Ajker Patrika

সুয়েজে গতি, হরমুজ-বিকল্প রুটে ঝুঁকি: পণ্যপথে স্বস্তি, জ্বালানিতে নতুন শঙ্কা

  • হরমুজে জাহাজ চলাচল নেমেছে তলানিতে।
  • বিকল্প জ্বালানি রুটও পড়েছে ঝুঁকিতে।
  • তেল পরিবহনে ভাড়া রেকর্ড উচ্চতায়।
  • বাংলাদেশে বাড়তে পারে জ্বালানি আমদানি ব্যয়।
  • ব্রেন্টের দাম উঠেছে ১০৮ ডলারে।
  • সুয়েজে ফিরছে বড় শিপিং কোম্পানি।
নাদিম নেওয়াজ, ঢাকা
সুয়েজে গতি, হরমুজ-বিকল্প রুটে ঝুঁকি: পণ্যপথে স্বস্তি, জ্বালানিতে নতুন শঙ্কা
প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব কিংবা সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন—কোনো রুট এখন আর নিরাপদ নেই। আগে সংকট শুধু হরমুজকেন্দ্রিক ছিল, এখন বিকল্প রুটেও পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার চাপ আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববাসীর জন্য এই অস্থিরতার মধ্যেও একটি স্বস্তির বার্তা আছে। এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের প্রধান রুট সুয়েজ খাল দিয়ে জ্বালানির বাইরে অন্যান্য পণ্য আমদানি-রপ্তানি জোরদারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এখন এই খাল দিয়ে তাদের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বাড়াতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ডেনমার্কের মায়ের্স্ক জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েডের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত চারটি কনটেইনার সেবা সুয়েজ খাল দিয়ে চালুর ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল সোমবার মায়ের্স্ক জানায়, তাদের এই৫, এই১১, এই১২, ও এমই২ সেবা এখন আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাওয়ার পরিবর্তে সুয়েজ খাল হয়ে চলবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, এর ফলে এশিয়া-ইউরোপ রুটে পণ্য পরিবহনের স্বাভাবিকতা ফিরবে; একই সঙ্গে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় সাড়ে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সংঘাত বন্ধের কোনো লক্ষণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে। এত দিন সীমিত পরিসরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চললেও নতুন উত্তেজনায় গত সপ্তাহে তা তলানিতে নেমেছে। হরমুজের বিকল্প সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর তেল সরবরাহ বন্ধ হয়েছে। আরেক বিকল্প বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার আশঙ্কায় তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যে নেমেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথ সংকুচিত হয়েছে। এতে তেলবাহী জাহাজের ভাড়া রেকর্ড উচ্চতায় উঠে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

গত সপ্তাহের শেষ দিনে হরমুজ নৌপথ দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চারটি পণ্যবাহী জাহাজ বের হয়েছে এবং ১০টি জাহাজ প্রবেশ করেছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। তবে হরমুজের গুরুত্ব মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে এই সরু নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হতো, যা সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। বিশেষ করে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজি রপ্তানির বেশির ভাগ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে প্রভাব শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন—সব খাতে ব্যয় আরও বাড়াবে। অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা একই সঙ্গে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

এরই মধ্যে বাজারে এর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। গতকাল অপরিশোধিত তেলের প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্টের দাম ১০৮ ডলারের কাছাকাছি উঠে গেছে। একই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শ্রেণির তেলবাহী জাহাজের ভাড়াও রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। সংঘাতের কারণে জাহাজগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে চলতে হলে যাত্রাপথ দীর্ঘ হবে। এর সঙ্গে বাড়বে জ্বালানি, বিমা ও নিরাপত্তার ব্যয়।

গত সপ্তাহে ওমান উপসাগর থেকে চীনে তেল পরিবহনে সুপারট্যাংকার বা ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ারের (ভিএলসিসি) ভাড়া প্রায় ৪৫০ ওয়ার্ল্ডস্কেলে উঠেছে। বাল্টিক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, এই হার প্রতি ব্যারেল তেল পরিবহনে প্রায় ১১ দশমিক ৫০ ডলার খরচের সমান। চলতি বছরের শুরুতে এই রুটের ভাড়া নির্ধারণ শুরুর পর এটি সর্বোচ্চ। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহনের খরচও দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশের দুই রকম প্রভাব

বিশ্ববাণিজ্যের এই দুই বিপরীত প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সুয়েজ রুটে কনটেইনার চলাচল বাড়লে ইউরোপমুখী পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানিতে পরিবহনের সময় ও ফ্রেইট ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন কমলে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হবে।

অন্যদিকে হরমুজের সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি হবে মূলত জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়ের মাধ্যমে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তেলবাহী জাহাজের ভাড়া ও বিমা ব্যয় বাড়লে জ্বালানি আমদানির মোট খরচ বাড়বে। এর প্রভাব শিল্পকারখানার উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানির ফ্রেইট ব্যয় বেড়ে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ উৎপাদন ব্যয় হয়ে ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যমূল্যেও পৌঁছাতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত