অনলাইন কেনাকাটা: ক্রেতার সংখ্যা কমে সংকটে বিপণিবিতান
• মূল্যস্ফীতি, অনলাইনসহ বিভিন্ন কারণে ব্যবসা কমেছে
• ফুডকোর্ট, সিনেমা স্ক্রিন থাকা নতুন শপিং মলে আগ্রহ
• পণ্যের বৈচিত্র্য আর অনলাইনে জোর দেওয়ার পরামর্শ

রাজধানীর জনপ্রিয় কয়েকটি বিপণিবিতান বা শপিং মলে একসময় দোকান খোলার আগেই কিছুসংখ্যক ক্রেতাকে এসে অপেক্ষা করতে দেখা যেত। সেদিন আর নেই। মূল্যস্ফীতির চাপ, ক্রেতাদের অভ্যাসের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে পণিবিতানগুলোর ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। সে তুলনায় ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানে বিক্রি বেশ জমজমাট। ডিজিটাল জীবনে ক্রমেই বেশি করে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মানুষ অনলাইন পেজ থেকে একটা বড় অংশের কেনাকাটার কাজ সারছে। এই পরিস্থিতিতে বড় বড় বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা উদ্বেগে রয়েছেন।
সম্প্রতি ক্রেতাসংকটে বন্ধই হয়ে গেছে রাজধানীর পুরোনো অভিজাত বিপণিবিতান শান্তিনগর এলাকার কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। সুরম্য শপিং মলটিতে একসময় ক্রেতার বেশ ভিড় হতো। এই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজের সময়কার যানজটের কারণে তাঁরা প্রথম ক্রেতা হারাতে শুরু করেন। অন্য বিপণিবিতানে ঝুঁকে পড়া ক্রেতারা আর ফেরেননি। ইদানীং এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছিল যে জিনিসপত্র ঘুরে দেখে শুধু দামাদামি করার লোকও তেমন আসছিল না।
একই রকম সমস্যার কথা জানাচ্ছেন ইস্টার্ন প্লাজা, রাপা প্লাজার মতো পরিচিত এবং একসময়ের ব্যস্ত বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বিপণিবিতানে ক্রেতাসংকটের পেছনে বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, অনলাইন শপ এবং ফুটপাতের অস্থায়ী দোকান অনেকাংশে দায়ী হলেও করোনা মহামারির প্রভাব, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, যাতায়াতের সমস্যা, এলাকায় এলাকায় বিপণিবিতান হওয়া, পুরোনো শপিং মলে পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব এবং আধুনিক বিপণনব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারাও এর পেছনে কাজ করেছে।
যেভাবে ঝাঁপ বন্ধ কর্ণফুলীর
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ্ ওসমানী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা এক দিনে হয়নি। এক দশক ধরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শুরুটা করোনা মহামারি থেকে। এরপর অনলাইন বিপণন, পণ্যের বৈচিত্র্য না থাকা এবং প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে।’
দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এই বিপণিবিতানে দোকান ছিল ১৯৮টি। বন্ধ হওয়ার সময় চালু ছিল মাত্র ১৭টি।
বিপণিবিতানটির সমস্যার চিত্র তুলে ধরে বাকি বিল্লাহ ওসমানী জানান, তাঁদের মাসিক পরিচালন ব্যয় ১৫ লাখ টাকার বেশি। অথচ গত ছয় থেকে আট মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি আসেনি। সার্ভিস চার্জ ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ বকেয়ার পরিমাণ প্রায় চার কোটি টাকা। তাই দোকানগুলো বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিকেরা। হাসপাতাল, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বিপণিবিতান বেড়েছে, বদলেছে ধরন
ব্যবসায়ীরা জানান, একের পর এক নতুন বিপণিবিতান হওয়ায় ব্যবসা ভাগ হয়ে গেছে। পুরোনো জায়গায় ক্রেতা কমার আরেকটা কারণ হচ্ছে, সেখানে পণ্য ও সেবার বৈচিত্র্য নেই। পরের দিকে গড়ে ওঠা বড় বড় বিপণিবিতানে বৈচিত্র্যময় পণ্য ছাড়াও এক ছাদের নিচে নামীদামি ব্র্যান্ডের আউটলেট, খাওয়াদাওয়ার ফুডকোর্ট এবং সিনেমা দেখার সুবিধা থাকে। এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়া ক্রেতারা এখন এক জায়গাতেই সবকিছু পেতে চান। পুরোনো শপিং মলগুলোতে এসব সুবিধা নেই বলে তাঁরা ক্রেতা হারিয়ে ফেলেছেন।
মগবাজারের বাসিন্দা জিয়াউল ইসলামের কথায় পাওয়া গেল তারই প্রমাণ। তিনি বললেন, ‘এই এলাকায় মৌচাক, ফরচুন—এ রকম আরও কিছু শপিং মল আছে। কিন্তু এগুলোতে একটা দোকান থেকে শার্ট কিনলে পছন্দমতো প্যান্ট পাওয়া যায় না। শিশুদের জুতা কিনতে পারলাম তো পরিবারের প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস পাই না। বাচ্চাদের খেলার জায়গা বা দেখাবার কিছু নাই এই মার্কেটগুলোতে। তাই এখন হয় অনলাইনে কিনি অথবা যমুনা, বসুন্ধরায় যাই।’
ব্যবসায়ীদের মতে, বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন বিপণিবিতান, ব্র্যান্ডের আউটলেট ও সুপারশপ গড়ে ওঠায় আগের মতো এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে কেনাকাটা করার প্রবণতাও কমেছে। আগে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা তো বটেই, এমনকি চট্টগ্রাম, রাজশাহী কিংবা ময়মনসিংহ থেকে মানুষ উৎসবের কেনাকাটা করতে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, মৌচাক বা ইস্টার্ন প্লাজার মতো শপিং মলগুলোতে ভিড় জমাতেন।
ক্রয়ক্ষমতা আরেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ
শুধু ছোট বা পুরোনো বিপণিবিতান নয়, আধুনিক বড় বিপণিবিতানগুলোতেও উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা ছাড়া ক্রেতা উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা মনে করেন, লোকের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এর একটি বড় কারণ।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বিপণিবিতানে ক্রেতাসংকটের অন্যতম কারণ মানুষের আয়-রোজগার কমে যাওয়া। হাতে টাকা না থাকলে লোকে কেনাকাটা কমিয়ে দেয়। তা ছাড়া দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বিপণিবিতান গড়ে উঠেছে। ফলে দোকানিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।’
হেলাল উদ্দিন অনলাইন কেনাকাটার প্রভাবের বিষয়টিতে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর মতে, লোকের হাতে টাকা থাকলে তারা ঠিকই খরচ করবে। খরচ করার মতো আয় না থাকলে অনলাইন বা সরাসরি—কোনো মাধ্যমেই কেনাকাটা বাড়বে না।
বাড়ছে অনলাইনমুখী ব্যবসা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইন কেনাকাটার প্রসার ব্যবসার ধরনে পরিবর্তন আনছে। বিপণিবিতানে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমলেও অনেক দোকান অনলাইন অর্ডারনির্ভর হয়ে উঠছে। তাদের শোরুম মূলত পণ্যের গুদাম এবং ক্রেতাদের পণ্য দেখানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি অনলাইন বিক্রিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) মহাব্যবস্থাপক ও অফিস সচিব এস এম ইকরামুল হক বলেন, ‘অনলাইনে কেনাকাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। বিপণিবিতানে গিয়ে কেনাকাটায় অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। সেই সময় বাঁচানোর সুযোগ থাকায় অনলাইনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।’
তবে অনলাইন কেনাকাটার পরিমাণ কতটা বেড়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান দিতে পারেনি ই-ক্যাব। তাতে বিপণিবিতানের ব্যবসা কমে যাওয়ার ওপর এককভাবে অনলাইন ব্যবসার প্রভাব ঠিক কতটা, তার ধারণা পাওয়া যায়নি।
ই-ক্যাব মহাব্যবস্থাপক জানান, অনলাইনে ব্যবসা করা অনেকে তাঁদের নিবন্ধিত সদস্য নন। ফলে অনলাইন কেনাকাটার প্রকৃত বাজার কত বড় হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাসে পরিবর্তন আসছে, সেটা স্পষ্ট।
ফুটপাত জমজমাট
নিউমার্কেট, মগবাজার-মালিবাগের মৌচাক ও যমুনা ফিউচার পার্কের আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মার্কেটের ভেতরে ক্রেতাসমাগম কম। তবে বাইরে ফুটপাতের ও ভ্যানগাড়ির ওপর থাকা ভ্রাম্যমাণ বাজারে ক্রেতাদের বেশ ভিড়। পোশাক, জুতা, ব্যাগ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় রাজ্যের পণ্য বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে। দামাদামি করে তুলনামূলক কম দামে জিনিস পেতে বহু ক্রেতা ভিড় করেছেন সেখানে।
রাজধানীর মৌচাক মার্কেট এলাকার হকার হালিম মিয়া বলেন, ‘এই মার্কেট এখন টিকাইয়া রাখছে মহিলারা। ঘরের পাপোশ, বাথরুমের বদনা, কাজের মেয়ের জামা—এসব ছোটখাটো জিনিস কিনতে মহিলারা আসে। এর বাইরে শপিং বলতে যা বোঝেন, সেই কাস্টমার এইখানে তেমন একটা আর আসে না।’
টিকতে হলে বদলাতে হবে
বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীদের টিকে থাকতে হলে বদলে যাওয়া বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চরম অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখা কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ অন্যদের কিছু পরামর্শ দিতেই পারেন। তিনি বললেন, ‘ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীকে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। অনলাইনভিত্তিক বিক্রির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। না হলে টিকে থাকা যাবে না।’









