পান কি সবজি জাতীয় ‘ফসল’ নাকি পৃথক ভেষজ পণ্য—এই নিয়ে দীর্ঘ দুই যুগের দ্বন্দ্বের অবসানে অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। শীর্ষ আদালতের রায়ে ফয়সালা হওয়ার পর থেকে বছর বছর বাড়ছে রপ্তানি। তার আগে দুই সংগঠনের বিরোধে প্রভাব পড়েছিল বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পান রপ্তানিতে। রপ্তানিকারকেরা বলছেন, এখন যাবতীয় দ্বন্দ্ব এড়িয়ে সঠিকভাবে এগোতে পারলে বৈশ্বিক বাজারে এক হাজার কোটি টাকার পান ও পানজাত পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।
পান বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে এটি নিয়ে দুই রকম ব্যাখ্যা ছিল। এক সংগঠনের দাবি ছিল, সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের জন্য পানকে ‘সবজি’ পরিচয়ে রপ্তানিতে আগ্রহী একটি পক্ষ। আর ‘সবজি’ তত্ত্বের পক্ষের সংগঠনের দাবি, পানের ভিন্ন পরিচয় তুলে ধরে সুবিধা বাগিয়ে নিতে সক্রিয় হয়েছে একটি ‘সিন্ডিকেট’। এর সূত্রে দুই পক্ষের মধ্যে এক ডজনের বেশি মামলা পর্যন্ত হয়েছিল।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের শ্রেণিবিন্যাসে পানকে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের (হর্টিকালচার) তালিকায় রাখা হয়েছে। আর ব্যবহারিক দিক থেকে পানকে মসলাজাতীয় ফসল বা অর্থকরী চিবানোর উপযোগী পাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। রপ্তানি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ শতকের আশির দশক থেকে বাংলাদেশের পান বিদেশে রপ্তানি করা শুরু হয়। তবে এটি তখন ফল ও সবজি রপ্তানিকারক সমিতির আওতায় রপ্তানি হতো সবজির উপজাত পণ্য হিসেবে।
২০০৩ সাল থেকে ‘পান রপ্তানিকারক সমিতি’র হাত ধরে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পান রপ্তানি শুরু হয়। পান রপ্তানিকারক সমিতি বলেছে, ২০০২ সালে বাংলাদেশ থেকে মাত্র চার কোটি টাকার পান রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু তাদের সমিতি সক্রিয় হওয়ার পরের বছরই রপ্তানি আয় লাফিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকায় উঠে যায়। সে বছর পান পাতাকে সবজি না বরং ‘পান’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েই রপ্তানি করা হয়েছিল। ২০০৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পণ্যটি রপ্তানির জন্য পান রপ্তানিকারক সমিতির সদস্যপদ ও প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে।
বিশ্বের বিভিন্ন বাঙালি তথা দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দেশে পানের ভালো চাহিদা রয়েছে। সেখানে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি দামে বিক্রি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পান রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যবসায়ী সবজির আড়ালে পান রপ্তানি করতেন। পান রপ্তানিকারক সমিতির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি পানের মূল্য ৫ থেকে সাড়ে ৬ ডলার হলেও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কাস্টমসে ১.২০ ডলারের সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রপ্তানি করতেন। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের পাশাপাশি ফাঁকি দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের সরকারি রাজস্ব। পান রপ্তানিকারক সমিতির দাবি, এ কারণে পানকে সবজি দেখিয়ে রপ্তানি করা ব্যবসায়ীরা তাদের উদ্যোগকে ভালোভাবে নেননি।
রপ্তানিকারক সমিতির অভিযোগ, বর্তমানে বাংলাদেশের পান রপ্তানি বন্ধ করে পার্শ্ববর্তী দেশের বাজার উন্মুক্ত করার তৎপরতা চলছে। তাদের দাবি, এই তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছেন জনৈক স্বপন সরকার। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়েছে। স্বপনের সহোদর ভাই তপন সরকার ভারতের ‘কলকাতা পান রপ্তানিকারক সমিতি’র নেতা। বাংলাদেশের পান রপ্তানিকারক সমিতির নেতাদের দাবি, এ দেশের পান রপ্তানি বন্ধ থাকলে, বহির্বিশ্বে কলকাতার পানের চাহিদা বাড়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বপন সরকার আজকের পত্রিকাকে বলেন, কলকাতায় অবস্থানরত তাঁর ভাই তপন সরকার পান রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত, এ কথা সত্যি। তবে এর সঙ্গে বাংলাদেশের পান রপ্তানির কোনো সম্পর্ক নেই। স্বপন সরকারের দাবি, পান সমিতির প্রত্যয়নপত্র কাস্টমসের কোনো কাজে লাগে না। এটি মূলত প্রতি বাক্সে ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা ‘চাঁদা আদায়ের বাহানা’। সবজির আড়ালে কম দাম দেখিয়ে পান রপ্তানি করে অর্থ পাচার বা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগকে তিনি কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেন।
রপ্তানির জন্য পানের পৃথক এইচএস কোড (হারমোনাইজড সিস্টেম কোড) রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পণ্য শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি। তবে ২০০৩ সালে সবজি রপ্তানিকারকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ পানকে তাদের আওতাভুক্ত দাবি করে মামলা করে। তখন থেকে প্রায় গত ২৪ বছরে পান রপ্তানিকারক সমিতির বিরুদ্ধে ১০টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায় দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’ এবং ‘সবজি সমিতি’ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা। সবজি সমিতি কোনোভাবেই পান সমিতির অভ্যন্তরীণ ও প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
পান রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সিকদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গত দুই যুগে মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে হয়রানি করায় আমরা রপ্তানিতে সেভাবে মনোযোগ দিতে পারিনি। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর আমরা আবার পান রপ্তানিকারকেরা কাজ শুরু করেছি।’
জামাল উদ্দিন সিকদার আরও বলেন, আদালতে হেরে গিয়ে একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ পেশ করেছে।
তবে রায় মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ফল ও সবজি রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনসুর। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘১৯৮৪ সাল থেকে সবজির সঙ্গে পান রপ্তানি হয়ে আসছে। ২০০২ সালে পানের জন্য তারা আলাদা সমিতি করেছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তাদের পক্ষে রায় পেয়েছে। আমরা চাই পান রপ্তানিকারকেরা অবাধে ব্যবসা করার সুযোগ পাক।’
আইনি লড়াইসহ নানা জটিলতা তৈরি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানের রপ্তানি বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পান রপ্তানি হয়েছে চার হাজার ৩৮৮ দশমিক ৯৬ মেট্রিক টন। তিন বছর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল তিন হাজার ৬৫৯ দশমিক ৭১২ মেট্রিক টন। তখন থেকে প্রতিবছরই রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পান রপ্তানি হচ্ছে ২৮ লাখ বাংলাদেশি কর্মীর দেশ সৌদি আরবে। গত চার অর্থবছরে দেশটিতে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টনের বেশি পান রপ্তানি হয়েছে। এ সময় কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালিতেও স্বল্প পরিমাণে পান রপ্তানি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘পান উৎপাদন ও বাজারজাত প্রক্রিয়া ভালো করার পর রপ্তানি বাড়তে শুরু করেছে। পানের গুণগত মানও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।’
বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির নেতাদের মতে, নীতিগত ও প্রশাসনিক বাধা এবং হয়রানি দূর হলে পানের মাধ্যমে বছরে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে ২০০ কোটি টাকা এবং পাকিস্তানে ৩০০ কোটি টাকার বাংলাদেশি পানের বাজার রয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, ইতালি, গ্রিস, লেবাননসহ বিশ্বের ৩৩টি দেশের প্রবাসী বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পানের চাহিদা রয়েছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, পান পাতার পাশাপাশি পানের রস, পানভিত্তিক তামাকমুক্ত অর্গানিক মাউথ ফ্রেশনার ও প্রসাধন সামগ্রীর মতো উপজাত পণ্য তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। এসব পানজাত পণ্যের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পানকে চা বা কফির মতো একটি আন্তর্জাতিক পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখছেন পান রপ্তানিকারকেরা।
জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পানের রপ্তানি বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সুযোগ রয়েছে। সরকারের উচিত মানসম্মত পান রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের নীতিসহযোগিতা দেওয়া।’

ইরানের দেওয়া শান্তি প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তিন শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
১৩ মিনিট আগে
ভারতের আসাম রাজ্যের ডিব্রুগড় থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে বাংলাদেশে মিথানল রপ্তানি শুরু হতে যাচ্ছে। দেশটির সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড’ (এপিএল) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিদের দাবি, এর মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর এই প্রথম পূর্ব...
১ ঘণ্টা আগে
আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের এক সভায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ সকাল ১০টা থেকে নতুন দাম বাজারে কার্যকর হয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
দেশীয় অর্থে সামর্থ্যের ঘাটতির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নেওয়া বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পেই রয়েছে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা। কিন্তু সেসব প্রকল্পের বিপরীতে দেওয়া প্রতিশ্রুত অর্থ এমনি এমনি আসে না।
১০ ঘণ্টা আগে