Ajker Patrika

আমদানি-রপ্তানি খাত: দফায় দফায় মাশুল বৃদ্ধি, চাপে ব্যবসা

  • ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে চার্জ বেড়েছে ৩৮-৭০%।
  • আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনে ভাড়া বেড়েছে ২০-৩০%।
  • লাইটারেজ জাহাজে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া বেড়েছে ১০%।
 আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম
আমদানি-রপ্তানি খাত: দফায় দফায় মাশুল বৃদ্ধি, চাপে ব্যবসা
ফাইল ছবি

দেশের আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট প্রায় সব খাতে গত কয়েক মাসে দফায় দফায় মাশুল ও ভাড়া বৃদ্ধির ফলে চাপে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বেসরকারি কনটেইনার ডিপো (আইসিডি), চট্টগ্রাম বন্দর, শিপিং লাইন, পরিবহন ও লাইটারেজ—প্রায় প্রতিটি খাতেই উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে ভোক্তার ওপর, যার ফলে বাড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একের পর এক মাশুল বৃদ্ধির ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এর প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অফডকে দুই দফায় চার্জ বৃদ্ধি: গত সাত মাসে চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে (অফডক) দুই দফায় চার্জ বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ আরও ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানায়। সংস্থাটির ভাষ্য, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন ট্যারিফ কার্যকর করে ৩০ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ বাড়ানো হয়।

বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘গ্রাহকদের অবহিত করে ১৯ এপ্রিল থেকে নতুন হার কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয়।’

শিপিং লাইনে ভাড়া বৃদ্ধি: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনে ভাড়া বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার রুটে এ বৃদ্ধি বেশি।

আগে যেখানে ২০ ফুটের একটি কনটেইনার পাঠাতে খরচ হতো ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলারে।

একাধিক শিপিং এজেন্ট জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইনস্যুরেন্স ব্যয়, বাংকারিং সারচার্জ এবং পরিচালন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৭০০ ডলার সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।

এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কনটেইনার বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে নির্দেশনা এসেছে। এতে প্রতি সপ্তাহে ৮০০ থেকে ১ হাজার টিইইউস রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।’

পরিবহন ভাড়ায় ঊর্ধ্বগতি: বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে একটি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানে পণ্য আনতে খরচ হতো ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায়; যা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-প্রাইম মুভার মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, ‘জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে।’

লাইটারেজ জাহাজেও বাড়তি চাপ: লাইটারেজ জাহাজে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রতি টন পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০৫ টাকা, যা আগে ছিল ৫৫০ টাকা।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানান, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ৪১ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধি: ব্যবসায়ীদের আপত্তি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে সব সেবা খাতে গড়ে ৪১ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধি কার্যকর করে। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিটি ২০ ফুট কনটেইনারে গড়ে প্রায় ৩৯ ডলার (প্রায় ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা) অতিরিক্ত মাশুল যোগ হয়েছে।

এই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ শিপিং লাইন বহন করলেও শেষ পর্যন্ত তা আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের ওপর চাপানো হচ্ছে, যা পণ্যের দামে যুক্ত হচ্ছে।

রপ্তানি খাতে বাড়ছে চাপ: ব্যবসায়ীদের মতে, মাশুল বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে উৎপাদনমুখী শিল্প ও তৈরি পোশাক খাতে। কারণ কাঁচামাল আমদানির সময় এবং রপ্তানির সময়—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। কারণ একই পণ্যে দুই দফায় বাড়তি মাশুল দিতে হচ্ছে।’

বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘বন্দর ও ডিপোর ট্যারিফ বৃদ্ধির চাপ সামাল দেওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক শিপিং ভাড়া বেড়েছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

একই সংগঠনের পরিচালক ও ক্লিপটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী মহি উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মাশুল ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ, সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিং—সব মিলিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট প্রতিটি ধাপে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শেষ পর্যন্ত এর পুরো চাপ গিয়ে পড়বে ভোক্তার ওপর। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঘরে ঢুকে বৃদ্ধাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ, ৮ দিন পরে মামলা

এপস্টেইন দ্বীপের রহস্যময় ‘মসজিদ’: পবিত্র কাবার গিলাফ ও কিসওয়া চুরির তথ্য ফাঁস

নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কায় সবকিছুতে আপস করেছি: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বোনের ক্যারিয়ার বাঁচাতে তদবির করেছেন প্রিয়াঙ্কা, তাঁর পরামর্শেই বিজেপিতে রাঘব!

আজকের রাশিফল: প্রাক্তনের ফোনে সংসারে সুনামি নামবে, আয়নায় নিজেকে ভেংচি কাটলে ইগো কমবে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত