Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীকে টেনেহিঁচড়ে গাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল অভিবাসন পুলিশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৪৮
আইসিই এজেন্টদের হাতে আটক আলেয়া রহমান। ছবি: সংগৃহীত
আইসিই এজেন্টদের হাতে আটক আলেয়া রহমান। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট–আইসিই এজেন্টরা একটি গাড়ি থেকে টেনে–হিঁচড়ে বের করে নেওয়ার সময় চিৎকার করতে থাকা যে নারীর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তাঁকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি একজন প্রযুক্তিবিদ, এলজিবিটি ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী অধিকারকর্মী। নিজেকে তিনি পরিচয় দেন ‘ফ্রেন্ডলি নেবারহুড ডিনায়েবল অ্যাসেট’ হিসেবে।

আলিয়া রহমান নামে ওই নারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তিনি পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং দীর্ঘদিন ধরে কোডিং ও প্রযুক্তিখাতে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহারের নীতির পক্ষে কাজ করছেন এবং ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে যুক্ত। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন অধিকারকর্মী সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।

গত মঙ্গলবার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায়—ফেডারেল এজেন্টরা আলিয়া রহমানের গাড়ির জানালা ভেঙে তাঁকে জোর করে টেনে বের করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এক বিক্ষোভ চলাকালে আইসিইর গাড়ি চলাচলে বাধা দিয়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটে রেনে নিকোল গুড নামের এক নারীর গুলিতে নিহত হওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে, ওই এলাকার কাছেই।

ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়িচালক আলিয়া রহমান চিৎকার করে বলছিলেন, তিনি ‘শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন’ এবং ‘ডাক্তারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।’ এ সময় একাধিক মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্ট তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যায়।

লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ৪৩ বছর বয়সী আলিয়া রহমান মিনিয়াপোলিসে বসবাসরত ‘কমিউনিটি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।’ কর্মজীবনে ফুল স্ট্যাক ডেভেলপার ও ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজারসহ বিভিন্ন পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি একাধিক প্রযুক্তি-সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি কত দিন ধরে মিনিয়াপোলিসে বসবাস করছেন, তা স্পষ্ট নয়। তার সর্বশেষ প্রকাশ্যে পাওয়া ঠিকানা অনুযায়ী, তিনি আইওয়ার সিডার ফলসে থাকতেন। এক্সে নিজের প্রোফাইলে আলিয়া রহমান নিজেকে উল্লেখ করেছেন—‘ফ্রেন্ডলি নেবারহুড ডিনায়েবল অ্যাসেট’ হিসেবে। তিনি নিউ আমেরিকার ওপেন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের একজন ফেলো ছিলেন। সেখানে তাঁর প্রথম প্রকল্প ছিল পুলিশ কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা এবং সেগুলো কীভাবে নীতিমালার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে।

ওই ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে তাঁর বায়োতে বলা হয়েছে, ‘তার কাজের ভিত্তি তৈরি হয়েছে আইন প্রণয়ন, নির্বাচন ও কমিউনিটি সংগঠনে বর্ণ ও ফৌজদারি বিচারসংক্রান্ত আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের জন্য ১৫ বছরের সফটওয়্যার উন্নয়নকাজ এবং অতীতে একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে সরকারি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান উন্নয়নে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে।’

আলিয়া রহমান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরপরই তিনি পরিবারের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে চলে যান। টেক ফর সোশ্যাল জাস্টিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শৈশবে দেখা ‘বিপ্লবী পরিবেশ’ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, ‘আমি একটি দেশকে গড়ে উঠতে দেখেছি। আমি দেখেছি পোশাকশ্রমিকেরা—যাদের বেশির ভাগই নারী—রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে।’

ছয় বছর বয়সেই তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ‘নিশ্চিতভাবেই আলাদা।’ পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে ‘জেন্ডারকুইয়ার’ হিসেবে পরিচয় দেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সমকামিতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিজের যৌন পরিচয় নিয়ে সংকটে থাকায়, কলেজে পড়ার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। তিনি মনে করেছিলেন, ‘বাংলাদেশে থাকা সম্ভবত ঠিক হবে না।’

কলেজে তাঁর জুনিয়র বছর শুরু হওয়ার সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে ৯ / ১১ সন্ত্রাসী হামলা ঘটে। তিনি জানান, ওই হামলায় তাঁর দুই চাচাতো ভাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে নিহত হন। তিনি বলেন, ওই ঘটনা তাঁর জীবনে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’ ছিল, যা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক আন্দোলন এবং এখানে বর্ণবৈষম্যের অর্থ কী—তা গভীরভাবে বোঝার দিকে ঠেলে দেয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করে।

আলিয়া রহমান বলেন, ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে বসবাসের সময় তিনি দেখেছেন, ‘বাদামি ত্বকের মানুষদের কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়।’ একজন ট্রান্সজেন্ডার পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পর, তিনি বলেন, সংগঠনে যুক্ত হওয়া তাঁর জন্য ‘জরুরি হয়ে পড়ে।’

টেক ফর সোশ্যাল জাস্টিসের প্রোফাইলে বলা হয়, ‘কলেজ পাসের পর থেকে আলিয়া এলজিবিটি ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগঠনের সঙ্গে খণ্ডকালীন কাজ ও স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা পালন করে আসছেন।’ তিনি সেন্টার ফর কমিউনিটি চেঞ্জ, ইকুয়ালিটি ওহাইও (একটি এলজিবিটি অধিকার সংগঠন) এবং কোড ফর প্রগ্রেসসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুযায়ী, তিনি ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন ও ফিলিস্তিনপন্থী উদ্যোগেও সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি মিনেসোটাভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওয়েলস্টোনে ‘ডিরেক্টর অব মুভমেন্ট টেকনোলজি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত প্রগতিশীল বামপন্থী কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রশিক্ষণ দেয়।

তিনি দাবি করেন, ওয়েলস্টোনের ভাবমূর্তি তিনি বদলে দিয়েছেন—যেটি আগে ছিল ‘ভালো, সাদা মানুষ দ্বারা পরিচালিত একটি সংগঠন’—এখন তা ‘মূলত কুইয়ার, অভিবাসী এবং অধিকাংশই নারী-পরিচয়ধারী বা জেন্ডার নন-কনফর্মিং মানুষের সংগঠন।’ লিংকডইন অনুযায়ী, তিনি ইন্ডিয়ানার পারদু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স অব সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি একজন সনদপ্রাপ্ত সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর কাছে সিআইএসএসপি লাইসেন্স রয়েছে। স্নাতক শেষ করার পর, তিনি অ্যারিজোনার একটি নেটিভ আমেরিকান রিজার্ভেশনে অবস্থিত সরকারি হাই স্কুলে কয়েক বছর শিক্ষকতা করেন। পরে আবার তিনি অধিকারকর্মী কর্মকাণ্ডে ফিরে যান।

এই সব তথ্য সামনে আসে এমন এক ঘটনার পর, যেখানে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে যে, মঙ্গলবার তিনি একটি আবাসিক এলাকায় অভিবাসন প্রয়োগ কার্যক্রমে বাধা দিয়েছেন। ঘটনার সময় আইসিই এজেন্টদের বিক্ষোভকারীদের চিৎকারের মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। তারা রহমানকে গাড়ি চালিয়ে চলে যেতে বলছিলেন।

একপর্যায়ে এক এজেন্টকে গাড়ির যাত্রী পাশের জানালা ভাঙতে দেখা যায়, আরেকজন রহমানের পাশের দরজা খুলে দেন। আলিয়া রহমানকে গাড়ি থেকে টেনে বের করার সময় বিক্ষোভকারীরা চিৎকার করে বলেন, ‘থামুন’, ‘এটা খুবই নোংরা কাজ’ এবং ‘তোমরা শুধু মানুষকে আঘাত করো।’ এরপর তাকে দ্রুত হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, তা তখন পর্যন্ত স্পষ্ট ছিল না।

সাধারণ ডায়েরির নথি অনুযায়ী, এক দশকেরও বেশি সময় আগে রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকটি ছোটখাটো আইনি মামলা ছিল। তিনি ওহাইওতে পৃথক ঘটনায় অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ ও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। এ ছাড়া ইলিনয়ে তার বিরুদ্ধে বিমা ছাড়া গাড়ি চালানোর অভিযোগও ছিল।

ডিইউআই মামলায় তার বিরুদ্ধে অতিরিক্তভাবে খুব কাছ থেকে গাড়ি চালানো, স্টপ সাইন অমান্য, অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ ও বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য দ্য পোস্ট-এর পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি।

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আজকের রাশিফল: আপনার স্পষ্ট কথা কারও বুক ফুটা করে দিতে পারে, পকেট সামলান

ইরাক থেকে ইরানে ঢোকার চেষ্টা করছে সশস্ত্র কুর্দিরা, ঠেকাতে সাহায্য করছে তুরস্ক

ক্রিকেটারদের বিপিএল ‘বয়কট’, হচ্ছে না নোয়াখালী-চট্টগ্রামের ম্যাচ

ইরানে হত্যা চলছে না, আমাকে ‘আশ্বস্ত’ করা হয়েছে: ট্রাম্প

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নয়, ইরানে ‘দ্রুত ও চূড়ান্ত আঘাত’ হানতে চান ট্রাম্প

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত