Ajker Patrika

২০২৫-২৬ অর্থবছর: সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ধার লক্ষ্যের মাত্র ৩.৫%

  • সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ কমছে।
  • ১২,৫০০ কোটির বিপরীতে ৪৩৬ কোটি।
  • তিন বছর পর ফিরল নিট ঋণ।
  • নতুন লক্ষ্যমাত্রা ৮,৫০০ কোটি।
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
২০২৫-২৬ অর্থবছর: সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ধার লক্ষ্যের মাত্র ৩.৫%
প্রতীকী ছবি

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি সরকার। পুরো অর্থবছরে এই খাত থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিট ঋণ পাওয়া গেছে ৪৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

নিট ঋণ বলতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ থেকে আগের সঞ্চয়পত্রের আসল ও মুনাফা পরিশোধের পর সরকারের হাতে থাকা অর্থকে বোঝায়। ফলে নতুন করে ৪৩৬ কোটি টাকা নেওয়ার অর্থ হলো, সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও পরিশোধের হিসাব শেষে সরকারের কাছে এই পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত ছিল।

সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার চিত্র কয়েক বছর ধরে দুর্বল। টানা তিন অর্থবছর এই খাত থেকে সরকার কোনো নিট ঋণ নিতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধার নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত অর্জন হয়েছে মূল লক্ষ্যের সামান্য অংশ।

মাসভিত্তিক হিসাবেও ছিল ওঠানামা। বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম চার মাস জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নিট বিক্রি ইতিবাচক ছিল। নভেম্বরে তা ঋণাত্মক ২৯৩ কোটি টাকায় নেমে যায়। ডিসেম্বরে আবার ৩৮৫ কোটি টাকা ইতিবাচক হয়। এরপর জানুয়ারিতে ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৬৫ কোটি এবং মার্চে ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা হয়। এপ্রিলে পরিস্থিতি বদলে নিট বিক্রি দাঁড়ায় ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। মে মাসেও ১ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা ইতিবাচক ছিল। তবে জুনে আবার ঋণাত্মক হয় ৩৬৯ কোটি টাকা।

এর ফলে সঞ্চয়পত্রে সরকারের মোট ঋণস্থিতিও কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে এই ঋণ ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১০ কোটি টাকায় উঠেছিল। পরে ধারাবাহিকভাবে কমে এখন তা প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতে আস্থার ঘাটতি, শেয়ারবাজারের অনিশ্চয়তা এবং সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ধরন বদলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও যাঁরা সঞ্চয় করতে পারছেন, তাঁদের কাছে মূলধন নিরাপদ রাখার জন্য সঞ্চয়পত্র এখনো আকর্ষণীয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংকিং খাত এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। তাই মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। তাঁর মতে, আগামী অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্য আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। যদিও সুদহার কমানোর আশঙ্কা থাকলেও সরকার আগামী ছয় মাস তা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, বহু মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল।

তবে নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের করের সুবিধা সীমিত করা হয়েছে। বর্তমানে মুনাফায় ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়। নতুন ব্যবস্থায় এটি চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হবে না; আয়কর রিটার্নের সময় প্রকৃত করের সঙ্গে সমন্বয় হবে

বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চয়পত্র শুধু সরকারের ঋণের উৎস নয়, মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, শিক্ষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গৃহিণীদের নিয়মিত আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগে এই শ্রেণির সঞ্চয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কারণ, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে গেলে সরকারের ঋণের উৎস সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের সুযোগও কমে যেতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত