একটি অর্থনীতি তখনই পরিণত হয়, যখন সেখানে শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়, নতুন উদ্যোক্তারাও নিয়মিত বড় হয়ে ওঠেন। কারণ, দীর্ঘ মেয়াদে প্রবৃদ্ধির—অর্থাৎ অর্থনীতির উৎপাদন ও আকার বৃদ্ধির শক্তি আসে নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন প্রতিযোগিতা থেকে। উন্নয়নের নতুন হিসাব তাই এখন শুধু অর্থনীতির আকার নয়; বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা জায়গা তৈরি হচ্ছে, সেটিও।
দেশে ব্যবসা শুরুর প্রবণতা বাড়ছে। যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত কোম্পানি, এক ব্যক্তির কোম্পানি ও অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ লাখ ৯০ হাজার। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারি বলছে, দেশে কার্যরত ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৮ লাখ ৬৫ হাজার। সংখ্যার দিক থেকে এটি একটি বিস্তৃত উদ্যোক্তা ভিত্তির ইঙ্গিত দেয়। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, আসল প্রশ্ন হলো, কত প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর পরও টিকে থেকে সম্প্রসারিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ‘এন্টারপ্রাইজ সার্ভে’ এবং ‘কান্ট্রি প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক (সিপিএসডি)’ দেখায়, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, নীতিগত জটিলতা, নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বল প্রতিযোগিতার পরিবেশের কারণে সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় হয়ে ওঠা কঠিন। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এবং প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এসএমই খাত। কিন্তু অর্থায়ন, প্রযুক্তি, মানসনদ, বাজারে প্রবেশ, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়া ও সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণে তারা এখনো নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে। তাই অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ ব্যবসা শুরু করতে পারলেও বড় হওয়ার আগেই গতি হারায়।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সহযোগিতায় প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ ন্যাশনাল হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২১ বলছে, দেশে অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা, ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয়, জটিল বিধিব্যবস্থা এবং অর্থায়নে সীমিত প্রবেশাধিকার বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতার বড় বাধা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. আবু ইউসুফ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিকাশ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান যদি ধাপে ধাপে বড় হওয়ার সুযোগ না পায়, তাহলে ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতার নতুন উৎস তৈরি হবে না। আজকের ছোট উদ্যোগগুলোকেই আগামী দিনের বড় শিল্পে পরিণত হতে হবে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়নের নতুন হিসাব শুধু নতুন কোম্পানির সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং কত প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি গ্রহণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও রপ্তানিতে প্রবেশ করতে পারছে, সেটি দিয়েও করতে হবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা। প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ অনুযায়ী কমিশনের দায়িত্ব বাজারে আধিপত্যের অপব্যবহার, যোগসাজশ, কারসাজি এবং প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণ প্রতিরোধ করা। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমিশনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এ কারণেই বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সংশোধিত আইনে বাজার তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণের বিরুদ্ধে কমিশনের ক্ষমতা জোরদার করা এবং বড় প্রতিষ্ঠানের একীভূত হওয়ার (মার্জার) প্রভাব আরও কার্যকরভাবে পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
তবে শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিযোগিতা কমিশনের দক্ষ জনবল, বাজার বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরিবেশ নিশ্চিত না হলে আইনের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।’
নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ সহজ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া সহজ করতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, অনলাইন অনুমোদন ও বিভিন্ন সেবার ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, উদ্যোক্তার সময় ও ব্যয় কমানো গেলে নতুন বিনিয়োগের গতি বাড়বে, টিকে থাকার পথও সহজ হবে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল, পৃথক ঋণনীতি ও সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের কর্মসূচি চালু রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হুসনে আরা শিখা বলেন, এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ, পুনঃ অর্থায়নের সুযোগ এবং নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে উদ্যোক্তারা কতটা সহজে অর্থায়ন ও সেবা পাচ্ছেন, তার ওপর।
মাঠের অভিজ্ঞতাও একই চিত্র তুলে ধরে। সিরাজগঞ্জের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত উদ্যোক্তা রাফসান আহমেদ বলেন, ‘প্রতিযোগিতা করতে ভয় নেই। কিন্তু ব্যাংকঋণ, সরকারি ক্রয় আর বাজারে প্রবেশের সুযোগ যদি সমান না হয়, তাহলে সক্ষমতা থাকলেও এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও মনে করেন, দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক বাজারই সবার জন্য উপকারী। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, দেশের শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপে বড় শিল্পের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও নীতিগত সহায়তায় বৈষম্য কমাতে পারলে এ ধরনের শিল্পভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে।
বিশ্বের সফল অর্থনীতির অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো দেশ শুধু কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর ভর করে দীর্ঘদিন উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অর্থনীতির শক্তি এসেছে শুধু প্রতিষ্ঠিত করপোরেশন থেকে নয়; বরং নতুন স্টার্টআপের ধারাবাহিক উত্থান, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা থেকে। জার্মানির শিল্পশক্তির ভিত্তি গড়ে উঠেছে হাজার হাজার প্রতিযোগিতামূলক ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান—মিটেলস্ট্যান্ডের ওপর। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতার ভিত্তি তৈরি হয় প্রতিযোগিতা ও নতুন প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক বিকাশের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের সামনেও এখন একই পরীক্ষা। ভবিষ্যতের বড় শিল্প, নতুন রপ্তানিকারক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান জন্ম নেবে আজকের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ থেকেই। সেই পথ যত উন্মুক্ত হবে, উন্নয়নের ভিত্তিও তত শক্তিশালী হবে।

সস্তা শ্রম, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান, প্রবাসী আয় ও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ভোগ—এই চার শক্তির অর্থনৈতিক মডেল বাংলাদেশকে গত তিন দশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত করেছে।
১ দিন আগে
সুপারস্টোর ব্র্যান্ড আগোরা লিমিটেডে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী ‘আগোরা মাছের মেলা’। ‘আগোরা মাছের মেলা, পুষ্টিতে কাটুক সারাবেলা’—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত মেলাটি চলবে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত।
১ দিন আগে
সাভারের আমিনবাজার এলাকায় অবস্থিত ‘মধুমতি মডেল টাউন’ প্রকল্পের সার্বিক উন্নয়ন, প্লট মালিকদের অধিকার সংরক্ষণ এবং একটি আধুনিক ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘মধুমতি মডেল টাউন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি এবং উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
২ দিন আগে
বর্তমানে ইউএস-বাংলার বিমান বহরে তিনটি এয়ারবাস ৩৩০-৩০০, নয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০-সহ মোট ২৫টি এয়ারক্রাফট রয়েছে। যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯০ শতাংশেরও বেশি অন-টাইম ফ্লাইট পরিচালনার রেকর্ড রয়েছে ইউএস-বাংলার।
২ দিন আগে