Ajker Patrika

আইডিআরএ: সম্পদ বিক্রি করেই বিমা দাবি শোধের পরিকল্পনা

  • গ্রাহকের আটকে থাকা টাকার পরিমাণ ৭ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা
  • জীবনবিমা কোম্পানির কাছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা
  • সাধারণ বিমা কোম্পানির কাছে ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা
মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
আইডিআরএ: সম্পদ বিক্রি করেই বিমা দাবি শোধের পরিকল্পনা

বিমার মেয়াদ শেষ হলেও বছরের পর বছর দাবি পরিশোধ না হওয়ায় দেশের বিমা খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আর্থিকভাবে দুর্বল বিমা কোম্পানিগুলোর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আইনি জটিলতা, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ এবং বাজার বাস্তবতার কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না।

আইডিআরএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ৮১টি জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকদের মোট বকেয়া দাবি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৭৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩৬টি জীবনবিমা কোম্পানির কাছে আটকে আছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং ৪৫টি সাধারণ (নন-লাইফ) বিমা কোম্পানির কাছে ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, মোট বকেয়া দাবির বড় অংশই কয়েকটি আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি আটকে রয়েছে। তাই প্রথম ধাপে এসব কোম্পানিকে ঘিরেই বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বিমা খাতে মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো গ্রাহকের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা। তাঁর ভাষ্য, মানুষ যখন সময়মতো বিমার অর্থ ফিরে পাবে, তখনই খাতটির প্রতি হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরতে শুরু করবে।

এই লক্ষ্যেই গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাতটি বিমা কোম্পানির মালিক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে আইডিআরএ। বৈঠকে কোম্পানিগুলোর জমি, ভবন, বিনিয়োগ, নগদ প্রবাহ ও আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোথাও সম্পদের মূল্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে স্বাধীন মূল্যায়নেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিক্রিযোগ্য জমি, ভবন, ভালো ব্যাংকে রাখা এফডিআর, সরকারি ট্রেজারি বন্ড এবং অন্যান্য নগদায়নযোগ্য বিনিয়োগ বিক্রি করে অর্থ একটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। প্রতিটি কোম্পানির জন্য আলাদা হিসাব থাকবে এবং পুরো প্রক্রিয়া নিরীক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। পরে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ নীতিতে আগে দাবি করা গ্রাহকদের আগে অর্থ পরিশোধ করা হবে। আর দুর্বল ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নেওয়া হবে।

তবে বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অতীতে অনেক কোম্পানি প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে জমি ও ভবন কিনেছিল। কোথাও কোথাও একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনদেনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সম্পদের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। ফলে এখন সেই সম্পদ বিক্রি করতে গেলে নথিভুক্ত মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক সম্পত্তি ব্যাংকের কাছে বন্ধক, মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা আদালতে মামলা চলমান থাকায় বিক্রির প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

জেনিথ লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামান বলেন, গ্রাহকের স্বার্থে বর্তমান বাজারমূল্যেই সম্পদ বিক্রি করে হলেও বকেয়া দাবি পরিশোধ করা উচিত। একই সঙ্গে অতীতে অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ কেনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. মাইনউদ্দিন বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সময় লাগবে। কারণ, বাজারে যখন জানা যাবে, কোনো কোম্পানির সম্পদ বাধ্য হয়ে বিক্রি করা হচ্ছে, তখন সম্ভাব্য ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই কম দামে কিনতে চাইবেন। ফলে সম্পদের ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হবে।

এদিকে বিদ্যমান বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী আইডিআরএ সরাসরি কোনো বিমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করতে পারে না। এ জন্য আদালতের মাধ্যমে দেউলিয়া ঘোষণা ও অবধায়ক নিয়োগের মতো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতিমধ্যে ‘বিমাকারীর রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’-এর খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে দুর্বল বিমা কোম্পানিকে একীভূত করা, পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন এবং প্রয়োজন হলে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবহার করেও গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের সুযোগ তৈরি হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত