Ajker Patrika

ঋণের দৌড়ে পিছিয়ে নারীরা

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
ঋণের দৌড়ে পিছিয়ে নারীরা
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

ব্যবসা বাড়াতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের বিশেষ সুবিধা, পুনঃ অর্থায়ন তহবিল ও নীতিগত অগ্রাধিকার—সবই আছে। কিন্তু ব্যাংকের ঋণের দরজায় এসে সেই সুবিধার বড় অংশই যেন অকেজো হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ছোট ও নতুন ব্যবসা করা নারীদের জন্য জামানত, কাগজপত্র এবং দীর্ঘ ঋণপ্রক্রিয়া এখনো বড় বাধা হয়ে আছে। ফলে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুরুষ উদ্যোক্তাদের তুলনায় নারীরা বরাবর পিছিয়েই থাকছেন। তবে চলতি বছরের মার্চের হিসাব, উদ্বেগজনক বার্তাই দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই অর্থায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংক ও ৩০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সিএমএসএমই ঋণের মাত্র ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যের অর্ধেকও পূরণ হয়নি; ঘাটতি রয়েছে ৭ দশমিক ৭২ শতাংশীয় পয়েন্ট।

নারীদের অর্থায়নের এই দুর্বলতার সময়েই সামগ্রিক সিএমএসএমই ঋণেও টান পড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ খাতে ঋণ স্থিতি ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে ঋণ স্থিতি কমেছে ১৬ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণের গুণগত মানের অবনতিও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ক্ষুদ্র ও নতুন ব্যবসায়ীদের অনেকের পর্যাপ্ত জামানত, দীর্ঘ ব্যবসায়িক ইতিহাস কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক নথি না থাকায় ঋণের যোগ্যতা প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

বানীস ক্রিয়েশনের স্বত্বাধিকারী তাহমিনা আহমেদ বানী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা জামানত ও জটিল ঋণপ্রক্রিয়া। অনেক নারী উদ্যোক্তার নিজের নামে জমি বা অন্য স্থাবর সম্পদ না থাকায় তাঁরা প্রয়োজনীয় জামানত দিতে পারেন না। তাঁর মতে, ছোট ব্যবসার নিয়মিত আয় থাকলে শুধু স্থাবর সম্পদের পরিবর্তে নগদ প্রবাহ, বিক্রির রেকর্ড ও ব্যাংক লেনদেনের ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে ঋণ দেওয়ার সুযোগ বাড়ানো দরকার।

উদ্যোক্তারা জানান, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা ও পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচি থাকলেও অনেকেই এসব সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পান না। ব্যাংকে আবেদন করতে গিয়ে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মুখে পড়েন অনেকে। ফলে ঋণ পাওয়ার আগেই আগ্রহ হারানোর ঘটনাও ঘটে। তাঁদের মতে, জামানতের শর্ত শিথিল, কাগজপত্র সহজ এবং দ্রুত ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করা গেলে অর্থায়ন বাড়তে পারে।

নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পুনঃ অর্থায়ন ও সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। নারী উদ্যোক্তা, নতুন উদ্যোক্তা ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য বিদ্যমান তহবিলের আকার বাড়ানোর পাশাপাশি সিএমএসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে।

গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছেও রয়েছে সিএমএসএমই ঋণের ২৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে গ্রামীণ এলাকার ১ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪টি প্রতিষ্ঠানে ১২ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, খাদ্য উৎপাদন ও স্থানীয় বাণিজ্যে যুক্ত গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের ওপর এ প্রবাহের প্রভাব রয়েছে।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ এবং শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এ খাত থেকে আসে। শিল্পমন্ত্রী জানিয়েছেন, অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান ৬০ শতাংশের বেশি করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সামগ্রিকভাবেই ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর ঋণপ্রবাহ কমেছে। অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং চলতি প্রান্তিক থেকে গতি ফেরার আশা করা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত