Ajker Patrika

বোয়িং-এয়ারবাস রশি টানাটানি: দুই কুলই রাখতে চায় বিমান

কমল জোহা খান, ঢাকা
বোয়িং-এয়ারবাস রশি টানাটানি: দুই কুলই রাখতে চায় বিমান

বাংলাদেশ বিমানের আকাশে ডানা মেলার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এবং ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের মধ্যকার ‘রশি টানাটানি’ থামেনি। ক্ষমতার পালাবদল আর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিযোগিতাও বারবার রূপ বদল করেছে।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার মার্কিন বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে একটি বড় চুক্তি সই করেছে। তবে এই চুক্তির পরও জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে এয়ারবাস যুক্ত করার আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, বিমানের প্রয়োজনে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেই উড়োজাহাজ কেনা হতে পারে।

গত ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে বাংলাদেশ বিমান ও যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের মধ্যে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা) মূল্যের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির অধীনে বিমান ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে, যার মধ্যে ১০টি ওয়াইড-বডি ‘৭৮৭ ড্রিমলাইনার’ এবং ৪টি ন্যারো-বডি ‘৭৩টি ম্যাক্স’ মডেলের বিমান রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩১ সালের অক্টোবর থেকে প্রথম উড়োজাহাজটি সরবরাহ শুরু হবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো বহর বিমানের কাছে হস্তান্তর সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এসব নতুন উড়োজাহাজ বিমানের বহর আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক রুট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।’

অন্যদিকে, বোয়িংয়ের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিগি বলেন, ‘নতুন এই উড়োজাহাজগুলো প্রায় ২০ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে এবং মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘ দূরত্বের রুটে যাত্রীসেবায় উন্নত সুবিধা দেবে।’

বিমানের বহর সম্প্রসারণের এই প্রক্রিয়াটি রাতারাতি সম্পন্ন হয়নি, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক দশকের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক লড়াই।

আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বাংলাদেশ সফরে এলে তৎকালীন সরকার ১০টি এয়ারবাস কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়। ওয়াইডবডি ‘এ ৩৫০’ মডেলের জন্য সেই চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

কিন্তু তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বোয়িংয়ের পক্ষে জোরদার লবিং শুরু করেন। বিমান কার্যালয় ‘বলাকা’য় সশরীরে উপস্থিত হয়ে তিনি বোয়িংয়ের প্রস্তাবকে নিবিড়ভাবে মূল্যায়নের জন্য তাগিদ দেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘাটতি ও শুল্ক কমানোর কৌশলগত অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের প্রস্তাবকে এগিয়ে নেয়। তবে এই সময়ে ইউরোপীয় চার দেশের (ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইইউ) রাষ্ট্রদূতেরা ঢাকায় ‘ইউরোপীয় ডায়ালগ অন বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশন গ্রোথ’ সেমিনারের মাধ্যমে বিমান বহরে এয়ারবাস যুক্ত করার পক্ষে পুনরায় প্রচারণা চালান।

বোয়িংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন এয়ারবাসের অধ্যায় হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু গত ১৫ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এর পরদিনই অর্থাৎ ১৬ জুলাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের সরাসরি বলেন, ‘আমাদের দেশের বোয়িংও প্রয়োজন, এয়ারবাসও প্রয়োজন। আমরা দুটিই কিনব।’

বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত কোনো বাহ্যিক চাপের ফল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী তা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ বিমান তার বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কৌশলগত প্রয়োজনেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।

বিমানের বর্তমান বহরের রয়েছে ১৯টি এয়ারক্রাফট। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির ১৪টি এবং কানাডার ড্যাশ-৮-৪০০ উড়োজাহাজ ৫টি।

নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়ের মহা-পরিকল্পনা কাগজে-কলমে দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বিমানের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছে তীব্র মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা সংকট।

বিমানের একাধিক বর্তমান ও সাবেক পাইলট নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বহরে থাকা বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজের বয়স ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অবস্থা শোচনীয়। প্রকৌশল বিভাগে রয়েছে তীব্র জনবল সংকট।

বর্তমানে প্রায় ২০০ জন বৈমানিক নিয়ে ৩৩টি দেশি-বিদেশি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। কুয়েত ও জাপানের নারিতায় পুনরায় ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত আসায় বৈমানিকদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। একজন বৈমানিকের বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ঘণ্টা ফ্লাইং আওয়ারের যে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বার্ষিক ছুটি ও বিশ্রাম হিসাব করলে বর্তমান বৈমানিক সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।

পাইলটদের বড় একটি ক্ষোভের জায়গা হলো, উড়োজাহাজ কেনার আগে কখনোই চালকদের মতামত বা প্রযুক্তিগত পরামর্শকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। বিমানের সাবেক এক পাইলট বলেন, ‘নতুন এয়ারক্রাফট যেমন প্রয়োজন, তেমনি নতুন এয়ারক্রাফট এলে আয়-ব্যয় বাড়বে কিনা, পাইলটসহ প্রয়োজনীয় জনবল আমাদের আছে কিনা—সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।’

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, বোয়িং বা এয়ারবাস যেটিই বহরে আনা হোক না কেন, তা বাণিজ্যিকভাবে কতটা লাভবান হবে, তার সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থাকা সবচেয়ে জরুরি।

বিমানের ইতিহাসে এয়ারবাসের ভূমিকা অতীতে লিজিং বা সেকেন্ড-হ্যান্ড বিমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দেখার বিষয়, বিপুল ঋণের বোঝা ও বৈমানিক সংকটের মাঝে দাঁড়িয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে ৪৫ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ বিমান, এবং বোয়িংয়ের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে এয়ারবাস কেনা দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা যৌক্তিক হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত