Ajker Patrika

প্রেমহীন জীবন ইউক্রেনে, পরিণয় ও সন্তানের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে যুদ্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
কিয়েভের ৩৪ বছর বয়সী দারিয়া মনে করেন, সেনাসদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই দূরত্ব আর অনিশ্চয়তা। ছবি: বিবিসি
কিয়েভের ৩৪ বছর বয়সী দারিয়া মনে করেন, সেনাসদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই দূরত্ব আর অনিশ্চয়তা। ছবি: বিবিসি

কিয়েভের একটি বারে বসে ৩৪ বছর বয়সী দারিয়া মোবাইলে ডেটিং অ্যাপ খুলে কিছুক্ষণ স্ক্রল করলেন। তারপর ফোনটা নামিয়ে রাখলেন। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় সম্পর্কের মধ্যে থাকলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি একাই আছেন। দারিয়ার কথায়, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমি আর ঠিকভাবে কোনো ডেটে যাইনি।’

চার বছর ধরে চলা যুদ্ধ ইউক্রেনীয়দের জীবনের প্রায় সব সিদ্ধান্তই পাল্টে দিয়েছে। সম্পর্ক, বিয়ে কিংবা সন্তান নেওয়ার মতো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও এখন যুদ্ধের বাস্তবতায় আটকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের ভবিষ্যতের ওপর—ইউক্রেনে কমছে বিয়ে ও জন্মহার।

২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুতে দেশ ছেড়েছেন লাখো নারী। অনেকেই বিদেশে নতুন জীবন ও সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। একই সময়ে, বিপুলসংখ্যক পুরুষ হয় সেনাবাহিনীতে মোতায়েন, নয়তো দেশের বাইরে। ফলে যাঁরা দেশে রয়ে গেছেন, বিশেষ করে নারীদের জন্য পরিবার গড়ার সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে।

পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ শহরের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা জানান, শহরে পুরুষের সংখ্যা কমে গেছে। ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করেও তিনি কাউকে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ পুরুষই এখন বাইরে যেতে ভয় পান।’ তাঁর মতে, যাঁদের বয়স হয়েছে তাঁরা বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে যোগদান এড়াতে ঘরেই থাকছেন। আর যাঁরা সেনা, তাঁদের অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরা এসব মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়াও কঠিন হয়ে উঠছে।

দারিয়া বিষয়টিকে তিনভাবে দেখেন। প্রথমত, যাঁরা সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ভয়ে ঘর ছাড়তে পারেন না—তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া তাঁর কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, সেনাসদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই দূরত্ব আর অনিশ্চয়তা। ‘আপনি একটি সম্পর্ক গড়লেন, তারপর তিনি আবার ফ্রন্ট লাইনে চলে গেলেন’—বলেন দারিয়া।

তৃতীয়ত, ২৫ বছরের নিচের তরুণেরা চাইলে যেকোনো সময় দেশ ছেড়ে যেতে পারেন। এই তিন ধরনের কোনো সম্পর্কই তাঁকে টানে না।

ড্রোন অপারেটর দেনিস মনে করেন, সেনাদের প্রতিদিন মারা যাওয়ার বা আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন অবস্থায় ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া কঠিন। ছবি: সংগৃহীত
ড্রোন অপারেটর দেনিস মনে করেন, সেনাদের প্রতিদিন মারা যাওয়ার বা আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন অবস্থায় ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া কঠিন। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি এলাকায় দায়িত্ব পালনরত অনেক সেনাও সম্পর্কের কথা ভাবছেন না। অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিতে তাঁরা নিজেদের অক্ষম মনে করছেন।

খারকিভ অঞ্চলে কর্মরত সেনা রুসলান বলেন, ‘আমি বছরে এক-দুবার দেখা করা, ফুল পাঠানো বা ফোন করা ছাড়া আর কিই বা দিতে পারি?’

পূর্ব ইউক্রেন থেকে পাঠানো ভয়েস মেসেজে ৩১ বছর বয়সী ড্রোন অপারেটর দেনিস বলেন, ‘প্রতিদিন মারা যাওয়ার বা আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন অবস্থায় ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া কঠিন।’

এর প্রভাব পড়ছে দেশের জনসংখ্যায়ও। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালে যেখানে বিয়ে হয়েছিল ২ লাখ ২৩ হাজার, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে দেড় লাখে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন ছেড়েছেন ৬ মিলিয়নের বেশি মানুষ। যুদ্ধ, মৃত্যু, অভিবাসন ও কম জন্মহারের ফলে দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত কমছে। এতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংকুচিত হচ্ছে, ধীর হয়ে আসছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

ইউক্রেনের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের জনসংখ্যাবিদ ওলেক্সান্দ্র হ্লাদুন এ পরিস্থিতিকে আখ্যা দেন ‘যুদ্ধের সামাজিক বিপর্যয়’ হিসেবে।

১৯৯২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইউক্রেনের জনসংখ্যা ৫ কোটি ২০ লাখ থেকে কমে ৪ কোটি ১০ লাখে নেমে আসে। যুদ্ধ চলাকালে জন্মহার আরও নেমে গেছে। বর্তমানে প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা ০.৯—যা জনসংখ্যা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় ২.১-এর অনেক নিচে। তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই হার ১.৩৮।

হ্লাদুন বলেন, ‘যুদ্ধের সময় সন্তান জন্ম কমে যাওয়া স্বাভাবিক। সাধারণত যুদ্ধ শেষে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এই সময়সীমা পাঁচ বছরের বেশি স্থায়ী হয় না। আমাদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ চার বছর পেরিয়ে গেছে। সময় যত বাড়ছে, সে ক্ষতিপূরণের সুযোগ তত কমছে।’

ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে ২০৫১ সালে ইউক্রেনের জনসংখ্যা নেমে আসতে পারে ২ কোটি ৫২ লাখে, যা ১৯৯২ সালের অর্ধেকেরও কম।

লভিভের উপকণ্ঠে একটি ফার্টিলিটি সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩৩ বছর বয়সী পুলিশ কর্মকর্তা ও সামরিক প্রশিক্ষক ওলেনা। সন্তান ধারণে জটিলতার কারণে তিনি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন। ভবিষ্যতে আইভিএফ নেওয়ার কথা ভাবছেন, তবে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই।

লভিভের উপকণ্ঠে একটি ফার্টিলিটি সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩৩ বছর বয়সী পুলিশ কর্মকর্তা ও সামরিক প্রশিক্ষক ওলেনা। সন্তান ধারণে জটিলতার কারণে তিনি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে চান। ছবি: বিবিসি
লভিভের উপকণ্ঠে একটি ফার্টিলিটি সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩৩ বছর বয়সী পুলিশ কর্মকর্তা ও সামরিক প্রশিক্ষক ওলেনা। সন্তান ধারণে জটিলতার কারণে তিনি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে চান। ছবি: বিবিসি

যুদ্ধের আগের জীবনকে তিনি মনে করেন ‘আশায় ভরা’। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সব পরিকল্পনা থেমে যায়। তিনি বলেন, ‘ঘর বানানো, সন্তান নেওয়া—সবকিছুই তখন অর্থহীন মনে হচ্ছিল।’

এখন সন্তান নেওয়াকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় দায়িত্ব হিসেবেও দেখেন। ‘আমি এটা করছি নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং ইউক্রেনের জন্য’—বলেন ওলেনা।

তাঁর চিকিৎসক লিউবভ মিখাইলিশিন বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব ও যুদ্ধের ট্রমা ভবিষ্যতে আরও বড় উর্বর সংকট সৃষ্টি করতে পারে। শিশুর যত্ন ও আবাসন সহজ করতে সরকারের কিছু নীতি নিয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়নের অভাবে সেগুলোর বাস্তবায়ন সীমিত।’

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে স্বাধীনতার পর থেকে ইউক্রেনের জনসংখ্যা ইতিমধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখ কমেছে। বিদেশে থাকা ৬৫ লাখ মানুষের বড় অংশ ফিরলে সংখ্যায় দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে; কিন্তু যুদ্ধ শেষে কতজন ফিরবেন, তা অনিশ্চিত।

দারিয়ার কথায়, ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখন খুবই ভঙ্গুর মনে হয়। এই অনিশ্চয়তা কষ্ট দেয়; কিন্তু এটিই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমি হয়তো একা থাকব, কিন্তু নিজের ইচ্ছায় নয়। যুদ্ধই সবকিছু বদলে দিয়েছে। এটার সঙ্গে বেঁচে থাকাটাও একধরনের লড়াই।’

বিবিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নির্বাচনের পর কী করবেন ড. ইউনূস, জানাল প্রেস উইং

‘নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না’, নানামুখী চাপে হতাশ সুশীলা কারকি

বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যা দিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

৪০০ টাকায় ২০ এমবিপিএস ইন্টারনেট দেবে বিটিসিএল, সাশ্রয়ী আরও ৮ প্যাকেজ ঘোষণা

নিজের চরকায় তেল দাও—মামদানিকে ভারতের তিরস্কার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত