Ajker Patrika

অনেক কিছুই নির্ভর করছে সেনাবাহিনীর ওপর

কার্লোস এদুয়ার্দো পিনা
দেলসি রদ্রিগেজের প্রশাসনের দেশশাসনে সক্ষম হতে সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন। ছবি: এএফপি
দেলসি রদ্রিগেজের প্রশাসনের দেশশাসনে সক্ষম হতে সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন। ছবি: এএফপি

প্রায় ২৭ বছর ধরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ ও নিকোলা মাদুরো পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের স্থানীয় বিকল্প খোঁজার চেষ্টা বাদ দিয়ে পদ্ধতিগতভাবেই কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন। আর এ পুরো সময়ে তাঁদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করে এসেছে দেশটির সামরিক বাহিনী, যার আনুষ্ঠানিক নাম বলিভারিয়ান জাতীয় সশস্ত্র বাহিনী (এফএএনবি)।

সশস্ত্র বাহিনী ভেনেজুয়েলার সরকারকে আগের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলতে এবং সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালাতে সহায়তা করেছে। বিনিময়ে পর্যায়ক্রমে শাভেজ এবং মাদুরোর সরকার দেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীকে আরও বেশি ক্ষমতা দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের মন্ত্রী, গভর্নর ইত্যাদি পদ ছাড়াও কূটনীতিক, মেয়র বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় দায়িত্বে বসানো হয়েছিল।

মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা ঝটিকা অভিযান চালিয়ে নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলায় রাষ্ট্রের রক্ষক হিসেবে সেনাবাহিনীর সেই ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাদুরোকে দেশের বৃহত্তম সামরিক কমপ্লেক্স ফুয়ের্তে টিউনা থেকে অপহরণ করা হয়ে। মার্কিন বাহিনীর এ সফল অভিযান এফএএনবির সামরিক প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতিগুলোকে সামনে তুলে এনেছে।

ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী এক জটিল দোটানার মুখোমুখি। পরিবর্তন আনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের মধ্যে হওয়া চুক্তির গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করা আর নয়তো নতুন মার্কিন হামলা এবং নিজেদের ক্ষমতা ও মর্যাদার আরও ক্ষতি করার ঝুঁকি নেওয়া—এ দুটির একটি বেছে নিতে হবে তাদের।

বিগত বছরগুলোতে ভেনেজুয়েলায় আইন প্রয়োগের কাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী এফএএনবির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই অঙ্গরাজ্য এবং স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়েছে তারা। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাইয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে এই পরিস্থিতি আরও জোরদার হয়েছে। তখন ভোট গণনায় ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগের কারণে মাদুরোর সরকার এক নজিরবিহীন বৈধতা সংকটের মুখে পড়ে।

ভেনেজুয়েলা দিনে দিনে একটি পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল, যেখানে বিরোধীদের ওপর ব্যাপক নজরদারি এক নতুন স্তরে উঠে যায়। তখন থেকে সরকার টিকে থাকার জন্য এফএএনবির ওপর নির্ভর করে আসছিল। ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলার (পিএসইউভি) সামরিক ধরনের অঙ্গ, আধাসামরিক গোষ্ঠী (যাদের ‘কালেকটিভোস’ও বলা হয়) এবং রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় শক্তি এবং সামরিক পুলিশের সমন্বয়ে এটা করা হয়ে আসছিল। ভেনেজুয়েলার সরকার এই সম্পূর্ণ নিরাপত্তাকাঠামোকে ‘নাগরিক-সামরিক পুলিশ জোট’ আখ্যা দিয়েছিল।

সশস্ত্র বাহিনীর এই ক্ষমতার অর্থ হচ্ছে, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বা বলপ্রয়োগ যেভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন ভেনেজুয়েলার যেকোনো সরকারকে দেশ শাসনে সক্ষম হওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন হবে।

দেলসি রদ্রিগেজের প্রশাসনের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে না। মাদুরো-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ট্রাম্পের সম্মতি থাকলেও ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের জন্য দেশের সামরিক বাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন হবে। একমাত্র তাহলেই দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়া এড়ানো যাবে।

প্রধানত ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে রদ্রিগেজের গ্রহণযোগ্যতার কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পরিবর্তে তাঁর ওপর ভরসা করেছেন। কিন্তু মাদুরোর অপহরণ একই সঙ্গে এফএএনবির দুর্বলতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। শক্তিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যোজন যোজন দূরে ভেনেজুয়েলার বাহিনী। দুই দেশের মধ্যে শক্তির ফারাক দূর করা কার্যত অসম্ভব। সামরিক ক্ষমতার এই গুরুতর অসামঞ্জস্যতার কারণে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে, যদিও ট্রাম্প বলেছেন আপাতত তাঁর এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।

নতুন মার্কিন হামলার হুমকিই এফএএনবির আপসের পথে হাঁটতে রাজি হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। একই কারণে তারা সম্ভবত রদ্রিগেজের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হতে রাজি হয়ে যাবে। তাহলে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে? তারা যতটা সম্ভব দেশের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্ভবত সেনা নেতৃত্বকে কয়েকটি বিষয় মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে থাকবে এমন কিছু বিষয়, যা একেবারে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে অকল্পনীয় ছিল। প্রথমত, সামরিক নেতাদের মাদক পাচারের সঙ্গে সম্পর্কিত সব অভিযোগ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে হবে। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে এ বিষয়টিকেই যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

দ্বিতীয়ত, সামরিক নেতৃত্বকে ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন তেল চুক্তি মেনে নিতে হবে। খুব সম্ভবত এসব চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার খনিজ তেলের মজুত এবং উৎপাদনের ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হবে।

তৃতীয়ত, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে এফএএনবিকে নাগরিকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক কার্যকলাপ হ্রাস করতে হবে। বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়াবে বর্তমান পুলিশি রাষ্ট্রে (তথাকথিত ‘সিভিক-মিলিটারি-পুলিশ ইউনিয়ন’) তাদের ভূমিকা হ্রাস করা।

শেষত, ভেনেজুয়েলার সামরিক নেতৃত্বকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। কারণ রদ্রিগেজই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার যোগাযোগের একমাত্র এবং সম্ভবত শেষ সরাসরি মাধ্যম। এর জন্য সামরিক বাহিনী দেশবাসীকে এ যুক্তি দিতে পারে যে, মাদুরোর বিদায়ের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মধ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ ছাড়া উপায় নেই।

মৌলিকভাবে, এই পরিবর্তনগুলোর অর্থ হবে—সামরিক বাহিনী দেলসি রদ্রিগেজ এবং ট্রাম্পের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিকে সমর্থন করবে এবং মাদুরো-পরবর্তী যুগে স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিয়ামকের ভূমিকা পালন করবে। এটি বোঝাপড়ার এমন এক কৌশল যাতে যুক্তরাষ্ট্রও অভ্যস্ত। ওয়াশিংটন বেশ কয়েক দশক ধরেই মিসর, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড এবং আরও অনেক দেশে সামরিক নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করে আসছে।

ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর জন্য এই মুহূর্তে বিকল্প খুব কম। ট্রাম্প এবং রদ্রিগেজের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কাজ করতে ব্যর্থ হলে নতুন মার্কিন হামলা ঘনিয়ে আসতে পারে। আর তাই যদি ঘটে, তাহলে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা ধসে পড়বে। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতাও আরও বেড়ে যাবে।

(আল জাজিরা অনলাইনে প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের জন্য মার্কিন ভিসা স্থগিত হচ্ছে

ইউক্রেনের ২ লাখ সেনা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়েছেন—নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর তথ্য

আজকের রাশিফল: আপনার স্পষ্ট কথা কারও বুক ফুটা করে দিতে পারে, পকেট সামলান

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা স্থগিতে ৭৫ দেশের তালিকায় পাকিস্তান, নেই ভারত

জামায়াত আমির বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন করবেন না: মার্থা দাশ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত