Ajker Patrika

‘দেশীয় এয়ারলাইন শক্তিশালী না হলে বাংলাদেশ এভিয়েশন হাব হবে না’

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০: ০১
‘দেশীয় এয়ারলাইন শক্তিশালী না হলে বাংলাদেশ এভিয়েশন হাব হবে না’
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশীয় এয়ারলাইনগুলোকে সক্ষম ও প্রতিযোগিতামূলক না করে শুধু বড় বিমানবন্দর ও টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, এভিয়েশন হাবের মূল চালিকাশক্তি হতে হবে দেশের নিজস্ব এয়ারলাইন। তাদের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে।

রাজধানীর ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে আজ শনিবার বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে ইউএস-বাংলার এমডি এসব কথা বলেন।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক।

অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। সম্মেলনে এভিয়েশন খাতের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

ইউএস-বাংলার এমডি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘শুধু এভিয়েশন হাব বললেই এভিয়েশন হাব হওয়া যায় না। দেশীয় এয়ারলাইনগুলোকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিদেশি এয়ারলাইন এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে না। দেশীয় এয়ারলাইনকে সক্ষম করে তুলতে হবে এবং তাদের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে হবে।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, টার্মিনাল নির্মাণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এয়ারলাইন অপারেটরদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ করা হয়নি। অথচ টার্মিনাল মূলত এয়ারলাইন অপারেটর ও যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনায় তৈরি হওয়ার কথা। নিজেদের পাশাপাশি অন্য এয়ারলাইন অপারেটরদেরও টার্মিনালে কী ধরনের সুবিধা প্রয়োজন, সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ হয়নি।

এভিয়েশন হাব হিসেবে সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে ইউএস-বাংলার এমডি বলেন, সেখানে টার্মিনালে যাত্রীদের কয়েক ঘণ্টা সময় কাটানোর মতো কেনাকাটা, বিনোদন ও অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, কেনাকাটা ও বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে শুধু বড় টার্মিনাল নির্মাণ করে এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

বাংলাদেশের এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, নতুন এভিয়েশন নীতিমালা কার্যকর হলে খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। ১৯৮৪ সালের বিধিমালার পরিবর্তে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেন।

বিমান রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় তুলে ধরে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, একটি বোয়িং উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের দাম প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলার এবং নতুন ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে ২৩ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দাম হতে পারে। ড্রিমলাইনারের একটি ইঞ্জিনের দাম ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। ইঞ্জিন মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানোর বর্তমান প্রক্রিয়ায় সময় ও অর্থ— দুটিই বেশি ব্যয় হয়। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রানওয়ে সংকটের কারণেও এয়ারলাইনগুলোকে বড় ধরনের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন ইউএস-বাংলার এমডি। তাঁর হিসাবে, রানওয়ের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে একটি বোয়িং উড়োজাহাজে প্রায় ৩০০ কেজি এবং এয়ারবাসে প্রায় ৯০০ কেজি অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়তে পারে। ছোট উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেও প্রায় ৭৫ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়। তিনি দাবি করেন, শুধু রানওয়ের কারণে ইউএস-বাংলার প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। অবতরণ ও উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজকে অপেক্ষায় থাকতে হওয়ায় ফ্লাইট সময়মতো পরিচালনা করা কঠিন হচ্ছে এবং যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।

বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রতিযোগিতা থাকলে সেবার মান বাড়বে এবং ব্যয় কমবে। ঢাকা-কলকাতা রুটে একাধিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, কুয়ালালামপুরেও একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাকে সুরক্ষার যুক্তিতে প্রতিযোগিতা সীমিত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরগামী একটি বোয়িং উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রায় ৯৭ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে কুয়ালালামপুর থেকে বাংলাদেশে আসা একটি এয়ারলাইনকে স্থানীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়। ইউএস-বাংলা ২০২৩ সালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সনদ পেলেও লাইসেন্স না থাকায় এখনো এ সেবা দিতে পারছে না বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি বিমানভাড়ার পেছনে সরকারি কর ও শুল্ককে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ইউএস-বাংলার এমডি। তাঁর দাবি, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর যাওয়ার সময় একজন যাত্রীর কাছ থেকে সরকারি কর ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা নেওয়া হয়। বিপরীতে কুয়ালালামপুর থেকে বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে এ ধরনের খরচ প্রায় ২০০ টাকা। ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় কর ও শুল্ক বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়। বিপরীতে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে আসার সময় এ খাতে খরচ প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা।

অভ্যন্তরীণ রুটেও বিভিন্ন কর ও চার্জের কারণে ব্যয় বাড়ছে বলে দাবি করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ঢাকা-যশোর রুটে একজন যাত্রীর ওপর এসব খাতে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় পড়ে। এ ছাড়া উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম এবং টিকিট বিক্রিতে ৭ শতাংশ কমিশনও এয়ারলাইনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে পর্যটন ও কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিমান পরিবহনের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পর্যটনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও বিমান পরিবহনের বিভিন্ন চার্জ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

উড়োজাহাজ কেনার পরিবর্তে লিজিং ব্যবস্থার সুবিধার কথাও তুলে ধরেন ইউস-বাংলার এমডি। তাঁর মতে, বিশ্বের অধিকাংশ এয়ারলাইন লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে উড়োজাহাজ নেয়। ইউএস-বাংলাও আগামী কয়েক বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী ও লিজিং কোম্পানির অর্থায়নে উড়োজাহাজ নিয়ে ভাড়ার ভিত্তিতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত