Ajker Patrika

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন: বেসরকারি ঋণপ্রবাহ তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে

• সেপ্টেম্বরে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪.১৭ শতাংশে।

• টানা সাত মাস এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের ঊর্ধ্বসীমায় যেতে পারছে না।

• বিনিয়োগে স্থবিরতা ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তায় ঋণের চাহিদা কম।

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন: বেসরকারি ঋণপ্রবাহ তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রায় থমকে গেছে। এতে নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, পুরোনো ব্যবসা সম্প্রসারণেও আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। ফলে ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার চাহিদাও আগের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধিতে। এই প্রবৃদ্ধি এখন গত তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি টানা সাত মাস ৫ শতাংশের ঊর্ধ্বসীমায় যেতে পারছে না। চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মে মাসে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে জুনে কমে হয় ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুলাইয়ে কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং আগস্টে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে তা আশঙ্কাজনক কমে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে, যা তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এদিকে বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমালেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদায় তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ভ্যাট-করসংক্রান্ত নানা জটিলতা নতুন বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন করে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী এক বছর ব্যবসা সম্প্রসারণের নতুন পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন অনেকে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বর্তমানে ব্যবসা করার মতো অনুকূল পরিবেশ নেই। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের পরিবেশকে নিরাপদ মনে করছেন না। তিনি বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা পাওয়া গেছে, ২০৩০ সালের আগে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। তিনি আরও বলেন, নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসার ক্ষেত্রে বাড়তি সমস্যা তৈরি করছে। এর সঙ্গে ভ্যাট ও করসংক্রান্ত জটিলতাও রয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, খেলাপি ঋণের উচ্চহার ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, কাঠামোগত নানা প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বল চাহিদার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা বন্ধ হয়েছে। চালু থাকা অনেক কারখানায়ও উৎপাদন ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে শিল্প খাতে নতুন ঋণের চাহিদা আরও সংকুচিত হয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফিরলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। গত সাত মাসে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, যার ফলে ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়তে পারে। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত