাম নাঈম
গানের মুগ্ধ এবার প্রশাসনে
মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

শৈশবে বোনা বীজ

মুগ্ধর জন্ম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাবা ইসকান্দার মির্জা ছিলেন কলেজশিক্ষক। মা তাহমিনা বেগম স্বাস্থ্য পরিদর্শক। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর একজন যমজ ভাইও আছেন। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় ছিলেন খুব আগ্রহী। তাঁর মা নিয়ম করে পড়াতেন। আর গণিতপ্রেমী বাবা গণিতের দক্ষতা বাড়াতে অনুপ্রাণিত করতেন।

মুগ্ধর শৈশব ছিল রঙিন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় সানশাইন কিন্ডারগার্টেনে। পরে ভর্তি হন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। এসএসসিতে অর্জন করেন জিপিএ–৫ এবং ঢাকা বোর্ডের বোর্ড ট্যালেন্ট স্কলারশিপ। নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসিতেও একই সাফল্য ধরে রাখেন। পরের গন্তব্য বুয়েট। স্নাতক শেষে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে। ২০১৯ সাল থেকে শিক্ষকতা করছেন সেখানে।

সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়

স্কুলজীবনে সহশিক্ষা কার্যক্রম ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ছিলেন নিয়মিত। নতুন কুঁড়ি, পদ্মকুঁড়ি, শাপলাকুঁড়ি, জাতীয় শিশু পুরস্কার, জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ প্রতিযোগিতা, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা, গণিত অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। সাফল্যও এসেছে ধারাবাহিকভাবে। ছয়বার জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ২০১২ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত ৫৩তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। অর্জন করেন অনারেবল মেনশন। একই বছরে এশিয়া-প্যাসিফিক গণিত অলিম্পিয়াডে (এপিএমও-২০১২) দেশের প্রথম ব্রোঞ্জ পদক জেতেন। ইরানিয়ান জিওমেট্রি অলিম্পিয়াডে পেয়েছেন তিনটি ব্রোঞ্জ এবং ২০২৪ সালে একটি রৌপ্যপদক। খেলাধুলাতেও ছিলেন সমান আগ্রহী। টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল ও ক্যারামের মতো ইনডোর-আউটডোর খেলায় নিয়মিত অংশ নিতেন। এর ফলস্বরূপ আন্তস্কুল টেবিল টেনিস ও বাস্কেটবল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন।

কণ্ঠে ছিল সুরের জাদু

ছোটবেলাতেই সংগীতের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গায়িকা কোহিনূর খানের কাছে তাঁর হাতেখড়ি। তিনি সম্পর্কে মুগ্ধের খালা হন। পরে তালিম নেন প্রয়াত সুবীর নন্দীর কাছে। ২০১০ সালে ‘চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। সেই প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন ও ইমন সাহা। এ পর্যন্ত নয়টি দেশে গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছে তাঁর। তবে বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর সংগীতে তুলনামূলক কম সময় দিতেন।

ঝুলিতে অনেক পুরস্কার

বুয়েটে ভর্তির আগেই জাতীয় পর্যায়ে ২৯টি পুরস্কার পেয়েছেন মুগ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও থেমে থাকেননি। ভারতে ৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বুয়েট দল চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই প্রতিযোগিতায় একমাত্র ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়নও ছিলেন মুগ্ধ। এ ছাড়া উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা, চিত্রাঙ্কন, হাতের লেখা ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ নানা প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার জিতেছেন।

বিসিএসে আগ্রহী যেভাবে

বিসিএস নিয়ে শুরুতে আগ্রহ ছিল না মুগ্ধের। ব্র্যাকে শিক্ষকতা করতেন। হঠাৎ দেখেন, তার যমজ ভাই বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই বাসায় এক ভাই কাজ করছেন, অন্যজন বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মুগ্ধর বিষয়টি কেমন যেন লাগল। বিসিএসের বিস্তৃত সিলেবাস তখন তাঁকে টানত না। পরিস্থিতি বদলায়, যখন তাঁর ভাই ৪১তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। মুগ্ধ বলেন, ‘বাবা-মা আমাকে বিসিএস দিতে উৎসাহ দিতেন। এদিকে শিক্ষকতা পেশাও আমার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু সুযোগ হারাতে চাইনি। তাই একবার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিই।’

প্রস্তুতি যেমন ছিল

মুগ্ধ পূর্ণ সময় শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি সংগীতচর্চা ও শরীরচর্চা। ২০১৩ সাল থেকে তিনি আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের বাংলাদেশ দলের মেন্টর ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। এত কিছুর মধ্যে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া সহজ ছিল না।

মুগ্ধ জানালেন, কিছু কৌশল অবলম্বন করে পড়াশোনা করতেন। শুরুতে প্রশ্নের ধরন বোঝার চেষ্টা করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে শেষ করেছেন। কোনো বিষয়ে দ্বিধা হলে অনলাইন ও বই—দুই জায়গাতেই উত্তর খুঁজেছেন। প্রিলিমিনারির পর লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে আরও মনোযোগী হন। উত্তর লেখার ধরনে আলাদা বৈশিষ্ট্য আনার চেষ্টা করেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, পরীক্ষকের চোখে উত্তরপত্রটি যেন আলাদা করে ধরা পড়ে। এই পরিকল্পিত প্রস্তুতিই তাঁকে সাফল্য এনে দেয়।

অনুপ্রেরণার উৎস

মুগ্ধর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা-বাবা। তিনি বলেন, ‘তাঁরা উৎসাহ না দিলে হয়তো বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া এবং ক্যাডার হওয়া কঠিন হতো।’ ভাই আগে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়ার পর মা-বাবার স্বপ্ন ছিল, তিনিও যেন জনসেবার এই গুরুদায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পান।

অনুজদের জন্য পরামর্শ

ধৈর্য ধরতে হবে। নিয়ম মেনে চলতে হবে। অধ্যবসায়ী হতে হবে। নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। মুগ্ধ মনে করেন, এসব গুণ শুধু বিসিএস নয়, জীবনের যেকোনো বড় অর্জনের ভিত্তি তৈরি করে। প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চান মুগ্ধ। তিনি বলেন, ‘এটি দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত