শাহ আলম খান, ঢাকা

বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা যখন ক্রমেই বড় উদ্বেগ আর কৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে, তখন কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মানসম্মত উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই দেশের সামনে এক বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির বাজারের আকার ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় ভোক্তা, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এককভাবে ৪০ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান মূলত দ্বিমুখী। একদিকে উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য—শস্য, শাকসবজি ও ফলমূল মিলিয়ে অন্তত ২২টি পণ্যে বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে সেই উৎপাদন এখনো কৃষকের জীবিকা ও আর্থিক সক্ষমতায় ও রপ্তানি আয়ে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটাতে পারছে না।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, কৃষি উৎপাদন আর শিল্পের চাহিদা একই ছকে চলছে না। কৃষিকে ঘিরে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘমেয়াদি স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকাই এই সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণ।
বিবিএস তথ্য বলছে, কৃষি খাত জিডিপিতে ১২ শতাংশ অবদান রাখলেও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশে আনুমানিক এক হাজার খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট আছে, যার মধ্যে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান মাত্র ২৫০টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার ছিল ৪৮০ কোটি ডলার, যেখানে কৃষিপণ্যের বাজার ৪ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলার। সেই তুলনায় ছোট আয়তনের নেদারল্যান্ডস বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সমস্যা শুধু উৎপাদনে নয়; ভ্যালু চেইন, নীতি, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার বড় ফাটলে। মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যন্ত কৃষিপণ্য রপ্তানি বাস্তবতায় চারটি কাঠামোগত সংকট পরস্পর জড়িয়ে সম্ভাবনার গতি থামিয়ে দিচ্ছে। এগুলো হলো পোস্ট হারভেস্ট লস, অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রির কাঁচামাল সংকট, উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কৃষকের আয় না বাড়া এবং কোল্ড চেইনের দুর্বলতায় রপ্তানিতে স্থবিরতা।
সংগ্রহের পরেই ক্ষয় ৩০%
সরকারি ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে দেশে ধান, সবজি ও ফল মিলিয়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ৩০-৪৫ শতাংশ ফসল সংগ্রহের পর নষ্ট হয়। এই ক্ষতি শুধু খাদ্যের অপচয় নয়, বরং এটি সরাসরি কৃষকের আয় কমায়, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করে এবং রপ্তানি সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। বিপুল এই ক্ষতির দায় এককভাবে কৃষকের নয়, পুরো খাদ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাই এখানে মুখ্য।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কৃষক মাঠে ফলন তুলেই বিপদে পড়েন। সংরক্ষণব্যবস্থা নেই, শীতল রাখার সুযোগ নেই, দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা দুর্বল। কৃষকের হাতে প্রযুক্তি, পুঁজি ও সময় সীমিত। তাই অনেক ক্ষেত্রেই তিনি কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘কৃষক উৎপাদন জানে, কিন্তু বাজার ও সংরক্ষণ তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই। অথচ ফল ও সবজির মতো আর্দ্রজাত পণ্যে শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে পচন অনিবার্য।
আন্তর্জাতিক সংস্থা লিক্সক্যাপের বিশ্লেষণ আরও স্পষ্ট, সঠিক কোল্ড চেইন ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়ছে। অর্থাৎ দায়ের বড় অংশ পড়ে সিস্টেমের ওপর।
শিল্পের চাহিদানুযায়ী চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, কোল্ডস্টোরেজ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়াজাত সক্ষমতা বাড়েনি সমানতালে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ পিছিয়ে আছে, সমন্বয়ও দুর্বল। সড়ক ও লজিস্টিকস ঘাটতির কারণে পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছায় না, এতে তাজা পণ্য নষ্ট হয়।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজের মতে, পোস্ট হারভেস্ট লস আসলে পরিকল্পনার দুর্বলতার প্রতিফলন, যা রপ্তানি আয়ের পথে নীরব কিন্তু গভীর বাধা তৈরি করছে। উৎপাদনমুখী নীতির সঙ্গে যদি বাজারব্যবস্থা ও ভ্যালু চেইনের বাস্তব সংযোগ না থাকে এবং নীতি, অবকাঠামো ও বেসরকারি বিনিয়োগ একসঙ্গে এগিয়ে না আসে, তাহলে এই ক্ষতি থামবে না। তিনি বলেন, এর সমাধান কোনো একক উদ্যোগে নয়; সরকার, বেসরকারি খাত ও কৃষকের সক্ষমতাকে এক জায়গায় আনলেই শুধু মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত টেকসই ধারাবাহিকতা গড়ে উঠতে পারে।
কাঁচামাল না পেয়ে শিল্প স্থবির
পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থার দুর্বলতা এখন সরাসরি চাপ তৈরি করছে অ্যাগ্রো প্রসেসিং শিল্পে। বিষয়টি আর অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্পষ্ট উৎপাদন সংকটে রূপ নিয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে কৃষিপণ্যের মোট উৎপাদন কম নয়। কারখানা আছে, সক্ষমতা আছে, বাজারও আছে। কিন্তু শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল সময়মতো, ধারাবাহিকভাবে এবং নির্ধারিত মানে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানা নিয়মিত উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও ব্যয় বাড়ছে।
মূল সমস্যা কৃষি উৎপাদন ও শিল্পের চাহিদার ভিন্ন বাস্তবতায়। কৃষক উৎপাদন করেন মৌসুমের ওপর নির্ভর করে, আর শিল্প চলে বারোমাসি সরবরাহের চাপে। শিল্পমালিকদের বক্তব্যে এই অসামঞ্জস্যই বারবার উঠে আসে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ অ্যাগ্রো প্রসেসিং কারখানা সারা বছর পূর্ণ সক্ষমতায় চলে না। প্রধান কারণ কাঁচামালের অনিয়মিত সরবরাহ। বিশেষ করে ফল ও সবজিনির্ভর শিল্পে সংকট বেশি। ফসলের আকার, আর্দ্রতা ও পরিপক্বতার অসামঞ্জস্যে উৎপাদনের বড় অংশ শিল্পে ব্যবহারযোগ্য থাকে না। ফলে কারখানা ১২ মাস থাকলেও কাঁচামাল মেলে ৬-৭ মাস। এতে উদ্যোক্তাদের আমদানিনির্ভর হতে হচ্ছে, ব্যয় বাড়ছে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হচ্ছে।
বাপার সভাপতি ও হাশেম ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাশেম বলেন, মৌসুমে কাঁচামাল বেশি থাকলেও সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাঠামো নেই, আবার অফ সিজনে কাঁচামাল পাওয়া যায় না, দামও অস্বাভাবিক হয়।
প্রাণ গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস যথাযথভাবে অনুসরণ না হওয়ায় কৃষক ও শিল্পের কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠছে না। এতে মানসম্মত বীজ ব্যবহার ও চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকারও সমস্যাটিকে কাঠামোগত বলেই দেখছে। কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, চুক্তিভিত্তিক কৃষি, শিল্পঘন উৎপাদন অঞ্চল, সহজ অর্থায়ন এবং মাঠ থেকে কারখানা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ গড়ে তুলতে পারলেই কাঁচামাল সংকট কাটবে। একই সঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদেরও উৎপাদন পর্যায়ে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে।
বাজারেই আটকে কৃষকের আয়
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে কৃষি উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যের প্রতিফলন কৃষকের আয়ে দেখা যাচ্ছে না। ফলন বাড়ছে, অথচ কৃষকের হাতে বাড়তি টাকা আসছে না। এই বৈপরীত্যই এখন কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকদের ভাষায়, সমস্যার মূল কেন্দ্র বাজারব্যবস্থা। উৎপাদনের মৌসুমে পণ্য বেশি হলে দাম পড়ে যায়, কিন্তু উৎপাদন খরচ কমে না। বীজ, সার, সেচ ও শ্রম—সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে।
নীলফামারীর দুর্গম এলাকার সবজিচাষি আব্দুল গাফফার বলেন, তাঁরা বেশি ফলন তুললেও সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে পারেন না। সংগ্রহের পর সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় মজুতের সুযোগও নেই। এখানেই লাভ হারিয়ে যায়, উৎপাদনের সাফল্য থেমে যায়।
কৃষক সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, বাজারকাঠামোর ভেতরেই কৃষকের আয় আটকে থাকে। ভোক্তার দেওয়া দামের বড় অংশ চলে যায় পরিবহন, আড়ত ও পাইকারি ব্যবস্থায়। দর-কষাকষির ক্ষমতা সীমিত থাকায় কৃষক বাজারদরের সবচেয়ে দুর্বল অংশীদার হয়ে থাকেন।
সরকারি কর্মকর্তারাও এই দুর্বলতা স্বীকার করছেন। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ জানান, কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থায় আধুনিকতা ও সরাসরি সংযোগের অভাব রয়েছে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার সংস্কার জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বাড়ানো আর আয় বাড়ানো এক বিষয় নয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রযুক্তি সহায়তা, মূল্য স্থিতিশীলতা, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত যুক্ত না হলে কৃষক শুধু ফলন বাড়িয়ে লাভবান হবেন না।
এ বিষয়ে কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ইতিমধ্যে দুটি আধুনিক মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং চলতি বছরের বাজেটেই সারা দেশে আরও ১০০টি নির্মাণ হবে। পাশাপাশি খামারি অ্যাপ চালু হয়েছে, এর মাধ্যমে বাজারদর ও পূর্বাভাস পাওয়া যাবে, যা কৃষকের লোকসান কমিয়ে আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
কোল্ড চেইনে সুফল দিচ্ছে না পুরোনো প্রযুক্তি
দেশে বর্তমানে ৫৫০টির বেশি কোল্ডস্টোরেজ থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই আলু সংরক্ষণকেন্দ্রিক। ফল, সবজি, মাছ বা মাংসের জন্য পূর্ণাঙ্গ শীতল পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা কার্যত অনুপস্থিত। বিশ্লেষকেরা বলছেন, কার্যকর কোল্ড চেইন থাকলে পোস্ট হারভেস্ট লস ২৫-৩০ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব, যা রপ্তানি সক্ষমতায় সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আজাদ চৌধুরী বাবু জানান, দেশের কোল্ডস্টোরেজগুলো ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত। তখন টেম্পারেচার-কন্ট্রোলড লজিস্টিকসের ধারণাই ছিল না। ফলে আধুনিক রপ্তানির প্রয়োজন মেটাতে এই অবকাঠামো এখন বড়ই অপ্রতুল। এর ঘাটতি সরাসরি রপ্তানি সক্ষমতা ও কৃষকের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। শীতল সংরক্ষণ, আধুনিক লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ না বাড়ালে এই ক্ষতি চলতেই থাকবে।
রপ্তানির নতুন স্তর, এখনই সিদ্ধান্তের সময়
বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের মাত্র ১ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়। থাইল্যান্ডে এই হার ৮১ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৮৪ শতাংশ। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখনো কাঁচা বা অর্ধপ্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি পর্যায়ে আটকে আছে দেশ। উচ্চমূল্যের বাজারে পৌঁছাতে সমন্বিত প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তবে বিশ্বব্যাংক ও বিআইডিএসএর যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে দেশের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ৮-১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই লক্ষ্যে তখনই পৌঁছানো সম্ভব, যখন খামার থেকে বৈশ্বিক বাজার পুরো খাতটির ভ্যালু চেইন সংস্কার, কোল্ড চেইন সুবিধা, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিং উন্নত করার পাশাপাশি এয়ার ও শিপিং সাপোর্ট বাড়বে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সভাপতি এম এম জাহাঙ্গীর হোসেন।
সম্ভাবনার এই দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, কতটা প্রস্তুত দেশ? ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর কিছু রপ্তানি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। সরকারি বাণিজ্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভ্যালু চেইন এখনো অসম্পূর্ণ। ফলে রপ্তানির ৭৫ শতাংশই অপ্রতুল প্যাকেজিংয়ে যাচ্ছে। সুবিধা কমলে কাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত না সারলে রপ্তানি আরও জটিল হবে। এ ছাড়া অধিকাংশ উদ্যোক্তা এসএমই খাতের, ঋণ, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ঘাটতিতে তাঁরা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারছেন না। ব্যাংকিং সাপোর্ট, করছাড় ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ছাড়া লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন।
জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মো. মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নীতিগত সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, কোল্ড চেইন, আধুনিক প্যাকেজিং ও গ্রেডিং সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর বাইরে নীতিগত সুবিধাগুলো বহাল ও ক্ষেত্রবিশেষে কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তার কৌশল খোঁজা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।

বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা যখন ক্রমেই বড় উদ্বেগ আর কৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে, তখন কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মানসম্মত উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই দেশের সামনে এক বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির বাজারের আকার ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় ভোক্তা, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এককভাবে ৪০ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান মূলত দ্বিমুখী। একদিকে উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য—শস্য, শাকসবজি ও ফলমূল মিলিয়ে অন্তত ২২টি পণ্যে বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে সেই উৎপাদন এখনো কৃষকের জীবিকা ও আর্থিক সক্ষমতায় ও রপ্তানি আয়ে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটাতে পারছে না।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, কৃষি উৎপাদন আর শিল্পের চাহিদা একই ছকে চলছে না। কৃষিকে ঘিরে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘমেয়াদি স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকাই এই সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণ।
বিবিএস তথ্য বলছে, কৃষি খাত জিডিপিতে ১২ শতাংশ অবদান রাখলেও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশে আনুমানিক এক হাজার খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট আছে, যার মধ্যে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান মাত্র ২৫০টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার ছিল ৪৮০ কোটি ডলার, যেখানে কৃষিপণ্যের বাজার ৪ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলার। সেই তুলনায় ছোট আয়তনের নেদারল্যান্ডস বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সমস্যা শুধু উৎপাদনে নয়; ভ্যালু চেইন, নীতি, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার বড় ফাটলে। মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যন্ত কৃষিপণ্য রপ্তানি বাস্তবতায় চারটি কাঠামোগত সংকট পরস্পর জড়িয়ে সম্ভাবনার গতি থামিয়ে দিচ্ছে। এগুলো হলো পোস্ট হারভেস্ট লস, অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রির কাঁচামাল সংকট, উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কৃষকের আয় না বাড়া এবং কোল্ড চেইনের দুর্বলতায় রপ্তানিতে স্থবিরতা।
সংগ্রহের পরেই ক্ষয় ৩০%
সরকারি ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে দেশে ধান, সবজি ও ফল মিলিয়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ৩০-৪৫ শতাংশ ফসল সংগ্রহের পর নষ্ট হয়। এই ক্ষতি শুধু খাদ্যের অপচয় নয়, বরং এটি সরাসরি কৃষকের আয় কমায়, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করে এবং রপ্তানি সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। বিপুল এই ক্ষতির দায় এককভাবে কৃষকের নয়, পুরো খাদ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাই এখানে মুখ্য।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কৃষক মাঠে ফলন তুলেই বিপদে পড়েন। সংরক্ষণব্যবস্থা নেই, শীতল রাখার সুযোগ নেই, দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা দুর্বল। কৃষকের হাতে প্রযুক্তি, পুঁজি ও সময় সীমিত। তাই অনেক ক্ষেত্রেই তিনি কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘কৃষক উৎপাদন জানে, কিন্তু বাজার ও সংরক্ষণ তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই। অথচ ফল ও সবজির মতো আর্দ্রজাত পণ্যে শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে পচন অনিবার্য।
আন্তর্জাতিক সংস্থা লিক্সক্যাপের বিশ্লেষণ আরও স্পষ্ট, সঠিক কোল্ড চেইন ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়ছে। অর্থাৎ দায়ের বড় অংশ পড়ে সিস্টেমের ওপর।
শিল্পের চাহিদানুযায়ী চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, কোল্ডস্টোরেজ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়াজাত সক্ষমতা বাড়েনি সমানতালে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ পিছিয়ে আছে, সমন্বয়ও দুর্বল। সড়ক ও লজিস্টিকস ঘাটতির কারণে পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছায় না, এতে তাজা পণ্য নষ্ট হয়।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজের মতে, পোস্ট হারভেস্ট লস আসলে পরিকল্পনার দুর্বলতার প্রতিফলন, যা রপ্তানি আয়ের পথে নীরব কিন্তু গভীর বাধা তৈরি করছে। উৎপাদনমুখী নীতির সঙ্গে যদি বাজারব্যবস্থা ও ভ্যালু চেইনের বাস্তব সংযোগ না থাকে এবং নীতি, অবকাঠামো ও বেসরকারি বিনিয়োগ একসঙ্গে এগিয়ে না আসে, তাহলে এই ক্ষতি থামবে না। তিনি বলেন, এর সমাধান কোনো একক উদ্যোগে নয়; সরকার, বেসরকারি খাত ও কৃষকের সক্ষমতাকে এক জায়গায় আনলেই শুধু মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত টেকসই ধারাবাহিকতা গড়ে উঠতে পারে।
কাঁচামাল না পেয়ে শিল্প স্থবির
পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থার দুর্বলতা এখন সরাসরি চাপ তৈরি করছে অ্যাগ্রো প্রসেসিং শিল্পে। বিষয়টি আর অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্পষ্ট উৎপাদন সংকটে রূপ নিয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে কৃষিপণ্যের মোট উৎপাদন কম নয়। কারখানা আছে, সক্ষমতা আছে, বাজারও আছে। কিন্তু শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল সময়মতো, ধারাবাহিকভাবে এবং নির্ধারিত মানে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানা নিয়মিত উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও ব্যয় বাড়ছে।
মূল সমস্যা কৃষি উৎপাদন ও শিল্পের চাহিদার ভিন্ন বাস্তবতায়। কৃষক উৎপাদন করেন মৌসুমের ওপর নির্ভর করে, আর শিল্প চলে বারোমাসি সরবরাহের চাপে। শিল্পমালিকদের বক্তব্যে এই অসামঞ্জস্যই বারবার উঠে আসে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ অ্যাগ্রো প্রসেসিং কারখানা সারা বছর পূর্ণ সক্ষমতায় চলে না। প্রধান কারণ কাঁচামালের অনিয়মিত সরবরাহ। বিশেষ করে ফল ও সবজিনির্ভর শিল্পে সংকট বেশি। ফসলের আকার, আর্দ্রতা ও পরিপক্বতার অসামঞ্জস্যে উৎপাদনের বড় অংশ শিল্পে ব্যবহারযোগ্য থাকে না। ফলে কারখানা ১২ মাস থাকলেও কাঁচামাল মেলে ৬-৭ মাস। এতে উদ্যোক্তাদের আমদানিনির্ভর হতে হচ্ছে, ব্যয় বাড়ছে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হচ্ছে।
বাপার সভাপতি ও হাশেম ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাশেম বলেন, মৌসুমে কাঁচামাল বেশি থাকলেও সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাঠামো নেই, আবার অফ সিজনে কাঁচামাল পাওয়া যায় না, দামও অস্বাভাবিক হয়।
প্রাণ গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস যথাযথভাবে অনুসরণ না হওয়ায় কৃষক ও শিল্পের কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠছে না। এতে মানসম্মত বীজ ব্যবহার ও চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকারও সমস্যাটিকে কাঠামোগত বলেই দেখছে। কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, চুক্তিভিত্তিক কৃষি, শিল্পঘন উৎপাদন অঞ্চল, সহজ অর্থায়ন এবং মাঠ থেকে কারখানা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ গড়ে তুলতে পারলেই কাঁচামাল সংকট কাটবে। একই সঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদেরও উৎপাদন পর্যায়ে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে।
বাজারেই আটকে কৃষকের আয়
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে কৃষি উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যের প্রতিফলন কৃষকের আয়ে দেখা যাচ্ছে না। ফলন বাড়ছে, অথচ কৃষকের হাতে বাড়তি টাকা আসছে না। এই বৈপরীত্যই এখন কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকদের ভাষায়, সমস্যার মূল কেন্দ্র বাজারব্যবস্থা। উৎপাদনের মৌসুমে পণ্য বেশি হলে দাম পড়ে যায়, কিন্তু উৎপাদন খরচ কমে না। বীজ, সার, সেচ ও শ্রম—সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে।
নীলফামারীর দুর্গম এলাকার সবজিচাষি আব্দুল গাফফার বলেন, তাঁরা বেশি ফলন তুললেও সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে পারেন না। সংগ্রহের পর সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় মজুতের সুযোগও নেই। এখানেই লাভ হারিয়ে যায়, উৎপাদনের সাফল্য থেমে যায়।
কৃষক সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, বাজারকাঠামোর ভেতরেই কৃষকের আয় আটকে থাকে। ভোক্তার দেওয়া দামের বড় অংশ চলে যায় পরিবহন, আড়ত ও পাইকারি ব্যবস্থায়। দর-কষাকষির ক্ষমতা সীমিত থাকায় কৃষক বাজারদরের সবচেয়ে দুর্বল অংশীদার হয়ে থাকেন।
সরকারি কর্মকর্তারাও এই দুর্বলতা স্বীকার করছেন। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ জানান, কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থায় আধুনিকতা ও সরাসরি সংযোগের অভাব রয়েছে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার সংস্কার জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বাড়ানো আর আয় বাড়ানো এক বিষয় নয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রযুক্তি সহায়তা, মূল্য স্থিতিশীলতা, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত যুক্ত না হলে কৃষক শুধু ফলন বাড়িয়ে লাভবান হবেন না।
এ বিষয়ে কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ইতিমধ্যে দুটি আধুনিক মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং চলতি বছরের বাজেটেই সারা দেশে আরও ১০০টি নির্মাণ হবে। পাশাপাশি খামারি অ্যাপ চালু হয়েছে, এর মাধ্যমে বাজারদর ও পূর্বাভাস পাওয়া যাবে, যা কৃষকের লোকসান কমিয়ে আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
কোল্ড চেইনে সুফল দিচ্ছে না পুরোনো প্রযুক্তি
দেশে বর্তমানে ৫৫০টির বেশি কোল্ডস্টোরেজ থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই আলু সংরক্ষণকেন্দ্রিক। ফল, সবজি, মাছ বা মাংসের জন্য পূর্ণাঙ্গ শীতল পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা কার্যত অনুপস্থিত। বিশ্লেষকেরা বলছেন, কার্যকর কোল্ড চেইন থাকলে পোস্ট হারভেস্ট লস ২৫-৩০ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব, যা রপ্তানি সক্ষমতায় সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আজাদ চৌধুরী বাবু জানান, দেশের কোল্ডস্টোরেজগুলো ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত। তখন টেম্পারেচার-কন্ট্রোলড লজিস্টিকসের ধারণাই ছিল না। ফলে আধুনিক রপ্তানির প্রয়োজন মেটাতে এই অবকাঠামো এখন বড়ই অপ্রতুল। এর ঘাটতি সরাসরি রপ্তানি সক্ষমতা ও কৃষকের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। শীতল সংরক্ষণ, আধুনিক লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ না বাড়ালে এই ক্ষতি চলতেই থাকবে।
রপ্তানির নতুন স্তর, এখনই সিদ্ধান্তের সময়
বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের মাত্র ১ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়। থাইল্যান্ডে এই হার ৮১ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৮৪ শতাংশ। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখনো কাঁচা বা অর্ধপ্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি পর্যায়ে আটকে আছে দেশ। উচ্চমূল্যের বাজারে পৌঁছাতে সমন্বিত প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তবে বিশ্বব্যাংক ও বিআইডিএসএর যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে দেশের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ৮-১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই লক্ষ্যে তখনই পৌঁছানো সম্ভব, যখন খামার থেকে বৈশ্বিক বাজার পুরো খাতটির ভ্যালু চেইন সংস্কার, কোল্ড চেইন সুবিধা, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিং উন্নত করার পাশাপাশি এয়ার ও শিপিং সাপোর্ট বাড়বে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সভাপতি এম এম জাহাঙ্গীর হোসেন।
সম্ভাবনার এই দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, কতটা প্রস্তুত দেশ? ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর কিছু রপ্তানি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। সরকারি বাণিজ্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভ্যালু চেইন এখনো অসম্পূর্ণ। ফলে রপ্তানির ৭৫ শতাংশই অপ্রতুল প্যাকেজিংয়ে যাচ্ছে। সুবিধা কমলে কাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত না সারলে রপ্তানি আরও জটিল হবে। এ ছাড়া অধিকাংশ উদ্যোক্তা এসএমই খাতের, ঋণ, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ঘাটতিতে তাঁরা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারছেন না। ব্যাংকিং সাপোর্ট, করছাড় ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ছাড়া লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন।
জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মো. মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নীতিগত সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, কোল্ড চেইন, আধুনিক প্যাকেজিং ও গ্রেডিং সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর বাইরে নীতিগত সুবিধাগুলো বহাল ও ক্ষেত্রবিশেষে কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তার কৌশল খোঁজা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।

ব্রিটিশ হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন নিয়মে উৎপাদন প্রক্রিয়ার শর্ত অনেক শিথিল করা হয়েছে। আগে নিয়ম ছিল, পোশাক তৈরির অন্তত দুটি বড় ধাপ বা প্রক্রিয়া অবশ্যই শ্রীলঙ্কার ভেতরে সম্পন্ন হতে হবে। এখন সেই বাধ্যবাধকতা আর থাকছে না।
৩ ঘণ্টা আগে
ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার ওপর ভারতের জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা কমিয়ে আনতে বড় ধরনের কৌশলগত চাল দিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। ভেনেজুয়েলার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এখন সেই তেল ভারতের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দিতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র।
৮ ঘণ্টা আগে
‘সরবরাহ সংকটের’ কারণে এমনিতেই নৈরাজ্য চলছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে। এর মধ্যে এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ডাকা ধর্মঘটের কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের চরম সংকট দেখা দেয়। এ সুযোগে মজুত করা সিলিন্ডার ইচ্ছামতো দামে বিক্রি করেন কিছু খুচরা ও পাইকারি...
১৭ ঘণ্টা আগে
দেশের বাজারে সোনার দাম ভরিতে প্রায় এক হাজার টাকা কমেছে। সোনার পাশাপাশি রুপার দামও কমেছে। দাম কমার ফলে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৮০৭ টাকা।
১৯ ঘণ্টা আগে