Ajker Patrika

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ-হত্যা: রান্নার সময় পাশের বাসা থেকে চিৎকার শুনতে পান মা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ১৬: ২১
পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ-হত্যা: রান্নার সময় পাশের বাসা থেকে চিৎকার শুনতে পান মা
ফাইল ছবি

‘সকাল অনুমান ১০টার দিকে রান্না করার সময় সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বাসা থেকে বাচ্চার চিৎকার ভেসে আসে।’ পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জবানবন্দিতে এ কথা বলেন মা।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় অভিযুক্ত সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন শিশুটির মা।

সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরকারী শিশুর বাবার জবানবন্দি শুরু হয়। তাঁর সাক্ষ্য শেষে মা সাক্ষ্য দেন। জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন বিচারক মাসরুর সালেকীন।

সাক্ষ্য গ্রহণের আগে অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্নাকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। কাঠগড়ার সামনের দিকে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন স্বপ্না। অন্যদিকে সোহেল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেটসহ কাঠগড়ার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

জবানবন্দিতে শিশুটির মা ঘটনার দিনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘রোজকার মতো গত ১৯ মে সকালে তার বাবা অফিসে যান। আমি রান্না করছিলাম। রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আমার বড় মেয়েকে বললাম তার চাচা মোস্তফার বাসায় যাইতে। ১০টার দিকে ছোট মেয়ে বলে—আমিও যাই। আমি তাকে বললাম তুমি যাবা না। কিন্তু দুজনেই রেডি হয়। কিন্তু বড় মেয়ে চাচার বাসায় চলে যায় একা। আমার ছোট সন্তানকে নেয় না। আমি বুঝতে পারি নাই সে গেল কি না। আমি রান্না করতে থাকি।’

জবানবন্দিতে শিশুটির মা বলেন, ‘একটু পরেই পাশের বাসা অর্থাৎ সোহেলদের বাসা থেকে বাচ্চার চিৎকার শুনতে পাই। মনে করেছিলাম, ওই বাসায় একটি ছোট বাচ্চা আছে, সে চিৎকার করছে। কিন্তু তারা যে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেছে সেটা জানতাম না। কিছুক্ষণ পরে দেখি আমাদের বাসার দরজা খোলা।’

তিনি আরও বলেন, ‘দরজা খোলা দেখার পর চিন্তা হয়। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি কখন মেয়েরা ফিরে আসে। কিছুক্ষণ পরে বড় মেয়ে ফিরে আসে। তাকে জিজ্ঞেস করি তার ছোট বোন কোথায়? সে বলে, সে চাচার বাসায় যায় নাই। নিচেও নেই। আমি নিচে গেলাম। আমার ছোট মেয়ের একটি বিড়াল ছিল। অনেক সময় বিড়াল নিয়ে সে নিচে নামে। কিন্তু বাসার নিচে গিয়েও তাকে পাওয়া যায় নাই। নিচে একটা অফিস রুম আছে। সেখানে ঢুকেও দেখি নাই। দোতলায় ব্যাচেলার বাসা ভাড়া দেওয়া। দরজায় কড়া নাড়লে তারা দরজা খুলে দেয়। সেখানেও পাওয়া যায় না। পরে আমি তিন তলায় আসি। তিনতলায় আমাদের বাসা ও সোহেলদের বাসা।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পাশের ফ্লাটে অর্থাৎ সোহেলদের বাসায় দরজায় কড়া নাড়ি। দরজা কেউ খোলে না। দরজার বাইরে দেখি আমার মেয়ের একটি জুতা পড়ে আছে। তখন মনে হলো, চিৎকারটা কি আমার মেয়ের ছিল? এর মধ্যে চারতলা থেকে মনির এবং তাঁর স্ত্রী আসেন। আসমা নামে একজন মহিলা আসেন। সবাই মিলে দরজা ধাক্কাই। কিন্তু দরজা খুলে না। মনির নিচে গিয়ে লোকজন নিয়ে আসেন। ১০-১২ জন লোক আসে। এরই মধ্যে আমি আমার স্বামীকে ফোন দেই। ২০-২৫ মিনিট পর আমার স্বামী আসেন। অনেক ধাক্কাধাক্কি করার পরেও দরজা না খুললে দরজার লক ভাঙা হয়। তারপর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে টয়লেটে রক্ত দেখি। সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে দেখি হাঁটাহাঁটি করছে। এসব দৃশ্য রাজু নামে একটা ছেলে ভিডিও করে। সোহেলদের থাকার রুমে ভেতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের দেহ খাটের নিচে। মাথা একটি বালতির মধ্যে। এসব দেখে আমার জ্ঞান ছিল না। পরে পুলিশ আসে। পুলিশ আমার মেয়ের পরনের জামা-কাপড়, জুতা এবং অন্যান্য জিনিস জব্দ করে। আমি ওই জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করি।’

জবানবন্দি শেষে শিশুটির মাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কলিমুল্লাহ। জেরার একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘দরজার বাইরে দাঁড়াইয়া সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে বলছিলাম, বোন দরজাটা খুইলা দে। ও দরজাটা খোলে নাই।’ জেরার শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘পরে শুনতে পারি সোহেল আমার মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা করে গ্রিল কাইটা পালাইছে।’

মায়ের সাক্ষ্য নেওয়া শেষ হলে, ভুক্তভোগী শিশুর বড় বোনের সাক্ষ্য ক্যামেরা ট্রায়ালে গ্রহণ করা হয়। সে শিশু হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সাক্ষ্য ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে নেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এই মামলা বিচারের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করতে সহযোগিতা করেন। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কাজ শুরু হয়।

গত ২৪ মে বিকেলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। পরে মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠান। ট্রাইবুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে সোমবার অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। সোমবার অভিযোগ গঠনের পর আজ মঙ্গলবার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত