Ajker Patrika

কারখানার ছাদে ১৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের পথ দেখাল সিপিডি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
কারখানার ছাদে ১৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের পথ দেখাল সিপিডি
রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে বৃহস্পতিবার সিপিডি আয়োজিত ‘পোশাক খাতের শিল্প কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভা। ছবি: সংগৃহীত

কেবল রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা ও বস্ত্রকলগুলোর ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে নতুন করে ১৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। দেশে চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট ও অনিশ্চয়তাকে সামনে রেখে সিপিডির এমন গবেষণাকে সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনায় পথনির্দেশক হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত ‘পোশাক খাতের শিল্প কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে।

সংস্থাটির গবেষণা বলছে, ছাদের এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বা ১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। গবেষণায় দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় যেগুলোর ছাদের আকার ৯৭ লাখ ২৫ হাজার ৫৯১ বর্গমিটার। এর মধ্যে ৩৫০টি কারখানায় সরাসরি সমীক্ষা চালানো হয়, যা দেশের মোট পোশাক কারখানার প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, কারখানার ছাদের সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে তৈরি পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটের গড় খরচ মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা। যা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের দামের অর্ধেকেরও কম। তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন, বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৪ থেকে ৫ টাকা দাঁড়াতে পারে।

অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মধ্যে রয়েছে। অনেক আগে থেকেই শিল্প কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে বর্তমান সংকট আরও কমানো সম্ভব হতো। পোশাক খাত ধীরে ধীরে রুফটপ সোলারের দিকে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। একদিকে এটি জ্বালানি চাপ কমাচ্ছে, অন্যদিকে ডিকার্বনাইজেশনের প্রতিশ্রুতি পূরণেও সহায়তা করছে।

এই গবেষক মনে করেন, সব কারখানা এখনই সৌরবিদ্যুতে যেতে প্রস্তুত নয়; তবে প্রায় ৫০০ কারখানা এখনই বিনিয়োগ করতে পারে। আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কারখানা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এ খাতে যেতে পারবে। তবে ৪০০ টির বেশি কারখানায় আরও বেশি ধরনের সহায়তা ও নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

গবেষণায় আরও বলা হয়, বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি হলে শিল্পের রুফটপ সোলার প্রকল্পগুলো ব্যাংকের কাছে বিনিয়োগযোগ্যতা হারায়। ফলে এ খাতে সবুজ অর্থায়ন বা রেয়াতি ঋণের ধারাবাহিকতা জরুরি। বিনিয়োগের শর্তগুলো পরিবর্তন করা গেলে সৌরবিদ্যুতে যেতে প্রস্তুত কারখানার সংখ্যা আরও বাড়বে। বিশেষ করে সাড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি সুদে গ্রিন ফাইন্যান্স পাওয়া গেলে তা সবচেয়ে ভালো হবে।

সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, এইচঅ্যান্ডএম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও এমঅ্যান্ডএসের মতো বৈশ্বিক ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এতে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ এবং পুরো জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য শক্তি ফোরামে পোশাক খাতের রুফটপ সোলারে চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়। যেখানে বলা হয়, চীনের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সহজ অর্থায়ন কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের শিল্প খাতে রুফটপ সোলারের বিস্তার আরও দ্রুত করা সম্ভব। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত শর্ত পূরণসহ সব মিলিয়ে পোশাক খাতে রুফটপ সোলার এখন কেবল বিকল্প জ্বালানি নয়, বরং ভবিষ্যৎ শিল্প প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অনুষ্ঠানে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সৌর বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কান্ট্রি লিয়াজোঁ নুসরাত জাহান, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও অপারেশন) স্বপন বণিক, বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআর) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জাহিদুল আলম, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মিনহাজুল হকসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত