Ajker Patrika

কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে পড়ার স্বপ্নপূরণ ইরার

আনিসুল ইসলাম নাঈম
কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে পড়ার স্বপ্নপূরণ ইরার
ইরা রব্বানী।

ইরা রব্বানী ঢাকায় বেড়ে উঠেছেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে। এরপর উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান যুক্তরাজ্য সরকারের কমনওয়েলথ স্কলারশিপে। স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল ক্রাইম, জাস্টিস অ্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর প্রায় শেষের পথে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আজকের পত্রিকার আনিসুল ইসলাম নাঈম

ইরার পড়াশোনা শুরু ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজে। দীর্ঘ ১২ বছরের পড়াশোনার এই সময়ে চমৎকার কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকার সান্নিধ্য পেয়েছেন। যাঁদের দেখেই তিনি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

অপরাধবিজ্ঞানের পথে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বেছে নেন অপরাধবিজ্ঞান বিষয়। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—দুটোই সম্পন্ন করেন একই বিভাগ থেকে। তবে পড়াশোনা তাঁর কাছে কখনো শুধু ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রথম বর্ষ থেকে তিনি যুক্ত হয়ে পড়েন গবেষণা প্রকল্পে। কাজ করেছেন সিআইডি ও কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটের সঙ্গে। পাশাপাশি টেন মিনিট স্কুল ও শিখোর মতো অনলাইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষার্থীদের আইইএলটিএস পড়ানোর পাশাপাশি তিনি নিজেও উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেন। করোনা মহামারির সময়, স্নাতকোত্তর শেষ করার পরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভালো স্কলারশিপ পেতে হলে তাঁর সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। পুরোপুরি গবেষণানির্ভর প্রস্তুতি নিতে হবে। তাই তিনি করপোরেট ছেড়ে একাডেমিক রিসার্চে যুক্ত হন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসে।

যেভাবে কমনওয়েলথ স্কলারশিপে

ইরা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেন। তাঁর সুপারভাইজার ও লাইন ম্যানেজার—দুজনেই ছিলেন কমনওয়েলথ স্কলার। তাঁদের দেওয়া অনুপ্রেরণায় এই একই বৃত্তিতে আবেদনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রস্তুতির শুরুটা হয়েছিল আইইএলটিএস দিয়ে। এরপর একটি এক্সেলশিটে গুছিয়ে রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং, সাবজেক্ট র‍্যাঙ্কিং, অধ্যাপকদের তালিকা। কমনওয়েলথ স্কলারশিপে আলাদা কোনো ইন্টারভিউ পর্ব থাকে না। পুরো প্রক্রিয়াটাই নির্ভর করে জমা দেওয়া অ্যাপ্লিকেশন এবং প্রবন্ধের ওপর। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত এক-দুটি নমিনেশন স্লট থাকে এই বৃত্তির জন্য। এই নমিনেশন পাওয়ার প্রতিযোগিতা হয় কমনওয়েলথভুক্ত বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। আবেদন করতে হয় দুই ধাপে: একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যদিকে স্কলারশিপ কর্তৃপক্ষের কাছে। দুটোই সফল না হলে মেলে না চূড়ান্ত মনোনয়ন। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগে ছয় থেকে সাত মাস। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আবেদন করেন পরের বছরের সেপ্টেম্বর সেশনের জন্য। শুধু এডিনবরাতেই নয়, আবেদন করেছিলেন অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও। অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ থেকে অফার এলেও শেষমেশ বেছে নেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়কে। তা ছাড়া স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গ্লোবাল ক্রাইম, জাস্টিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ কোর্সটি তাঁর নজর কাড়ে। কারণ, এটি নিয়মিত ক্রিমিনোলজি ডিগ্রির বাইরে গিয়ে নতুন এক বিশেষজ্ঞতা গড়ার সুযোগ।

এডিনবরার ক্লাসরুমে

এ বছর এডিনবরা ল স্কুলের অধীনে ‘গ্লোবাল ক্রাইম, জাস্টিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ বিভাগে পড়াশোনা করছেন প্রায় ১৭ জন শিক্ষার্থী। সংগঠিত অপরাধ, মানব পাচার, সীমান্তবর্তী অপরাধ ও সংঘাত—এসব নিয়েই মূলত পাঠ্যক্রম। বাংলাদেশের লেকচার-নির্ভর শিক্ষাপদ্ধতির বিপরীতে এখানে চলে আলোচনাভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ। যেখানে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে, আগে থেকে পড়ে আসা রিডিং ম্যাটেরিয়াল নিয়ে চলে আলোচনা ও মতবিনিময়।

গবেষণায়ও যুক্ত এরা

পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যস্ত সময় কাটছে ইরার। একদিকে এডিনবরা ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস ইনিশিয়েটিভে লিগ্যাল রিসার্চার হিসেবে কাজ করছেন তিনি; যেখানে মূল ফোকাস ইউরোপীয় সীমান্তে অভিবাসীদের প্রতি আচরণ এবং জোরপূর্বক গুমের ঘটনাগুলোর আইনি ও মানবাধিকার দিক বিশ্লেষণ। অন্যদিকে এডিনবরা ল স্কুলের ‘কনটেম্পরারি চ্যালেঞ্জেস’ জার্নালে দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটি এডিটর-ইন-চিফ হিসেবে। এখানে আর্টিকেল বাছাই, পিয়ার রিভিউ, জার্নালের প্রচার ও অধ্যাপকদের সঙ্গে কাজ করে থাকেন।

আবেদনের খুঁটিনাটি

কমনওয়েলথ স্কলারশিপ হলো যুক্তরাজ্য সরকারের একটি পূর্ণ অর্থায়নে বৃত্তি কর্মসূচি। এটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স ও পিএইচডি করার সুযোগ দেয়। কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য দরকার হয় নিজ প্রতিষ্ঠানের নমিনেশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার। তাঁর পরামর্শ, শুধু ভালো ফলই যথেষ্ট নয়, এসেইতে সত্যিকারের মোটিভেশন ফুটিয়ে তোলাই আসল চ্যালেঞ্জ। অতিরঞ্জিত না করে বিশ্বাসযোগ্যভাবে নিজের গল্প বলাই এখানে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকায় থাকে আবেদনপত্র, ছয় থেকে সাতটি এসেই, আইইএলটিএস স্কোর, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার, একাডেমিক বা পেশাগত রেফারেন্স, গবেষণা পরিকল্পনাসংক্রান্ত এসেই, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট-সার্টিফিকেট এবং অভিজ্ঞতা সনদ। পুরো আবেদনপ্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হয়।

শেখাটাই বড় সুযোগ

স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা পান তিনি। ওয়ার্ক পারমিট, সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা পার্টটাইম কাজের অনুমতির সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া নিয়মিত আয়োজিত হয় নানা নেটওয়ার্কিং ইভেন্ট। যেখানে মাস্টারকার্ড ফাউন্ডেশন, শেভেনিং কিংবা কমনওয়েলথের মতো বিভিন্ন স্কলারশিপধারীরা একত্র হন। তাঁর মতে, এই আয়োজনগুলো অনভিজ্ঞ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সুযোগ।

যাঁরা আসতে চান

নতুনদের আত্মবিশ্বাসী থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কারণ, ৫৬টি দেশের প্রতিযোগিতায় ঘাবড়ে না গিয়ে নিজের ওপর ভরসা রাখাই প্রথম শর্ত। গ্রেড নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে বিষয়ের প্রতি প্যাশন ও আগ্রহকে প্রাধান্য দিতে হয়। কারণ, এই স্কলারশিপ শেখার জন্যই দেওয়া হয়, পুরোপুরি প্রস্তুত থাকার শর্তে নয়। তিনি বলেন, ‘জোরালো প্রস্তুতির প্রথমে আসে না, শুরু করলেই আসে। এসেই লেখায় সময় নিতে, বারবার লিখতে ও সংশোধন করতে হবে। আর স্কলারশিপ না পাওয়াকে জীবনের ব্যর্থতা না ভেবে গোটা প্রক্রিয়াটাকেই উপভোগ করতে হবে।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যতে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে চান তিনি, লক্ষ্য এখন পিএইচডি। এ ছাড়া দেশে ফিরে ক্রিমিনোলজি ও গ্লোবাল ক্রাইম নিয়ে গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্নও তাঁর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত