Ajker Patrika

কেরানীগঞ্জে কারখানায় আগুন: মূল ফটক বন্ধ থাকায় বের হতে পারেননি অনেকে

  • উদ্ধার করা ছয়জনের লাশের পাঁচটির পরিচয় শনাক্ত হয়নি।
  • শনিবার আগুন লাগার সময় কারখানায় ১৮-২০ শ্রমিক ছিলেন।
  • দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই প্রায় সাত বছর চলছিল কারখানাটি।
  • মালিকসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে মামলা, একজন গ্রেপ্তার।
শাহরিয়ার হাসান, ঢাকা 
কেরানীগঞ্জে কারখানায় আগুন: মূল ফটক বন্ধ থাকায় বের হতে পারেননি অনেকে
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পোড়া ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কারখানার প্রত্যেকটি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

কাজের সময় প্রায়ই ছোটখাটো বিস্ফোরণ ঘটত ঢাকার কেরানীগঞ্জের গ্যাস লাইটার কারখানাটিতে। কখনো কখনো আগুন ধরলেও কিছুক্ষণ পর নিভে যেত। প্রায় সাত বছর এমন ঝুঁকি নিয়েই চলছিল ইএসএআর গ্যাসপ্রো লাইটার নামের কারখানাটি। কিন্তু গত শনিবার আগুন হয় ভয়াবহ। তালাবদ্ধ ফটক পার হতে না পেরে কারখানার ভেতরেই আটকা পড়েন বেশির ভাগ শ্রমিক।

কেরানীগঞ্জের কদমতলীর ওই গ্যাস লাইটার কারখানার অগ্নিকাণ্ড নিয়ে আলাপকালে গতকাল রোববার এসব তথ্য দেন এলাকাবাসী, কারখানার বেঁচে যাওয়া শ্রমিক ও তাঁদের স্বজনেরা। শনিবার দুপুরের ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান অন্তত ছয় শ্রমিক। আগুনে পুড়ে লাশ এতটাই বিকৃত হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মালিকপক্ষের গাফিলতি, নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ এবং তালাবদ্ধ গেটই এই মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণ।

লাইটার কারখানায় আগুনে ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় কারখানা- মালিকসহ তিনজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-সাতজনকে আসামি করে গতকাল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও স্থানীয় বিএনপির নেতা ইমান উল্লাহ মাস্তানকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

আগুন লাগার পরপরই কোনোমতে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা মোছাব্বির নামের এক শ্রমিক বলেন, ওই কারখানায় জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের অনুকরণে ‘নিউ সানলাইট’সহ বিভিন্ন লোকাল গ্যাস লাইটার তৈরি হতো। কারখানায় মাঝেমধ্যেই ছোট ছোট বিস্ফোরণ হতো, তা থেকে আগুন ধরত। এমন বিস্ফোরণ ও আগুনে তাঁরা সবাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তাই শনিবারও আগুন লাগলে শুরুতে কেউ ভয় পায়নি। কিন্তু আগুন হঠাৎ তীব্র হয়ে যায়। মোছাব্বির জানান, আগুন লাগার পরই তিনি কারখানার মূল ফটকের পাশের বড় প্রাচীর টপকে বেরিয়ে যান। যাঁরা মূল ফটক দিয়ে বের হতে চেয়েছিলেন, তাঁরা তালা থাকায় আটকে যান। যাঁরা দেয়াল টপকাতে পারেননি, বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা, তাঁরা বের হতে পারেননি।

সরেজমিনে জানা যায়, শনিবার দুপুরে আগুন লাগার সময় কারখানাটিতে ১৮-২০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। মূল ফটকের পাশে একটি ছোট কক্ষে গ্যাস লাইটারের ক্যাপ লাগানোর কাজের সময় একাধিক ছোট ছোট বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন দ্রুত ছড়াতে থাকলে কয়েকজন শ্রমিক ফটকের কাছে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখেন। পরে কেউ কেউ ৮-৯ ফুট উঁচু ফটক টপকে প্রাণ বাঁচান। আগুন ফটকের সামনে ছড়িয়ে পড়লে কেউ কেউ বের হওয়ার সুযোগ পাননি।

কারখানার আরেক শ্রমিক ছাব্বির হোসেন বলেন, শুরুতে কেউ বুঝতে পারেননি পরিস্থিতি এত খারাপ হবে। কারখানার লোকজনও বলছিল, আগুন নিভে যাবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলে যাঁরা ফটকের কাছাকাছি ছিলেন, শুধু তাঁরা বের হতে পেরেছেন। নারী শ্রমিকদের অনেকে দেয়াল টপকাতে না পেরে ভেতরে আটকা পড়েন।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, শনিবার বেলা সোয়া ১টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। রাত পর্যন্ত উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায় আরও দুজনকে উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত তিনজন নারী বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। অন্যদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, উদ্ধার হওয়া লাশগুলো এতটাই দগ্ধ হয়েছে যে, কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে মিম আক্তার পাখি (১৮) নামের একজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তাঁর বাড়ি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচায়।

নিহত মিমের বাবা দেলোয়ার হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আগুন লাগার পর তাঁর মেয়ে বের হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুপারভাইজার নাকি বলেছিলেন, আগুন কিছু না, নিভে যাবে। শ্রমিকদের থাকতে বলেছিলেন। সে জন্যই মিম বের হতে পারেননি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইএসএআর গ্যাসপ্রো লাইটার কারখানার মালিক আহনাফ আকিফ আকরাম। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচায় ভাগানগর ১৩১০ নম্বর আবাসিক এলাকায় এই কারখানাটি ২০১৮-১৯ সালে চালু হয়।

ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩০ জুন কারখানাটি পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস পরিদর্শক তানভীর আলম। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দাবি, কারখানাটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কয়েকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা রেঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. নজমুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, কারখানাটিকে কয়েক দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তাঁরা আমলে নেননি। দুর্ঘটনার পর থেকে মালিক, ম্যানেজার কিংবা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালককে (অপারেশনস ও মেইনটেন্যান্স) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়, গতকাল দুপুর পর্যন্ত তদন্ত কমিটির কেউ সরেজমিনে পরিদর্শনে যাননি। সেখানে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সিআইডির সদস্যরা কাজ করছেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ওই কারখানায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে।

কারখানায় আগুন ও ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় গতকাল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন ওই থানার উপপরিদর্শক জুয়েল রানা। মামলায় নামোল্লেখ করা তিনজন হলেন কারখানার মালিক মো. আকরাম উল্লাহ আকরাম, তাঁর ছেলে আহনাফ আকিফ আকরাম এবং ইমান উল্লাহ মাস্তান (৫৫)। মামলা করার পর পুলিশ স্থানীয় বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচিত ইমান উল্লাহ মাস্তানকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মালিকপক্ষ অবৈধভাবে ৮ থেকে ১০ বছর ধরে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে ৫০-৬০ জন শ্রমিক দিয়ে কারখানাটি চালাচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েকবার কারখানাটি বন্ধ ও সিলগালা করলেও আসামিরা আবার গোপনে কার্যক্রম চালু রাখেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ইলন মাস্কের হাত থেকে বাঁচাতে’ কিশোরী কন্যাকে হত্যা করলেন মা

অবশেষে অনশনরত স্বামীর হাত ধরে ঘরে ফিরলেন সেই স্ত্রী

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না

চৈত্রসংক্রান্তিতে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সাধারণ ছুটি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত